খবরের ধাক্কাটা সামলাতে একটু সময় লাগল শ্ৰীমন্তর। তভু যথাসম্ভব উত্তেজনা চেপে শান্ত স্বরে বললেন—আসবেন।
.
সন্ধে সাড়ে ছটায় শ্রীমন্তর গাড়ি আসবে। এখন দুপুর একটা। দেড় ঘণ্টা আগে—অর্থাৎ সাড়ে এগারটায় শ্রীমন্তর ফোন এসেছিল। তার মানেজয়িতার চিঠি বাড়ির পিওন মারফত শ্ৰীমন্তর হাতে পৌঁছে গিয়েছিল এগারোটা নাগাদ। ডেডলাইন ওভার হবার একঘণ্টা আগে।
–এখন ফোনে কিছু বলতে পারছি না। অফিসের চেয়ারে বসে ভয় করছে—যদি আমার উচ্ছাস বাঁধ ভেঙ্গে সব ডেকোরাম ভুলিয়ে দেয় তাই একটু পরেই বেরিয়ে যাচ্ছি। ক্লাবে স্নান-খাওয়া সেরে বাড়ি চলে যাব। খুবই লিমিটেড কয়েকজন উপস্থিত থাকবে। রুবি থাকবে তোমার পরিচৰ্য্যায়। ও-ও ভীষণ খুশি—একটা কথাই শুধু এখন বলছি। মনে হচ্ছে সন্ধেটা আসতে যেন একযুগ দেরি করছে।
—আমারও তাই মনে হচ্ছে।
–ফুলের সাজ! মনে আছে?
—আছে।
—গাড়ি ঠিক সাড়ে ছটায়।
—ঠিক আছে।
—তোমরা আসতে যেন সাতটা-এক না হয়।
–সাতটা বাজতে এক হতে পারে তো?
টেলিফোনের ওপারে হেসেছিল শ্ৰীমন্ত–হ্যাঁ, তা হতে পারে। মোট কথা, ইউ ওন্ট বি লেট বাই ইভেন ওয়ান মিনিট।
–যদি হয়—
—দেখবে আমি নেই!
–তার মানে?
—মানে, আমি উর্ধলোকে—
—ছিঃ,—মিষ্টি ধমক সুরেলা হয়ে উঠেছিল জয়িতার গলায়–আর দ্বিতীয়বার এমন কথা বলবে না।
…তাই এখন বেশ পাশবালিশটা জড়িয়ে শ্ৰীমন্তর ফটোটা আরেকবার মুগ্ধ হয়ে দেখছিল জয়িতা। এর আগে বোধহয় একলক্ষ বার দেখেছে। এরপর এই ফটোর মানুষটাই ফটোটা এখন যেখানে রয়েছে—একদম বুকের ওপর—সেইখানে চলে আসবে।
এই মানুষটা জয়িতাকে পুনর্জন্ম দিল বলা যায়।
বিকেল থেকেই শ্ৰীমন্ত জয়িতার আওয়স-কি-আওয়াজের জন্য কান পেতে থাকবে।
সত্যিই, সন্ধেটা আসতে যেন এক যুগ দেরি।
এবং শ্ৰীমন্তর ছবিটা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল জয়িতা। সব কিছু—অর্থাৎ এখন যেসব জিনিষপত্রগুলো নিয়ে যাবে—তৈরি আছে। চারটের মধ্যে উঠে পড়ে সাজসজ্জা রূপচর্চা। অপরূপা জয়ি যখন সর্বজয়ী রাজকন্যার মতো ঝলমল করে উঠবে—তখনই হয়তো শোনা যাবে শ্ৰীমন্ত গাড়ির হর্ন।
কিন্তু আশ্চর্য, বিধান কি বেরসিক—ঘুমের আগেই একটা দুর্বোধ্য টেলিফোন এলো-থানা থেকে বলছি। আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি—শ্ৰীমন্ত মুখার্জীর বাড়িতে সন্ধেবেলা আপনার যাওয়া উচিত হবে না।
চমকিত উত্তেজনায় কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ফোনটা রেখে দেওয়া হলো ওদিক থেকে।
নিজেকে সামলে নিল জয়িতা। অতীতেও এই ধরনের বহু উটকো টেলিফোন এসেছে অশ্লীল, অশালীন, ভীতি প্রদর্শন, শ্রীমম্ভর নামে কুৎসিত অপবাদ। শ্ৰীমন্ত বলেছিল—অল কুলপিট? ইগনোর দেম। এসব তুচ্ছ ব্যাপার আমাদের সুখ-শান্তি নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে না।
শ্ৰীমন্তর সেই ব্যক্তিত্বপূর্ণ অভয়বাণীগুলো স্মরণ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল জয়িতা।
কিন্তু নিষ্ঠুর রসিক বিধাতার আবার কৌতুক। আবার স্বপ্নে উদিত হলো সেই অতীরে দৃশ্যগুলো সিনেমার মতো।
…জানলার কাছে দাঁড়িয়ে জয়ন্ত। আজ হঠাৎ অফিস থেকে এত তাড়াতাড়ি প্রত্যাবর্ন।
সামনের মুদির দোকান থেকে টুকটাক কয়েকটা রান্নার জিনিষ কিনে ঘরে ঢুকেই জয়ন্তকে দেখে অবাক জয়িতা।
-কি ব্যাপার, আজ এত—
মুখ ফেরায় জয়ন্ত। অতি বিষণ্ণ মুখ।
খুব বিপদে পড়ে গেছি, জয়ি—
–কি হয়েছে?
