ওর একটা চাকরি হয়েছে তরঙ্গদি–
তরঙ্গ হাসে, বাঃ ভালো হয়েছে…খুব ভালো…পুরুষমানুষ কী বসে থাকতে পারে—
এক ঝলক হেসে বনানী এগিয়ে যায়। পরের দিন, এ গলিতে যখন আবার হুল্লোড় আর চেঁচামেচি, ঝগড়া আর কথাবার্তা, বিকেলের দিকে ঠিক সেসময়ে প্রায় বিনা নোটিশেই এ গলিতে এসে ঢুকল কমল; তারপরই সরাসরি একদম ঘরের ভেতরে।
যা আছিস তাহলে…
অজয় চমকে ও তারপর পিছনে ফিরে হেসে ফেলে।
–বাব্বা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি মাইরি–
এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম যাই একবার মনে করিয়ে দিয়ে আসিকাল তো চাকরির প্রথমদিন; সময় মতোই যেন হাজির হয় সেখানে…
বলে এদিকে ওদিকে কী খোঁজে কমল; কই তোর বউ ছেলেকে দেখছি না?
অজয় বলে, আছে…ছেলের হাত মুখ ধোয়াতে গেছে—ঐ তো…
বলতে না বলতেই বনানী ভেতরে ঢোকে, ও মা আপনি? কখন এলেন—
এই তো…সবে বসেছি।
চা খাবেন তো?
আরে নিশ্চয়ই। তবে আজ আর শুধু চা নয়, সঙ্গে টা-ও চাই–
পাঞ্জাবির পকেটে হাত গলিয়ে ব্যাগটা টেনে আনে কমলেন্দু। অজয় লাফিয়ে ওঠে, আরে না-না। তুই কী দিবি
দিলেই বা।
না-না-অজয় তক্তাপোশ থেকে নামে। পাঞ্জাবিটা গায়ে চড়ায় ইশারায় একবার বনানীকে ডাকে, বনানী বারান্দায় এলে বলে কী করি বল তো? আমার কাছে তো একটা টাকা মাত্র পড়ে আছে।
বনানী আঁচলের খুট খোলে। সেদিনের দশটাকার সবটা খরচ করেনি। এখনো গোটা চারেক সরিয়ে রেখেছে সেটাই এখন অজয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলে, এটা নিয়ে যাও–
অজয়ের মুখে হাসি ফোটে। তাহলে বুম্বাকেও নিয়ে যাই। একটু ঘুরেও আসতে পারবে। বুম্বাবুম্বা আ আয় আমার সঙ্গে…
বুম্বা বেরিয়ে আসে। অজয় গলা তোলে, তুই বোস কমল..আমি আসছি—
দেশলাইটা ফস করে জ্বালিয়ে বনানী স্টোভ ধরায়।
কমল হাসে, আজ যে এত সেজেছেন বৌঠান—
শব্দটা পুরোনো; কিন্তু বলল নতুন কায়দায়; বনানীর বুকের ভেতরে সিরসির কাঁপন ধরে। বলল, সাজলাম আবার কোথায়! একটু ভালো করে চুল বেঁধেছি আর সিঁদুর পরে শাড়িটা গুছিয়ে গায়ে তুলেছি–
এতেই হল। এই পোশাকেই বাঙালি রমণীদের আমার ভীষণ ভালো লাগে…
বনানীর বুক দুর দুর কর। কেমন একটা ভয়।
নিজেকে আপনি আয়নায় দেখেছে বৌঠান…আমি পারা লাগানো আয়নার কথা বলছি না..পরপুরুষের মুগ্ধ চোখের আয়নার সামনে কখনো দাঁড়িয়েছেন কি?
