অবশ্য পায়নি যে একেবারে তা নয়; দু একটা গোটা বাড়িরই খবর পেয়েছিল। কিন্তু টাকার অংক শুনেই আর এগোয়নি। এগাবে কী, কটাকাই বা মাইনে পায়…মাস গেলে সব মিলিয়ে ওই সাতশ। তা এই সামান্য আয়ের সিংহভাগই যদি বাড়ির পেছনে চলে যায়, তাহলে আর সংসার চলে কী করে! নিজেরা না হয় কষ্টেসৃষ্টে কাটাল, কিন্তু কচি একটা ছেলে…তা ওই ছেলের পেছনে কি খরচ নেই নাকি–!
বিরোধ তো এই নিয়েই বাধল।
একান্নবর্তী সংসার। তাও ভাড়াবাড়ির বাসিন্দা। মাস গেলে ভাড়াবাবদ ছ শো টাকা গুণে গেথে দিতে হয়। তার ওপর ইলেকট্রিক আলাদা। গ্যাস আলাদা। ঝি চাকরের মাইনেও আলাদা আলাদা। বড় আর সেজোর বক্তব্য—চার ভাই যখন, সংসারের সুযোগ সুবিধেও যখন চারজনেরই প্রাপ্য, তখন খরচ খরচাটাও চার ভাগেই ভাগ হোক ছোটর এতে আপত্তি নেই, কেননা বড় আর সেজোর মতো বাঁ হাতের পয়সা না থাকলেও সে চাকরিটা ভালো করে, তাই আপত্তি ওঠার প্রশ্ন নেই; কিন্তু অসুবিধেটা যত দেখা দিল ওই মেজকে নিয়ে। সামান্য গ্রিল কারখানার চাকরি। মাস গেলে ওই সামান্য টাকা কটাই যা ভরসা। কিন্তু সংসারের ভাগাভাগিতে যা পড়ল তা তার এই মাস মাইনের চেয়েও প্রায় শ’দেড়েক বেশি। অত কোত্থেকে দেবে অজয়!
দিতে পারায়ই তাই জ্বলল আগুন। বড় আর সেজোর মুখে দেখা দিল অসন্তোষ। ছোটর মুখে অবজ্ঞা। আর দুই বউয়ের তো রীতিমতো মুখ টেপাটেপি, হাসাহাসি।
চাকরি যার এরকম, মাইনে যার এত কম তার আবার বিয়ের শখ কেন! তাও কী না আবার দেখেশুনে, প্রেম করে–! নাও এখন, ওই সুন্দরী বউ ধুয়েই জল খাও। পরের পয়সায় আর ভালোমন্দ খাওয়া কেন–!
পরের পয়সা–।
বনানী মনে মনে অবাক। হেসেও ছিল ভেতরে ভেতরে কথাটা বলল চমৎকার–পরের পয়সা। যেন তারা কিছুই দেয় না, কিছুই করে না, অমনি বসে। বসেই খায়। কিন্তু যতই বলুক, বনানী তো জানে সবটা না দিতে পারলেও অন্তত শ পাঁচেক টাকা মাস গেলে ও সংসারে ধরে দিত অজয়। অথচ সে টাকাটা যেন টাকাই নয়; ঘেন্না আর লজ্জায় বনানীর নিজের মাথাই এক একসময় হেঁট হয়ে আসত; দুপুরে খেতে বসতেই এক একদিন ভয় হত। কী করা, পেট বলে কথা অন্তত পেটের আগুন নেভাবার জন্যই তো কিছু পেটে দেওয়া দরকার; অতএব বসত। কিন্তু ঐ শাশুড়ি বা দুই বউয়ের সঙ্গে নয়। বসত সবার অলক্ষ্যে, সবার শেষে। কিন্তু তাতেও কি রেহাই আছে?
এক দিনের কথা।
ভাত নিয়ে সবে বসেছে বনানী। এমন সময় কানে এল বড় বউয়ের গলা। ওকি শুনিয়ে শুনিয়েই সেজোকে বলছে, ওর আবার সবার সঙ্গে বসতে ভীষণ আপত্তি…দেখতে ভালো কিনা তাই প্রেস্টিজে লাগে—
হুঁ–প্রেস্টিজ না ছাই….
