এরপর বেলা বেড়েছে। চানটান করে খেয়েদেয়েই বেরিয়ে গেছে অজয়। বুকে খাইয়ে নিজেও একসময় কিছু খেয়ে নিয়েছে…তবুও বলবে বলে কিছু ভাবে নি। ভেবেছে, স্বামী-স্ত্রী-ঝগড়াঝাটি হয়েছে নিশ্চয়ই। তাই এমন চিৎকার-চেঁচামেচি, একটু পরেই আবার ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু ঠিক তো হলই না, বেলা বাড়তে চিৎকারও তাই শুরু হল নতুন করে। বনানী তখন রীতিমতো বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। তার সেই ক্ষোভটাই ফেটে পড়ল এখন ভরদুপুরে মাতাল হয়ে এসে যখন লোকটা আবার খিস্তি-খেউর শুরু করল।
না : বাড়ি একটা অন্য কোথায়ও দেখতেই হবে। আজ আসুক অজয়—সে এলেই ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে বনানী।
যেমন শুয়েছিল তেমনিই এসে আবার বুম্বার পাশে শুয়ে পড়ে বনানী; আলতো করে ছেলের গায়ে হাতটা একসময় তুলে দেয়। পরে চেয়ে থাকে নিঃশব্দে।
.
এগলিতে দিন যেমন রাতও তেমনি। কী সকাল কী দুপুর, কী বিকেল কী রাত্রি-—এ ঘরে ও ঘরে শুধু কথা কাটাকাটি আর ঝগড়া, চুলোচুলি আর হাতাহাতি, খিস্তি খাস্তা আর গালাগাল।
সন্ধের পর যখন ওদিকটায় থেমে গিয়ে আবার এদিকে শুরু হয়েছে ঠিক সে সময়ে এল অজয়।
কী ব্যাপার! কী হয়েছে কী? ভর-সন্ধেয় এমন ঝগড়া
শুধু কী সন্ধে বনানীর চাপা গলায় ধার, ফর্সা মুখটা টকটকে হয়ে উঠেছে রাগে, শুরু তো হয়েছে সেই কোন সকালে
সকালে–!
হ্যাঁ সকালেই। বলব বলব করে তোমাকে বলি নি। ঘুম ভাঙিয়ে জাগাই নি। ভেবেছি সামান্য ঝগড়া। ও থেমে যাবে। কিন্তু তুমিও গেলে, শুরু হল ভয়ংকর কাণ্ড। দুপুরের দিকে তো—
কী হয়েছে দুপুরে শার্ট খুলে লুঙিটা গলিয়ে প্যান্ট খুলতে খুলতেই জিজ্ঞেস করে অজয়।
বনানী বলে, ওই যে ওই কোণের দিকের ঘরের লোকটা..দুপুরের দিকে কী সব ভস্ম খেয়ে এসে দরজায় এমন লাথি মারতে শুরু করল যে আমি ভয়ে কেঁপে মরি আর কী! আর বউটাও বাবা তেমনি…কী সব বিশ্রি গালাগাল—তা আশেপাশের কোনো ঘরের কেউ কিছু বলছিল না।
কে বলবে..দরজাটা বন্ধ করতে গিয়েই যা দেখলাম, আশেপাশে বাচ্চাকাচ্চার ভিড়…দু চারজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে
তাহলে–!
তাহলে কী…তুমি কাল থেকেই আর কোথাও বাড়ি খুঁজতে থাকে। এখানে থাকলে এ পরিবেশে ছেলেটা বড় হবে ঠিকই কিন্তু মানুষ আর হবে না–
কিন্তু–
অজয়ের চোখেমুখে হতাশার ছায়া। আলনায় প্যান্টটা রেখে, বাইরের দড়ি থেকে গামছাটা টেনে নিয়ে এসে বলল, কিন্তু এ টাকায় আর ঘর কোথায় পাব বল তো! দেখলে তো, কী খোজাটাই না খুঁজলাম…যেখানেই যাই প্রচুর সেলামি আর অ্যাডভান্স। তার ওপর ভাড়াও তো চারশ পাঁচশর নিচে কথা বলে না।
আহা আমি কি তোমাকে চারশ টাকার ঘরের কথা বলছি।
বনানী এবারে সংযত; অজয়ের জন্য স্টোভে চায়ের জলটা চাপিয়েই জবাব দেয়, বলছি এই ভাড়ায়ই অন্য কোথাও ঘর দেখার কথা…দেখতেই হবে তোমাকে, না হলে–
না হলে—তুমি তো বলেই খালাস…
কিন্তু পেলে তবে তো! সব জায়গারই এক হাল…আসলে এত কম টাকায় আর এখন ভালো পরিবেশ পাওয়া যায় না।
যায় না তো বিয়ে করেছিলে কেন?
