ঘুম ভেঙ্গে যায় জয়িতার।
ইস, আবার সেই দুঃস্বপ্ন।
ঘড়িতে চারটে। এখুনি উঠতে হবে যে—বু উঠতে পারে না জয়িতা। কাল রাতে আর আজ দুপুরের স্বপ্নগুলো তো আসলে স্বপ্ন নয়। ওতো এই জীবনেই ঘটেছিল, গত জন্মে নয়। এই হাত দুটোই তো জড়িয়েছিল জয়ন্তের গলা। আজ সেই হাত দুটো কার গলা জড়াবে। এই মাথাটা স্থান পেয়েছিল জয়ন্ত্রে বুকে আজ
কেমন স্লথ, অলস, প্যারালেটিকাল একটা অবস্থা ছেয়ে ফেলে জয়িতার দেহমন। শয্যা ছেড়ে ওঠার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলছে জয়িতা।
হঠাৎ বুকটা কেঁপে ওঠে। দুপুরে থানা থেকে একটা ফোন এসেছিল না? কি যেন বলল পুলিশ? এখন মনে হচ্ছে—ওই ফোনটা ঠিক আর দশটা উটকো ভুতুড়ে ফোনের মতো নয়। রীতিমত সিরিয়াস কোন সতর্কবাণী। কিন্তু কেন?
জয়ন্ত এখন কোথায়? বাড়িতে নেই—সেটা বোঝা যাচ্ছে। কারখানায়, রয়েছে কি এখনও? আর দশটা দিনের মত কাজ করে যাচ্ছে? সাড়ে পাঁচটায় ছুটি। বাড়ি আসতে আসতে প্রায় সাড়ে ছ’টা। তখন ফিরে জয়িতাকে তো আর দেখতে পাবে না জয়ন্ত। জয়িতা তখন অনেক দূরে একযুগ দূরে, অতীতের কেউ, একটা ছায়া বা একটা স্মৃতি। অথবা একটা কল্পনা মাত্র।
ভাবতে ভাবতে আরও নিথর হয়ে যায় জয়িতা। আঃ, জয়ন্ত আজও আসতে এত দেরি করবে। আর, আরো আশ্চর্য লোকটা তো একবারও এক মুহূর্তের জন্যেও বলল না—যেও না। কেন?
বাধা না পেলে ছেড়ে যাওয়ার মধ্যে কোন মজা নেই। খেলায় ওয়াক-ওভার পেয়ে যেমন কোন আনন্দ হয় না।
কানের কাছে বারবার বাজছে একটা গানের সুর—
মোরা গরীব হতে পারি–
(তা বলে) সুখের সাথে নয়কো আড়ি–
(তাই) মুখ করো না হাঁড়ি–
কে যেন বলছে—আমার আসল অলংকার তো–
ভিজে প্যাঁচপ্যাচে রোমান্স। খুব ভালো। বলার মধ্যে কিন্তু কোন ফাঁকি ছিল না। চোখের জলে জয়ন্তের পাঞ্জাবি ভিজেছিল—হয়তো বা এতই কেঁদেছিল জয়িতা যে জয় জামা প্যাঁচপ্যাচে হয়েই ভিজে গিয়েছিল। আজকের দিনের যাত্রার দৃশ্যের মতো। মেলোড্রামা। কিন্তু একবিন্দু কৃত্রিম কিছু ছিল না এই মেলোড্রামার মধ্যে।
আবার কেমন একটা ঘুম আসছে।
লড়াই করে বু একবার উঠবার চেষ্টা করল জয়িতা। কিন্তু বৃথা। মুখের কাছে একটা মুখ, সেইরকম হাসছে সুখের সাথে নয়কো আড়ি-মুখ করো না হাঁড়ি।
দুই হাতে সেই মুখটাকে কাছে টানতে চেষ্টা করল জয়িতা। কিন্তু ফাঁকা শূন্যে এলোমেলো ঘুরে ফিরে এলো হাতটা? আঃ সেই রক্ত মাংসের, শান্ত সৌম্য, দুষ্টমিষ্টি চোখের, চাপা হাসির মুখটা কই? কোথায়?
