বনানী চমকে ওঠে।
একটা গানের সুর যেন ভেসে আসছে। মনে তো হচ্ছে ওই কোণের ঘরটা থেকে…তার মানে তো সকালের দেখা সেই ঝাটা হাতে বউটি। বাব্বা—অমন রণ রঙ্গিনীর গলায় আবার এমন সুরেলা গান। কিন্তু কাকে শোনাচ্ছে…নাকি নিজেই গাইছে! কিন্তু রাত বারটায় নিজেকে গান শোনাবে?
পাশ ফিরেই বনানী এবার চোখ বোজে। যন্ত্রণাটা সরিয়ে দিয়ে মাথার জায়গাটার এখন দখল নেয় একটা সুর। বনানী আস্তে আস্তে সেই সুরের ভেতরে ডুবতে থাকে।
.
সকালে অজয় কারখানায় যাবে বনানী বলল, বাড়ির খোঁজটা নিও কিন্তু
অজয় বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ আমি আজই গিয়ে পাত্তা লাগাচ্ছি…তুমি ঠিকই বলেছ…এখানে এভাবে ছেলেকে মানুষ করা যায় না।–
হালকা পায়ে অজয় বেরিয়ে যায়। বনানীর মুখে তৃপ্তির হাসি। অন্তত কাল বল্গাহীন সম্ভোগের পরে যতটা তৃপ্তি পেয়েছিল, এ তৃপ্তি যেন তার চেয়েও বেশি। বনানীর মনে একটা খুশির আলো ছড়িয়ে পড়ে। বুম্বা কী করছিল, ওকে টেনে এনে মাথার হাত বুলিয়ে বলে, চল বুম্বা তোকে চান করিয়ে দি..দশটা তো বাজতে চলল—
সাবান-গামছাবালতি ও মগ নিয়ে বাথরুমে ঢুকেছে কী ঢোকেনি, পেছন থেকে একটা মিহি গলা ভেসে এল।
তোমার সঙ্গে এখনো কিন্তু আলাপই হলনা ভাই–
বনানী চমকে উঠল। থমকে দাঁড়াতেই দেখে কোণের ঘরের সেই বউটি; নামটাও আজ সকালেও জেনেছে সে–তরঙ্গ।
তা রঙ্গের মতোই চেহারা; অন্তত প্রথম দর্শনেই সবাই মুগ্ধ, বিস্মিত হয়ে যাবে। তবে হ্যা—এক সময়ে রূপ ছিল। রঙটা এখনো থাকলেও রূপের নদীতে পড়েছে ভঁটা; অথচ গলা শুনলে কে না বলবে যুবতী–।
বনানী তাকাল। মুখে সামান্য হাসি; যতটা না দেখালেই নয়।
বলল, কারুর সঙ্গেই আমার আলাপ হয়নি এখনো। আর..আর এই আমার সঙ্গেই বোধহয় প্রথম হল, তাই না? ঐ ছেলেটি বুঝি—
বনানী চুপ।
এসো না…ভেতরে এস
না না, এখন কোথায় যাব…ওকে চান করাতে নিয়ে যাচ্ছি যে—
একটু বোকার মতো হেসে বনানী এগিয়ে যায়। বউটিও চুপ; কোনো কথা বলে না। মনে মনে নিজের ভুমিকায় নিজেই খুশি হয় বনানী; যাক অন্তত এ যাত্রায় এড়াতে পেরেছে।
কিন্তু যেমন গায়ে পড়া স্বভাব, বনানী জানে এড়াতে চাইলেও ওকে এড়ানো যাবে না। ঠিক পাশাপাশি না হলেও কাছাকাছি তো বটে। সকালে-সন্ধ্যায় দু’বেলা দেখা তো হবেই..আর কিছু না হলেও অন্তত কলবাথরুমে তো আসতে হবে।
দিন দুই বাদেই বনানী আবার ধরা পড়ল। এই যে…এই বনানী একবারটি এসো ভাই—
বনানী তখন সদ্য চান করে, গায়ে সাবানের সুগন্ধ নিয়ে বেরোচ্ছে; তরঙ্গের ডাকে থমকে দাঁড়াল; এই রিং-টা কিছুতেই কানে লাগাতে পারছি না…যদি একটু লাগিয়ে দাও–
বনানী ইতস্তত করে। একে ভেজা শাড়ি, জল শপ শপ করছে, তার ওপর ওই নীল শার্ট-প্যান্ট যে কখন এসে পড়ে ঠিক কী—! অথচ এত সামান্য ব্যাপার যে না বলতেও খারাপ লাগে। জানাল, কিন্তু শাড়িটা ছেড়েই না হয় শাড়ি ছেড়ে আসবে..আচ্ছা তাই এসো না হয়…তবে বল তো আমিও যেতে পারি…তুমি না হয় ততক্ষণে গিয়ে শাড়ি ব্লাউজটা বদলে ফেল—
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় বনানী।