হঠাৎ স্টোভটা দপ করে জ্বলে উঠল। জল বসানো কেতলির চারপাশ দিয়ে আগুনের শিখা উঠল লকলক করে।
বনানী ছুটে গেল। এ স্টোভটা এমনই। মাঝে মাধ্যই এমনি দপ করে মাথার ওপরে আগুন উঠে আসে; আবার নেমেও যায়, চটপট গিয়ে ফিতেটা নামালে ওটালে। এখনও তাই হল। বনানী গিয়ে ফিতেটা একটু নামিয়ে আগুনটা ঠিক করতেই মনে হল নাহ ব্যাপারটা বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। কী দরকার ছিল এমন করে বলার…এ গলিতে পা দিয়ে এ ঘরগুলোর ছোঁয়া কি ওর গায়েও এসে লাগল!
একটু যেন লজ্জাই পেয়ে যায় নানী। মুখ তুলে ভালো করে তাকাতেও পারে না। বুম্বাটা একটা ছরি বই নিয়ে এতক্ষণ মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল; বনানীর কঠিন গলার আওয়াজে এদিকে মুখ ফেরাতেই নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করল বনানী, কই রে বুম্বা এবারে সুজিটা খেয়ে নিবি..বায়না তো ধরেছিলি বাবা না এলে খাবি না?
বলেই আড়চোখে একবার অজয়ের দিকে তাকিয়ে পরে বলে, যাও হাত মুখটা ধুয়ে এস..আমি ততক্ষণে চা-টা ঘেঁকে ফেলি।
সে রাতে আর ঘুম এল না বনানীর চোখে। একটা যন্ত্রণা সেই থেকেই মাথার ভের হাতুড়ি পিটিয়ে যাচ্ছিল। কী দরকার ছিল ও কথাটা বলার! এই চার বছরের বিবাহিত জীবনে অন্তত এক আধটু মনোমালিন্য মান-অভিমান হলেও এ ধরনের কথা তো দুজনের কেউ বলে নি। অথচ আজ…
অজয় অবশ্য ভুলেই গিয়েছিল; কথাটা আর সেভাবে গায়েও মাখে নি। বুম্বা ঘুমিয়ে পড়লে তাই শোবার আগেই বনানীকে কাছে টেনে নিয়েছিল। বনানী প্রথমে একটু অস্বস্তিতে থাকলেও পরে আস্তে আস্তে অবশ্য অজয়ের উত্তাপে গলে যেতে ভুল করে নি; বরং বেলগাছিয়ার বাড়িতে যে ভয়-ভয় টুকু ছিল সেটুকু কাটিয়ে উঠেও সে হয়ে উঠেছিল বল্গাহীন…কিন্তু তবুও, প্রায় ঘন্টাখানেক পরে সম্ভোগের ক্লান্তিতে অজয় ঘুমিয়ে পড়লেও বনানীর চোখে আর ঘুম আসে নি; দেহ ক্লান্তিতে ভেঙে এলেও মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছিল; বনানীর ভয় হচ্ছিল এখানে এসেই এমন, শেষে না
জানি একদিন কখন সবার অজান্তে এদেরই মতো একজন হয়ে উঠবে। দিন রাত তখন অজয়ের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি হাতাহাতি। ইস কী কুৎসিত…না বাবা তার চেয়ে জায়গাটা পাল্টানোর দরকার…অন্য কোথাও বাড়ি একটা দেখতে হবে। এখানে থাকলে…