আবার সেই পরম ক্লান্তি এবং সেই প্রগাঢ় ঘুমের ঢেউ। ঘুমিয়ে পড়ল জয়িতা।
এবং টেরও পেল না কখন সাড়ে ছটা পেরিয়ে গেছে।
রক্ত মাংসের সেই মুখটাকে যখন সত্যিই দুহাতে ধরতে পারল জয়িতা, তখন রাত এগারটা…
…ঠিক সেই সময়েই বোধহয় এস. পি. সাহেবের গাড়ি এবং পুলিশের জিপ শ্ৰীমন্ত মুখার্জির বাড়ির গেটে ব্রেক কষল।
বারান্দা থেকে নেমে এসে এস. পি.-কে রিসিভ করলেন শ্ৰীমন্ত। এস. পি. জিজ্ঞেস করলেন—আশাকরি আপনার পারিবারিক অনুষ্ঠান ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে? ..অ্যাট লিস্ট, আমরা ব্যাঘাত ঘটাইনি।
অবকোর্স নট, হাসলেন শ্ৰীমন্ত-চলুন।
পুলিশের গাড়ি শ্ৰীমন্তকে নিয়ে এগিয়ে চলল। সিগারেট ধরালেন শ্ৰীমন্ত-আই অ্যাম এ স্পেসালি থ্যাংক ফুল টু ইউ এস. পি সাহেব। ইউ হ্যাভ স্টপ মি ইন কমিটিং অ্যানাদার অফেন্স…ইস ক্যাক্ট মাচ মোর সিরিয়াস দ্যান ইকোনমিক অফেন্স ইট কুড হ্যাভ বিন অফ রিয়েলি ইনহিউম্যান ক্রাইম.এ কাইন্ড অব ব্লডলেস মার্ডার, হাঃ হাঃ–
ছোটলোক – শচীন দাশ
ভরদুপুরে গলাটা আবারও সাপের মতো হিসিয়ে উঠল, কী রে মাগি দরজাটা খুলবি?
বনানী তখনো বুম্বার পাশে, কাত হয়ে শুয়ে একটু চোখ বুজেছে, চিৎকারের শব্দে ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল; চোখ দুটো তো খুললই, তাকিয়ে দেখে বুম্বাও পিটপিট করে চোখ খুলে দরজার দিকে মুখ ঘুরিয়েছে।
বনানী বিরক্ত হয়।
দরজাটা বন্ধ হওয়া দরকার। হলে আর এভাবে চিৎকারটা ঘরের ভেতরে এসে আছড়ে পড়বে না। তবে হাওয়াটা বন্ধ হয়ে যাবে। তা হয় হোক, বুম্বাকে না হয় হাত পাখা চালিয়েই ঠাণ্ডা করবে সে, তবু তো ছেলেটা বাঁচবে।
বনানী উঠে বসে। কাঁধের ওপরে আঁচলটা ফেলে এগিয়েও যায়। কিন্তু দরজায় হাত রাখতে গিয়েই আবার থমকে দাঁড়ায়। একটা কুৎসিত গালাগাল দমকা বাতাসে ঠিক কঁচা নর্দমার পচা পাঁকের মতোই দুর্গন্ধ তুলে হঠাৎ মিলিয়ে গেল। আর তার পরেপরেই আবারও সেই পুরুষ গর্জন। সেই চেঁচামেচি।
আশ্চর্য—সেই কোন সকালে শুরু হয়েছে; মাঝখানে থেমে গিয়ে বেলা দশটায় একবার জ্বলে উঠেছিল, সেও সামান্য সময়, বোধহয় ঠিক সুবিধেও হয়নি, এখন সুদে আসলে সেটা আবার পুষিয়ে নিচ্ছে।
বনানী অবাক হয়।
করে কী লোকটা–! চাকরিবাকরি নেই নাকি? নাকি সারাদিনই ঘরে বসে বউয়ের সঙ্গে গলাবাজি। হইচই আর চিৎকার। পুরুষ মানুষ—! একটু আধটু চিৎকার চেঁচামেচি হতেই পারে; কিন্তু তাই বলে সারাদিন সারারাত। আর বউটাও তেমনি। হাঁটু অবধি শাড়ি তুলে গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে। কে জানে একটু পরে আবার হাতাহাতি হবে কি না–!
বনানী সরে আসে।
মনে মনে অজয়ের ওপর রাগই হয়। খুঁজে খুঁজে একটা বাড়িও জোগাড় করেছে বটে। একে বস্তি, পরপর লাগোয়া ঘর, তার ওপর কল বাথরুম সব একসঙ্গে। পরপর দশ ঘরের চানটান আর মলমূত্র ত্যাগের জায়গা; কেন আর কোথাও কী কোনো ঘর পাওয়া যাচ্ছিল না। না হয় আর দুটোদিন দেরিই হত। চোখ কান ঝুঁজে না হয় আর কয়েকটা দিন ঐ বেলগাছিয়ার বাড়িতেই কাটিয়ে দিত বনানীরা। অবশ্য ভাবলেও বনানী জানে, সে আর পারছিল না; সহ্য করতে করতে সহ্যের একেবারে শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছিল। এরপরেও ওখানে থাকা মানে কিছু একটা ঘটে যাওয়া। আর সেটা যে বনানীর ওপর দিয়েই যেত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হয় ছেলেটার কিছু হত, না হয় বনানী নিজেই একদিন গলায় দড়ি দিয়ে বসত। অজয় টের পেয়েই তাই হুটপাট করেছে। বস্তি হলেও এমন জায়গায় এসে সংসারটা পেতেছে–। সময় পেলে কী জানি হয়ত অন্য কোথাও এর চেয়ে একটা ভালো ঘরই পেত অজয়।