বড় বউয়ের খোঁচায় এবারে যেন সেজোও এক ধাপ এগিয়ে, দেখো গিয়ে মুছোটা কাটাটা জোগাড় করে ঠিক জমিয়ে বসেছে–
বনানী আর পারে নি। ভাত ফেলে রেখেই উঠে পড়ে ছিল সেদিন।
ভাত তো নয়, প্রায় শুকনো কড়কড়ে দুমুঠো তলানি। সঙ্গে একটু ডাল কিংবা তরকারি। বনানী তবু কিছু বলত না; তবে বুকটা মুচড়ে উঠত যখন কারখানায় বেরোবার সময় অজয়কেও ওরকম খেয়ে যেতে দেখত। এ পর্যন্ত তবুও মেনে নিচ্ছিল, কিন্তু পারল না একদিন, বুম্বার জন্য বরাদ্দ দুধটুকুন যেদিন হাওয়া হল।
সেদিন বনানী ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল। অজয়ও টের পেয়ে আগুন। মাথাটা সু গরম করে নি। তবে সেই মুহূর্তেই ঠিক করেছিল, ওখানে আর নয় কাল থেকেই সে বাড়ি খুঁজবে। যেখানে হোক যেমন খুশি হোক, ছোট খাটো একটা ঘর হলেই চলবে; আর পেলেই সে বউ ছেলে নিয়ে আলাদা হবে। যার যেমন আয় তেমনি তার থাকা উচিত। তা ছাড়া হতে পারে সে একজন ওয়েল্ডার, হতে পারে একজন সামান্য মাইনের শ্রমিক, কিন্তু তাই বলে এতটা ছোট আর নীচ সে নয়। তারও একটা মান আছে মর্যাদা আছে। কাজেই এখানে থেকে, এ বাড়ির এক কোণে পড়ে থেকে নিজের মর্যাদাকে সে ধুলোয় লুটোতে দেবে কেন! বাড়ি তাই দেখতেই হবে একটা। পাল্টাতেই হবে তাকে এ পরিবেশ।
কিন্তু সেই পরিবেশ পাল্টাতে গিয়েই সে এমন একটা জায়গায় এনে তুলবে তা কে জানত। বনানী নিজেও কি কল্পনা করতে পেরেছিল? যতসব হাড়-হাভাতে আর ছোট লোকের দল। দেখেই বনানীর মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল কাল; তবু কিছু বলে নি। প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে ভেবেছিল হোক বস্তি, ঘরগুলো না হয় পরপর লাগানোই হল, একসঙ্গে কলবাথরুমের অসুবিধেটাও না হয় মানিয়ে নেবে আস্তে আস্তে, তবু তো সে আলাদা, বু তো সে স্বাধীন, ওই বেলগাছিয়ার বাড়ির মতো প্রতি পদে পদে তো আর হেনস্থা হতে হবে না তাকে। তাই কিছু বলে নি; বলবেও না ভেবেছিল। কিন্তু চমকে উঠল আজ সকালে উঠেই। বনানী উঠে কলবাথরুম সেরে সবে চায়ের জলটা চাপিয়েছে সেই সময়েই চিৎকার প্রথমে বোঝেনি, জলটা নামিয়েই তাই ছুটে গিয়েছিল। তবে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যে দৃশ্য দেখে তাতে বনানীর দেখা
তো দূরে থাক, কানে আঙুল দেওয়ারই কথা। তবুও দেখল, বাথরুমের কাছাকাছি কোণের দিকের যে ঘরটা, সেই ঘরের সামনে নীল-শার্ট-প্যান্ট পরা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি একটা লোক দাঁড়িয়ে সমানে কাকে দাবড়াচ্ছে, আর উল্টোদিকে ঝাটা হাতে কোমরে হাত দিয়ে একজন; মুখে অনর্গল খিস্তি-খেউর।
শুনে বনানী আর দাঁড়াতে পারে নি। দরজাটা বন্ধ রেখেই উঠে এসেছিল। ও বলেনি। ঘুমন্ত অজয়কে ডেকে জানাবারও প্রয়োজন মনে করে নি।
