নিঃশব্দে, কোনো উত্তরের আশা না করেই মিনতি বেরিয়ে যায়।
অজয় বলে, তার চেয়ে এক কাজ করলে হয় না। তুমি রং বুম্বাকে নিয়ে এ সময়ে ক দিন দমদম থেকে ঘুরে এস—
দমদম–! বনানী মনে মনে হাসে। দমদমে যাবেই বা কার কাছে। মা নেই বাবা নেই। ভাইদের সংসারেও চির অনটন। নুন আনতেই পান্তা ফুরিয়ে যায়। বু এরই ভেতরে যে এক আধবার যায়নি বনানী তা নয়; কিন্তু যেদিন গেছে সেদিনই ফিরে এসেছে। দাদারা থাকার কথা বলেনি, সে নিজেও থাকতে চায়নি, বরং ইচ্ছেটা প্রকাশ করে ফেলতে পারে ভেবে—দাদা বউদিরা আগে ভাগেই জিজ্ঞেস করে নিয়েছে সে কখন ফিরছে। কাজেই এ অবস্থায় দমদমে বাপের বাড়িতে গিয়ে ক’দিন থাকেই বা কী করে। তাছাড়া নিজের পছন্দের বিয়ে, দাদারা আপত্তি করেনি বটে তবে নিজে বনানী এগিয়ে এসে অজয়কে ভালবেসে বিয়ে করাতে দাদাদের দায়িত্বও যেন অনেকটা কমে গেছে। এখন বনানীর আপদ বিপদের সময়, সে খুব ভালো করেই জানে, সাহায্য তত দূরে থাক, বললেই দাদারা আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিতে দেবে বিয়ে যখন সে নিজে করেছে, দায়িত্বও তার নিজেরই…
তাই বলল, দুর ওখানে গিয়ে কী হবে..ওখানে কি একবেলাও বুম্বাকে নিয়ে আমি টিকতে পারব ভেবেছো!
না—তা পারবে কেন। তুমি কোথাও টিকতে পারবে না—অজয় হঠাৎ বিশ্রিভাবে চেঁচিয়ে ওঠে, বেলগাছিয়ায় পারলে না, এখানে পারছ না, দমদমেও পারবে না…তবে পারবেটা কী শুনি?
এতক্ষণ চুপচাপ ছিল এবারে বনানীর মাথাও আগুন জ্বলল; চাপা গলায় ধমকে উঠল অজয়কে, কী হচ্ছে কী! অমন ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছ কেন?
বেশ করছি-চেঁচাচ্ছি। বিপদে আপদে যদি শ্বশুরবাড়ির লোকেরা না দেখে তো দেখবে কে!
কে আবার দেখবে বনানীর চাপাগলাটা ধারালো; নতুন খোলা ব্লেডের মতোই ঝকঝকে, দেখতে হবে নিজেদের…বিয়ের সময়ই তো বড় গলায় বলেছিলে আমাদের নিজেদেরটা আমরা নিজেরাই বুঝব
অজয় চুপ একটু দম নিয়েই কী বলতে যাচ্ছিল। এমন সময় বাইরে থেকে কে ডেকে উঠল, বুম্বা..এই বুম্বা?
শাড়ির আঁচলটা গায়ে টেনেই বনানী এগিয়ে যায়। আর দরজার মুখে গিয়েই দেখে ওই কোণের ঘর। তরঙ্গ এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে একটা স্টিলের বাটি।
এ কী আপনি!