কোনমতে জিনিষগুলো রেখে প্রায় ছুটে আসে জয়িতা।
জয়ন্ত বলে বিয়ের সময় আগরওয়ালার কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা নিয়েছিলাম। তারপর নানা ঝাটে, দেখতেই পেয়েছ—তোমার অসুখ গেল, বাবা। মারা গেলেন, একটার পর একটা….তাই কিছুই শোধ দেওয়া যায়নি।
চুপ করে যায় জয়ন্ত। জয়িতা অস্থির।
—কিন্তু বিপদটা কি হলো?
আবার মুখ খোলে জয়ন্ত-সুদে-আসলে অঙ্কটা বেশ বড়ই দাঁড়িয়ে গেছে …আজ অফিসে এসে সকলের সামনে বিশ্রিভাবে শাসিয়ে গেল—তিনদিনের মধ্যে
–পুরো টাকা শোধ দিতে হবে।
–কত টাকা?
—তা প্রায় হাজার পাঁচেক হবে।
—পাঁচ হাজার!–এবার জয়িতাও চিন্তিত, বিষণ্ণ।
জয়ন্ত মৃদু কনসেশন শোনায়—আপাতত, পুরোটা না পারলেও, মানে অল্প কিছু দিলেও কদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে।
—অল্প কিছু? কত?
–ধরো, এই হাজার দেড়-দুই—
কিছুক্ষণ কি যেন ভাবে জয়িতা। তারপর নিজের হাতের দু-গাছা চুড়ি, আর কানের দুল দুটো দ্রুত খুলে ফেলে।
—আপাতত এটা ধরো—ম্লান হাসি জয়িতার মুখে।
জয়ন্ত চমকে ওঠে–না না,এটা সম্ভব নয়—
—কেন নয়? এখন মানটা বাঁচাও, তারপর আবার সময়মতো করে দেবে।
না জয়ি, এ পর্যন্ত আমি তোমাকে নিজে থেকে কিছুই দিতে পারিনি। আর এখন, ….তার উপর তোমার বাবা-মা যেটুকু দিয়েছিলেন—আজ যদি তারা বেঁচে থাকতেন কি বলতেন–
–বলতেন—বেশ করেছিস, সংসারের প্রয়োজনেই তো এগুলো দেওয়া। পটের বিবি সেজে থাকার জন্য নয়–
জয়ন্ত স্থবির।
–নাও, ধরো, তুমি তো পরে আবার বানিয়ে দেবে।
–জানি না।…এই তো রোজগার। ধরো, যদি কোনদিনই দিতে না পারি?
–নাই বা পারলে।–এবার জয়িতার মুখে কেমন একটা বিজয়িনীর হাসি।
জয়স্তর গলা দুহাতে জড়ায় জয়িতা, বুকে মাথা রাখে—আমার আসল অলংকার তো এইখানে।
ঠিক এক সময়ে কে যেন উঁচু গলায় চিৎকার করে—কাট্।
ক্যামেরা, আলোর কাজ থেমে যায়।
কোন সুটিং চলছিল?
কে যেন অন্ধকার কোন থেকে বলে ওঠে—একেবারে ভিজে প্যাঁচপ্যাচে সেকেলে রোমান্স হয়ে গেল ডিরেক্টর সাহেব। দর্শক এই বই নেবে কি! নাচ গান ডেয়ারিং প্রেসের দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত দর্শকেরা হল ছেড়ে চলে যাবে।
