রাত বাড়ে। দূরের রাস্তার দু একটা বাসের হর্ণ, চাকার শব্দ, রেল ইয়ার্ডের ইঞ্জিনের শান্টিং-এর আওয়াজের পাশাপাশি এ গলির ট্রাঞ্জিস্টারের বিজ্ঞাপন, হইচই এর শব্দ আর ঝগড়া মিলেমিশে রাত আরও ঘন হয়; তুবও অজয় ফিরে আসে না। সে ফেরে বুম্বা ঘুমোলে, বুম্বাকে ঘুম পাড়িয়ে মশারি টানিয়ে বনানী যখন দরজার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক তখুনি ঘরে ঢোকে অজয়।
হ্যারিকেনটা তুলে নিয়ে মশারির কাছে গিয়ে বুম্বাকে একবার দেখে বনানীর হাতে দুটো টফি তুলে দেয়।
রেখে দাও…কাল সকালে উঠলে দিও। শুধু শুধু ছেলেটাকে বকলাম—
সাহস পেয়ে বনানী জিজ্ঞেস করে, তোমার কী হয়েছে বল তো..দুদিন ধরে দেখছি কেমন অন্যমনস্ক–
অজয় চুপ। তবু কিছু বলে না। বলল একবারে সেই খেতে বসে। কাল থেকে কী হবে কিছুই বুঝতে পারছি না বনানী–!
বনানীর বুকটা ধড়াস করে ওঠে।
রুটি ছিঁড়ে তরকারির একটা আলু নিয়ে রুটির টুকরোটা মুখে পুরে বলে অজয়, কাল থেকে কারখানা বন্ধ। সন্তোষ শালা পাঁচ জ ফ্ল্যাটের কিছু মাল ঝেড়ে দিয়েছিল…ম্যানেজারের চোখে পড়েছে..তাইতেই শালার চাকরি গেছে। মালিক তাকে রাখবে না। এদিকে ইউনিয়ন চেপে ধরেছে ছাঁটাই করা চলবে না…বাস—তাতেই বনধ!
তাহলে-মুখের গ্লাসটা তুলেও আবার বনানী নামিয়ে নেয়। ফ্যাল ফ্যাল করে অজয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকে। অজয় বলে, তাহলে আর কী! মীমাংসা হওয়া না পর্যন্ত মালিক কারখানা খুলবে না…তার সাফ জবাব চুরি যখন একবার করেছে তখন আর তাকে সে কিছুতেই রাখবে না—
সে রাতটা একরকম কেটে যায়। কিন্তু পরের দিন থেকে অজয়কে আর সময় মতো বেরোতে না দেখে ব্যাপারটা কী করে একদিন জানাজানি হয়ে যায়। এ গলিতে ছড়িয়ে পড়ে, অজয়ের আর কারখানা নেই এখন.কারখানায় স্ট্রাইক!
সকালের দিকে বালতি নিয়ে জল ধরতে যাচ্ছিল, কানে এল নানীর। বাব্বা..আসতে না আসতেই কারখানায় গণেশ ওল্টালো..! চাকরি বাকরি সত্যিই করে তো না কী!
বনানীর মাথার আগুন জ্বলে। যতসব ছোটলোক আর ইতরের দল–! আলোচনার মতো মুখরোচক একটা কিছু পেলেই হল। দাঁতে দাঁত চেপে ভারী বালতিটা তুলে নিয়েই বনানী ফিরে আসে।
বিকেলে অজয় কোথায় বেরিয়েছিল, উল্টোদিকের ঘরের মিনতি এসে দাঁড়াল পায়ে পায়ে। আলাপ হয়েছিল একদিন…ওই তারপর থেকেই সামান্য টুকটাক কথাবার্তা; ঘনিষ্ঠতার পর্যায়ে যায়নি কোনোদিনই। বনানীও চায়নি–। অথচ আজ সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই প্রতিবেশী হিসেবে একদম ঘরে এসেই ঢুকল।
বৌদি-না জানিয়েই ঢুকে পড়লাম…
হাসি আসে না, তু জোর করেই মুখ হাসি টেনে বলে বনানী, ও মা উল্টোদিকেই থাকো, তা এ ঘরে আসতে হলে আবার জানান দিতে হবে নাকি?