কিন্তু ঘরে এসেও আবার কাঠ; একটা ভারী পায়ের শব্দ ততক্ষণে গলি পেরিয়ে কোণের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে আর তারপরেই দরজায় একটা দড়াম করে শব্দ, এই মাগি…এই তরঙ্গ কই, দরজাটা খুলবি।
বনানীর বুক কাঁপে। ভাগ্যিস সে মায়নি তখন। গেলে নিশ্চয়ই এতক্ষণে সে লোকটার মুখোমুখি পড়ত। আর লোকটাও এসে গেছে যখন, এটা নিশ্চিত যে তরঙ্গ আর আসবে না; এলও না।
ঘুমন্ত বুম্বাকে খানিকক্ষণ হাওয়া করে খেতে বসার মুখেই বনানী টের পেল ও প্রান্তে রঙ্গ ক্ষেপেছে। প্রচণ্ড গর্জনে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলবে এবার দুপুরের নৈঃশব্দ্যকে।
বনানীর ভুরু কুঁচকে ওঠে। ভাতের থালা রেখেই দৌড়ে গিয়ে সে দরজাটা চেপে ধরে।
.
সন্ধের পরে অজয় ফিরল মুখ গম্ভীর করে।
বুম্বা ছুটে গিয়ে পা দুটো জড়িয়ে ধরে, বাবা–ও বাবা আমার দন্নে লদেন এনেছো?
হ্যাঁ, দিনরাত শুধু লদেন আর দেন—অজয় চেঁচিয়ে উঠল, এরপর পেটভর্তি ক্রিমির বাসা বানাও আর আমি ছুটি ডাক্তারের কাছে।
বুম্বা পা ছেড়ে দিল; মুখ কালো করে এসে পরে বনানীর কোল ঘেঁষেই বসে পড়ল।
বনানী বলল, তা অমন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে কেন ভালো করে বলতে পারো না–
না পারি না…পারবও না। দিনরাত গাধার মতো খাটব, তারপর এখানে যাও ওখানে যাও….বাড়ি খোঁজ…লজেন্স আনো
তা খুঁজো না…কে তোমাকে খুঁজতে বলেছে। এখানে থেকে তোমার ছেলে গুণ্ডা হোক বদমাস হোক আমার কী!
বনানী গম্ভীর গলায় বলে, লোকে তোমার নাম করেই আঙুল দেখাবে ওই তো অমুকের ছেলে… আর তুমিও তখন পার পাবে বলে ভেবো না
আমি আবার কী ভাবব…আমার তো জীবন নষ্টই হয়ে গেছে!
তাহলে আর কী—প্যান্টটা খুলে অজয় একটা পাজামা পরে; পরে আধ-ময়লা পাঞ্জাবিটা টেনে নিয়ে মাথার ভেতরে গলিয়েই জানায়, নষ্ট যাতে আর না হয় সেই চেষ্টাই কর না…বাপের বাড়িতে চলে যাও। দিব্যি দুধে ভাতে থাকবে
বলে দুদ্দাড় করে বেরিয়ে যায় অজয়। বনানী পেছন থেকে ডাকে, কী হল চা খেয়ে গেলে না?
বাইরে থেকে কোনো উত্তর আসে না; তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আলোটা নিভে যায়। লোডশেডিং। বুম্বা ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। বনানী আন্দাজে হাত বাড়িয়ে বুম্বাকে কোলে নেয়; তারপর অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেশলাই খুঁজে হ্যারিকেনটা জ্বালাতে গিয়েই টের পায় তার চোখের কোল ভরে উঠেছে জলে; তবে যত না জল তার চেয়ে অনেক বেশি কান্না এসে আটকে আছে গলার মাঝখানে। আশ্চর্য! আজ এক সপ্তাহের ওপর এখানে এসেছে, কোনোদিনও এমন ব্যবহার দেখেনি অজয়ের। দু-দিন ধরে একটু অন্যমনস্ক লাগছিল ঠিকই, কিন্তু কথাবার্তায় কোনো বিচ্ছিরি আচরণ ধরা পড়েনি। অথচ আজ,…বনানীর কথা তো ছেড়েই দিল, বুম্বার সঙ্গে যা ব্যবহার করল তা অজয় চরিত্রের একদম বিপরীত। কী হল কী মানুষটার? এক অজানা আশঙ্কায় বনানীর বুকটা থিরথির করে কাঁপতে থাকে।
