.
সরেই জুনের সকাল।
জন্মদিনেও কাজের কামাই দেন না শ্ৰীমন্ত মুখার্জী। তবে তার পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সুন্দরী, আধুনিকা রুবি রায় বিশেষ ব্যস্ত ছিল টেলিফোনে শেষ পর্বের কিছু জরুরি কাজ সারতে। বোঝা গেল, আজকের সন্ধের ‘বসে’র বার্থ-ডে পার্টিতে কবি রায়কে থাকতে হবে। এতদিন বাদে এমন একটা নাটকীয় কাণ্ড হতে চলেছে—শ্ৰীমন্ত মুখার্জী বিয়ে করছেন, বা অফিসিয়ালি সংসারী হওয়ার অঙ্গীকার নিচ্ছেন। সেখানে তার চিরবিশ্বস্ত সহযোগী রুবি রায় না থাকলে চলবে কি করে?
কিন্তু আজ বেশিক্ষণ অফিসে থাকবেন না শ্ৰীমন্ত মুখার্জী। কারণ যে যে এনগেজমেন্ট ও রুটিন প্রোগ্রামগুলো আছে, সেগুলো ঘড়ি ধরে সারতে হবে।
তাই বেলা সাড়ে বারোটার সময় শ্ৰীমন্ত মুখার্জী ও রুবি রায়কে দেখা গেল সাবার্বান সুইমিং ক্লাবে, যেখানে নারীপুরুষের একসাথে জলবিহারে কোন বাধা নেই। সানগ্লাস চোখে ড্রেসিং গাউন জড়িয়ে বেতে চেয়ারে বসে ম্যাগাজিনে চোখ বুলোতে বুলোতে কখন এক বোতল বিয়ার প্রায় শেষ করে এনেছেন শ্ৰীমন্ত মুখার্জী, তখনই লেডিজ ক্লোকরুম থেকে আবির্ভূতা হলো রুবি। তার পাতাল সাদা ওভার-অলের নীচে টকটকে লাল বিকিনি-টু-পিস সুইমিং কম—শ্ৰীমন্ত মুখার্জীর নির্লিপ্ত কালো চশমার ওপর হঠাৎ আলোর ঝলকানি হানল।
চোখ থেকে সানগ্লাস সরিয়ে, ম্যাগাজিনটা হেলায় ছুঁড়ে ফেলে হাসলেন শ্ৰীমন্ত। ছুটে এসে পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরল রুবি। তারপর পাশের চেয়ারটায় বসল।
—আপনাকে আজ রিয়েলি দারুণ চার্মিং লাগছে স্যার রুবি উচ্ছ্বসিত।
হাসলেন শ্ৰীমন্ত রুবি, আজ আমি উনপঞ্চাশে পা দেব। বয়সটা তো শিগগিরই হাফ-সেঞ্চুরি করে ফেলবে। দশ বছর আগে এসব কথায় দারুণ ফ্ল্যাটার্ড হতাম কিন্তু এখন আর–
রুবি মাথা ঝাঁকায়—ফ্ল্যাটারি নয় স্যার, বিশ্বাস করুন, ইউ আর লুকিং ভেরি মাচ হ্যান্ডসাম। বয়স আপনার মাথার চুলে কিছু ছাপ রাখলেও শরীরের আর কোন
জায়গা ছুঁতে পারেনি। বহু ইয়ং ছেলে আপনাকে হিংসে করবে।
শ্ৰীমন্ত আবার হাসে–আঃ রুবি, তুমি এ মাসেই আবার একটা ইনক্রিমেন্ট আদায় করে ছাড়বে!
রুবি মোটেই ঘাবড়াবার পাত্রী নয়—এবার কিন্তু স্যার আমি সত্যিই রাগ করব। আপনার বিজনেসম্যান আত্মাটা কোন সময়েই আপনার মাথা থেকে নামে না। তাই সব কথাতেই মোটিভ ধরে বসেন। আজকে আপনার এবড় একটা শুভদিনে আমি কেন মিথ্যে বলব বলুন তো?
শুভ দিন!