বনানী চমকে ওঠে। পেছনে যেন একটা আবছা অবয়ব; বনানী ভয়েই উঠে দাঁড়ায়। আর সেই সময়ই ওর পিঠে একটা হাত পড়ে।
এ কি! এ কি করছেন আপনি ছাড়ুন…ছেড়ে দিন না–
হাত দিয়েই পিঠের হাতটা সরাতে যায় বনানী; কিন্তু তার আগেই দুটো চওড়া হাত সবলে তাকে আকর্ষণ করে। বনানী চেঁচিয়ে ওঠে; আর তারপরেই ঘুরে দাঁড়ায়, যান—এক্ষুনি আপনি বেরিয়ে যান…ছোটলোক, ইতর কোথাকার—
শাদা পাঞ্জাবি মুহূর্তেই ঘোরে; আর মুহূর্তে বেরিয়ে যায়।
বনানী হাঁপাতে থাকে।
কী হল—! কী হয়েছে বনানী.কমলটা ওভাবে বেরিয়ে গেল যে–
কেন গেল, সেটা তাকেই জিজ্ঞেস করলে না কেন? বনানী কঠিন; অজয়ের দিকে তাকিয়ে তার চোখ জোড়া জ্বলছে।
অজয় বলল, এত ডাকলাম…এত চেঁচালাম–
তবুও ফিরে তাকাল না। তাকাবে কীবনানী দাঁতে দাঁত চাপে, সুযোগ নিতে এসেছিল যে
মানে–! অজয় বলতেই বনানী জানায়, জানো কতবড় সাহস-ও আমার গায়ে হাত দিয়েছে…
কিন্তু তাই বলে—চোয়াল ফুলিয়ে অজয় বলল, তুমি ওকে তাড়িয়ে দিলে …তুমি কী সর্বনাশ করলে তুমি জানো না বনানী–
বনানী স্থির, কী বলছ তুমি…একটা জানোয়ার–
হ্যাঁ জানোয়ারই তো…ঐ জানোয়ারটাই তো বিপদের দিনে কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল…কী এমন ক্ষতি হত গায়ে একটু হাত দিলে—এরপরেই কী চাকরিটা কাল পাব ভেবেছো
একটা সুতীব্র স্বরে অজয় চেঁচিয়ে উঠল, ধুতোর…শালা নিকুচি করি এ সংসারের–
আর তারপরেই দড়াম করে একটা শব্দ। স্টোভ ওল্টালো। কেলিটা ছিঠকে পড়ল; সেই সঙ্গে থালাবাটি-হাতা-খুন্তি থেকে মায় ভাতের হাঁড়িটা পর্যন্ত। একটা উন্মত্ত পশু যেন সবেগে ঘরে ঢুকে একটা ভয়ংকর তাণ্ডব বাঁধিয়ে চলে গেল।
এতক্ষণ তাকিয়েছিল, এবার আর পারল না। তক্তাপোশে, বিছানার ভেতরেই মুখ গুঁজে দিল বনানী। দেহটা তখন ফুলে ফুলে উঠছে, কঁপছে অব্যক্ত যন্ত্রণায়।
গলিতে খর গেল, গলিটা ভেঙে পড়ল; কিন্তু ভেতরে আর ঢুকল না কেউ। যে ঢুকল সে তরঙ্গ। বনানীর মাথায় হাত রেখে বলল, ওঠ বনানী…উঠে পড়—সবারই এমন ভাঙে আবার জোড়াও লেগে যায়
বনানী তবু ওঠে না, তবে চোখ মেলে সামান্য। কান্না ভাঙা গলায়ই বলে, সব গিয়েও এটুকুই ছিল রঙ্গ দি…আজ তাও গেল—
তরঙ্গ হাত বোলায়, পিঠের ওপরে হাত রেখে বলে, তবু উঠতে হয়, তবু বাঁচতে হয়—আমরা উঠিনি…
কান্না এবারে দ্বিগুণ; দেহটা ফুলে ফুলে একটানা ফুঁপিয়ে শুধু কেঁদেই চলেছে।
কাঁদুক…মেয়েটা কাঁদুক…উঠবে তো নিশ্চয়ই…তবে তার আগে যতটা পারে কেঁদে হালকা হয়ে নিক—
পিঠের ওপর থেকে হাতটা তুলতে গিয়েও তোলে না তরঙ্গ। স্তব্ধ বিস্ময়ে সেদিকেই তাকিয়ে থাকে।
জননী – হাসান আজিজুল হক
কয়েক বছর আগে আমাদের ফ্ল্যাটবাড়িতে মে মেয়েটি কাজ খুঁজতে আসে, তার রূপ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। চৌদ্দ পনেরো বছদ্র বয়স হবে তার, গায়ের রং ধপধপে ফর্সা, টানা টানা টলটলে বিশাল দুটি চোখ, ঈষৎ লম্বাটে মুখে টিকলো ছোটো নাক, তাতে সাদা পাথর বসানো এতটুকু একটা নাকফুল।