হা সে ভরসাতেই তো এলাম। বুম্বা কোথায়…দেখছি না?
বাবার সঙ্গে বেরিয়েছে–
তা হ্যাঁ বৌদি, দাদার নাকি কারখানার ধর্মঘট চলছে…
হ্যাঁ ভাই।
বনানী রুটি বেলছিল; বেলা হয়ে গেলে বেলুন চাকিটা তুলে রেখে গরম চাটুতে রুটিগুলো বিছিয়ে দিতে দিতে বলল, এই তো আজ সাতদিন…কবে খুলবে কে জানে—
তবে তো আপনার খুবই অসুবিধে হবে এখন…যা দিনকাল পড়েছে—
মুখ তুলল বনানী। মেয়েটা কী তাকে জরিপ করতে এসেছে! একটু যেন রাগই হল তার। পরের ঘর, পরের ঘরের কোথায় কী সমস্যা—তা যেন ভালো করে না জানলে এদের পেটের ভাতই হজম হয় না। কই সে তো যায় না কোথাও। কোন ঘরে কী হচ্ছে তা তো জানার চেষ্টা করো না।
বলল, না—তেমন অবশ্য অসুবিধে হবে না এক-দেড় বছর…তবে তারপরে অবশ্য ভাবতে হবে–
বলল বটে তবে মনে মনে জানে বনানী এই সাতদিনেই পুঁজি যা ছিল সব শেষ। কাল থেকেই অন্যব্যবস্থা দেখতে হবে। কানের একজোড়া দুল আছে, বিয়েতে পাওয়া এ ছাড়া শাশুড়ির দেওয়া একটা সরু চেনের হার। দরকার মতো তাই ভাঙিয়ে খেতে হবে। কিন্তু তারপর? তারপর…তারপরেও কী আর কারখানাটা খুলবে না? ততদিনে নিশ্চয়ই অজয় আবার বেরোতে শুরু করবে আবার আগের মতোই কারখানাটা চালু থাকবে। ভাবতে ভাবতে একরকম ভাবনার ভেতরেই ডুবে যায় বনানী।
অবশেষে তাই হল। সেই দুল জোড়াই দিতে হল। এরপর সেই সরু চেনটা। তাতেও সংসারের ক্ষিদে মেটে না। উপায় না দেখে যখন বুম্বার আংটিটার কথাও বলেছে অজয় তখন বনানীর চোখ ফেটে প্রায় জল গড়িয়ে পড়ে আর কী!
অজয় বললে, ভেঙে পড় না..শুনছি তো এবারে খুলবে, তা খুললে আমি আবার এধ্ব তোমাদের বানিয়ে দেব; এখন তো আগে বাঁচি! এ আংটির টাকায় তো কদিন চলুক।
তাও চলল। শেষে একদিন একদম শূন্য। মাটির একটা ভাড়ে লুকিয়ে চুরিয়ে দুচার পয়সা করে জমিয়ে রাখত কনানী। এক দুপুরে হাতে নিয়ে দেখে কোনো শব্দই হচ্ছে না তাতে। বনানী বু দু চারবার কানের কাছে নিয়ে ভাড়টা নাড়ায়; কিন্তু শব্দ বুও হয় না তাতে। বরং প্রচণ্ড ধাক্কায় ভাড়টাই একসময় হাত থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে যায়।
একটা শব্দ। সেই সঙ্গে ঘরের ভেতরেও একটা মৃদু আওয়াজ এসে ঢোকে।
মিনতি যাচ্ছিল। শব্দ পেয়ে সেই দৌড়ে আসে, কী হল বৌদি? শব্দ কিরে!
বলে মেঝের দিকে চোখ পড়তেই দেখে পোড়া মাটির ভাড়ের টুকরো; বনানীর চোখের জলটুকুও তার নজর এড়ায় না; দেখে তক্তোপোশে একগাল খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে অজয় শুয়ে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে, পাশে ছেলেটা ঘুমন্ত। মুখের ভেতরে আঙুল চোষার শব্দ হচ্ছে চুকচুক…