হ্যাঁ, সত্যিই শুভদিন। আজ বেলা এগারটার মধ্যেই চিঠি এসে গেছে অনেক ভেবে মনস্থির করে ফেলেছি। তোমরা দু-চোখের অতল গভীর দৃষ্টির আহ্বানকে ফিরিয়ে দেবার শক্তি আমার নেই..কথা দিলাম—আমি আসছি, তোমার কাছে, চিরদিনের জন্য…। এখন একমাত্র তোমার—জয়িতা।
হঠাৎ কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যান শ্ৰীমন্ত।
—আচ্ছা রুবি, আজকের ব্যাপারটা সত্যি উচিত হচ্ছে তো? তুমি তো সবই জান! নিশ্চয় এতদিনে এটাও বুঝতে পার—সারাজীবন আমি অদ্ভুত এক রাশিচক্রের তাড়নায় একা রয়ে গেছি। হয়তো বাকি জীবনটাও সেভাবেই কেটে যেত। কিন্তু হঠাৎ….
রুবি বাধা দেয়—ওসব চিন্তা ছাড়ুন স্যার। এত বড় কোম্পানির মালিক আপনি, হাজার লোকের সংসার আপনার মুখ চেয়ে থাকে, সবাই আপনাকে শ্রদ্ধা করে—
—কিন্তু কাল থেকে যদি তারা অন্য দৃষ্টিতে দেখতে থাকে? অশ্রদ্ধা আসে? অবকোর্স, আই ডোন্ট কেয়ার—তবু সবাই কি আমাকেই দায়ী করবে না? সবাই কি বলবে না—টাকা আর প্রতিপত্তির জোরে আমি আমার এক নির্দোষ নিরীহ কর্মচারীর ঘর ভেঙ্গে দিলাম?
—মোটেই না। জয়িতাদেবী তো ছেলেমানুষ নন। তিনি স্বেচ্ছায় আপনার কাছে আসছেন। আপনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন কেন? জয়বাবুর ক্ষমতা থাকলে ওকে আটকে রাখুক। আপনি তো কোন জোর করছেন না।
ধীরে ধীরে মেঘ কাটে। শ্ৰীমরে মনের মেঘ। হা রুবি তো যুক্তিসঙ্গত কথাই বলছে।
আবার হাসেন শ্ৰীমন্ত-এবার তোমার কথা বলো। তোমার আর কিরণের বিয়ে কবে হচ্ছে?
লজ্জা পাওয়ার মেয়ে না হয়েও একটু লজ্জা পায় রুবি।
—তার জন্য তাড়া কিসের?
—দেরিও বা কিরে? সারা জীবন শুধু প্রেম করেই কাটিয়ে দেবে? আমরা নেমন্তন্ন খেতে পাব না।
কথা ঘোরায় রুবি স্যার ঘড়ি দেখুন, টাইম পেরিয়ে যাচ্ছে।
ঘড়ি দেখে চমকে ওঠেন শ্ৰীমন্ত। সত্যিই তো অনেকটা সময় কেটে গেছে। বলেন—অল রাইট, ইউ দেন গেট রেডি।
আমি তো রেডি বলে ওভারঅল লাল-বিকিনি পরা মোমের পুতুল হয়ে যায় রুবি। মাথায় ক্যাপটা লাগাতে লাগাতে ডাইভিং বোর্ডের দিকে এগোয়।
–আমি এগোচ্ছি, আপনি আসুন।
ঝপাং।
রুবির ডাইভের জলশব্দ শোনা যায়। ড্রেসিং গাউন খুলে মানের পোষাকে সাঁতারের জন্য প্রস্তুত হন শ্ৰীমন্ত। এবং ঠিক সেই সময়েই কোনায় রাখা টেলিফোন বেজে ওঠে।
ক্রিং ক্রিং! ক্রিং ক্রিং!
আবার ড্রেসিং গাউন জড়িয়ে টেলিফোন ধরেন শ্ৰীমন্ত।
হ্যালো। ওপারে পুলিশ অফিসারের বরফ শীতল গলা—
—আমি এস. পি. বলছি। সন্ধেবেলা বাড়িতে থাকবেন। আনফরচুনেটলি, আমাদের ডিউটি আমাদের করতে হবে। ইনকাম ট্যাক্স, বৈদেশিক মুদ্রা আইন ইত্যাদি আরও কয়েকটি ইকোনমিক অফেন্সের জন্য আপনাকে গ্রেপ্তার করতে হচ্ছে। বাড়িতে ফোন করে জানলাম—আজ আপনাদের একটা সামাজিক ঘরোয়া অনুষ্ঠান আছে তাই। আমরা একটু রাত করেই যাব। সাপোেজ, অ্যারাউন্ড ও ইলেভেন—ততক্ষণে নিশ্চয়….