কেন আসতে নেই…
না-না তা বলি নি। আসুন না—
নাহ্ ভেতরে যাবো না। একটা কথা বলতে এলাম কিছু মনে করবে না বল–
না বলুন না–
এটা রাখো…একটা নতুন জিনিস রান্না করেছিলাম..বুম্বার কথা মনে হল তাই নিয়ে এলাম। আমার নিজের তো
মুখে না নেওয়ার কথাই এসে যাচ্ছিল, শেষের কথাটায় রাখতে হল। বনানী জানে রঙ্গের সম্ভন নেই; বাচ্চাকাচ্চা দেখলে তাই ছটফট করে। দু মিনিটেই তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলে। বুম্বাকেও জয় করে ফেলেছে ইতিমধ্যে।
তরঙ্গ চলে যায়। ঢাকনা খুলে বনানী দেখে অনেকগুলো নারকেলের পিঠে। এত যে বুম্বা একা খেতে পারবে না সেটা তরঙ্গ-ও জানে। তবে নানী বুঝল বুম্বার নাম। করে তরঙ্গ তাদের দুজনের জন্য কিছু পাঠিয়েছে। ব্যাপারটার মধ্যে যে যথেষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে এটা ধরতে আর বনানীর অসুবিধে হল না। ঘরে তাদের উনুন জ্বলে না, আজ। কদিন হল ভাতের হাঁড়িও চড়ে না ঠিকমতো, বুম্বাটা যে সময়ে-অসময়ে খিদের জন্য কাঁদে তা তরঙ্গ কেন, এ গলিতে সবার কাছেই স্পষ্ট। মুখে কেউ কিছু বলে না, তা। আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়।
বিকেলের দিকে লুঙির ওপরে পাঞ্জাবিটা গলিয়েই বেরোল অজয়। কিন্তু মিনিট কুড়িও গেল না হুড়োহুড়ি করেই আবার ফিরে এল। সঙ্গে তখন একটি নতুন মুখ। ঝকঝমে তকতকে। নিখুঁত করে কামানো গাল। চোখে দশমা। গায়ের পাঞ্জাবিতে ভুরভুর সেন্টের গন্ধ।
অজয় হইচই বাঁধিয়ে তুলল, কই—কোথায় বনানী। দেখ এসে কে এসেছে…
কে–বনানী বেরিয়ে কী দেখে আবার শামুকের মতো খোলসের বেতরে গুটিয়ে যায়।
আমার বন্ধু। একসঙ্গেই স্কুলে পড়তাম।…তোমার অবশ্য ওকে দেখার কথা নয়। আমাদের বিয়ের আগেই ও বোম্বে চলে যায়। ওখানেই বড় চাকরি করে কমলেন্দু…
কমল, কমলেন্দুর চোখ ততক্ষণে বনানীর শরীরে। আরশোলার শুড়ের মতো ঘুরছে দারিদ্র্যের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যৌবনকে টেনে এনে কামের নিক্তিতে মাপছে।
অজয় চেঁচিয়ে উঠল, নাও-চটপট এখন চা বসাও তো…অনেকদিন আড্ডা মারি ..আজ একটু জমিয়ে আড্ডা মারব। আয় কমল—ভেতরে আয়।
কমল ভেতরে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে একটা গন্ধ ছড়াল। কিন্তু আর কেউ না কাপুক, সে গন্ধে ভয়ংকর কেপে উঠল বনানী। ঘরে চিনি নেই। চা-ও যা আছে তাতে একজনেরও হবে না…এ অবস্থায়…
উপায় না দেখে বনানী পা বাড়ল।
তরঙ্গদি–!
কে–তরঙ্গ বেরিয়ে এল। বনানীকে দেখেই খুশি, এস-এস এস ভাইনা বসব। ওর এক বন্ধু এসেছে…ঘরে এক ফোঁটাও চিনি—
নেই তো…তাতে কী আছে দাঁড়াও একটু বলে ভেতরে গিয়েই আবার একটু পরে চলে আসে অঙ্গ। হাতে এক বাটি চিনি; সেই সঙ্গে একটা কাগজের মোড়ক
এটা বনানী তাকাতেই তরঙ্গ হাসে, ভাল চা এনেছিলেন উনি..ওই তারই একটু-দেখ না ভালো হবে বানালে—
বনানীর চোখ ফেটে জল নামে নতুন বন্ধু উচ্ছ্বসিত।
চমৎকার আপনার চায়ের হাত কিন্তু। আমি অনেক জায়গায়ই ঘুরি, কিন্তু এমন চা…
বনানীর শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল; চোখ তো নয় যেন লালায় মাখানো জিভ।
সর্বাঙ্গে শুধু চাটছে।
বনানী আঁচলটা টানে আর সেই সময়েই বন্ধু বলে কই আপনার ছেলের এত কথা শুনলাম—অথচ দেখলাম না তো এখনো…।
