জয়িতার পূজারিণী বেশ। লালপাড় সাদা শাড়ি। খালি গা। আঁচল জড়ানো। অপূর্ব সুন্দরী ভক্তিমতীরূপ। জয়িতা গাইছে কব আও গে মহারাজ…
…হঠাৎ দরজার কাছে জয়রে আগমন। পরণে গেঞ্জি ধুতি। শান্ত সৌম্য চেহারা।
ওদের এই দীনদরিদ্র ভাড়াটে বাড়ির ওরা নিজেরাই একটা নামকরণ করেছিলঃ জয়-জয়িতা। লোকে ভুল কেরে প্রথমে পড়তঃ জয়-জয়ন্তী।
আরাধনার গানে চোখ বুজে থাকা জয়িতা টেরই পায়নি জয়ন্তের চুপিসারে উপস্থিত। তাই বাধ্য হয়ে দরজায় জোরে টোকা মারে জয়ন্ত। টক-টক-টক।
চোখ খোলে জয়িতা, বিস্মিত এবং ব্রিজ।
–একি, এই সময়ে? পুজোর ঘরে?
—কেন, পুজোর ঘরটায় আমার কোন অধিকার নেই নাকি। আমি এতই পাপী—
ধমকের সুর জয়িতার কণ্ঠে—যাও, চান সেরে নাও। কটা বাজল খেয়াল নেই। আজ লেট হলে মাইনে কাটবেওয়ার্নিং দিয়েছে না?
জয়ন্তর মধ্যে নড়বার কোন লক্ষণ প্রকাশ পেল না। সূরাং চোখ বুজে গান শুরু করতে গিয়ে আবার বাধা পায় জয়িতা। জয় মতলবমার্কা উপস্থিতি।
একি, তবু দাঁড়িয়ে আছ? যাও বলছি। বললাম তো–আমি আসছি।
—আর কতক্ষণ?
–মানে?
—মানে—আর কতক্ষণ শুধু দেবতার আরাধনা চলবে। ঘরের প্রাণীটা যে আর ধৈৰ্য্য ধরতে পারছে না। সে তো দেবতা নয়, মানুষ।
জয়িতার কাঁধের আঁচল সরে গিয়েছিল। সেদিকে নজর পড়ে জয়জ্ঞ। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে গায়ের আঁচল ঠিক করে জয়িতা।
–খবরদার, কোন অসভ্যতা করবে না।
—কিন্তু আমার যে ভীষণ ছুঁতে ইচ্ছে করছে তোমায়। একটুখানি, সামান্য, প্লিজ ….
–সাবধান, ওই বাসি কাপড়ে ঠাকুর ঘরে ঢুকবে না কিন্তু। যাও, স্নান সেরে নাও। ভাত ফুটে এসেছে।
জয়ন্ত তবু দাঁড়িয়ে। এইবার তাই সুর নরম করে জয়িতা লক্ষ্মী সোনা আমার যাও—
–যাচ্ছি। কিন্তু আর বেশিক্ষণ ধৈর্য ধরতে পারব না…আরে পতিদেবতাও কিছু পুজো চাইতে পারে। গানটান নাইবা হলো—কিন্তু–
—আবার অসভ্যতা। তুমি যাবে?
হাসতে থাকে জয়ন্ত–যাচ্ছিঃ। বাব্বা, স্বামীকে কেউ এইভাবে দূর-দূর করে ওঠে! জয়ন্ত চলে যায়।
জয়িতাও হাসে-ই, পতিদেবতা!
তারপরে বিগ্রহকে প্রণাম করে, গান শুরু করে।
পরের দৃশ্য :
স্নান সেরে খেতে বসেছে জয়ন্ত। মাটিতে পাত-পাতা। পাশে হাতপাখা হাতে জয়িতা। জয় পরনে সুপারভাইজারের ইউনিফর্ম। কারখানার।
জয়িতার নজর যায়জামার একটা বোম নেই।
–আঃ, আবার সেই ছেঁড়া জামাটাই গায়ে দিলে। কেন আরেকটা যে ইস্ত্রি করে রাখলাম।
জল খায় জয়-ওটা এখন প্রলে চলবে না। কাল ফ্যাক্টরিতে আমাদের একটা গেট-টুগেদার আছে। কারখানার ওয়ার্কাস রিক্রিয়েশন ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস। মালিক শ্রীমবাবু আসবেন। ওটা তাই কালকের জন্য ভোলা থাক। আজ এটা দিয়েই
মুখ ধুতে ধুতে আরেকটা সারপ্রাইজ ঘোষণা করে জয়ন্ত—তাড়াতাড়ি ফিরব। নাইট শো সিনেমায় যাব—ভুলে গেছ?
–একে দেরি করে যাচ্ছ, কি করে তাড়াতাড়ি ফিরবে?
—ম্যানেজ করতে হবে।
বেরিয়ে যাবার জন্য তৈরি হয় জয়ন্ত।
জয়িতা খুশিই, ম্যানেজ মাস্টার।
তারপরেই ভীষণ গম্ভীর মুখ
—আমি যাব না।
—সে কি, আবার হাঁড়িমুখ করার কি হলো।
হঠাৎ জয়িতার মনের কিছু জমাট ক্ষোভ কথার বাম্প হয়ে বেরিয়ে আসে—মাসের শেষ। দুধের টাকা বাকি। রেশন আনা হয়নি।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকায় জয়িতা। অর্থাৎ জয়ন্ত্রে কাছে মুখের ভাব গোপন করতে চায়।
–বাড়িওয়ালার বৌ কাল খোঁটা দিয়ে গেছে। হুঃ, এই সময় সিনেমা।
জয়ন্ত বিরক্ত—এই একঘেয়ে, কথাগুলো আর ভালো লাগে না।
ঘুরে জয় মুখোমুখি হয় জয়িতা। চোখের কোণায় জল—কিন্তু কথাগুলো কি মিথ্যে?
এগিয়ে আসে জয়ন্ত। জয়িতার দুকাঁধে হাত রেখে বলে—তাই বলে কি সব সময়, সমস্ত মুহূর্তে শুধু অভাবের ব্যাপারগুলোকে পুজো করতে হবে?
জয়িতার চিবুকে আঙুল ঠেকিয়ে মুখটা তুলে ধরে জয়ন্ত। চুমুর মুডটা তৈরি হয়নি এখনও।
—আরে বাবা, গরীরেও যেটুকু সাধ-আহলাদ থাকে, সেটা আপনা থেকে পূরণ হয় না। বেশ খানিকটা চেষ্টা করে মেটাতে হয়। রাতদিন খালি গেলাম, মরলাম, এটা নেই, সেটা নেই, কাল কি হবে—এই ভাবতে থাকলে জীবনটা যে বরবাদ হয়ে যাবে।
জয়িতার রাগ কমে এলেও, রেশটুকু রয়েছে।
-হ্যাঁ, তাই চারদিকে খোঁচাসানটা-তাগাদা খেয়েও সেজেগুঁজে লোক হাসিয়ে সিনেমা যাওয়া চাই।
জয়ন্ত হাসে–চাই-ই তো। গরীব বড়লোক যাই বল, প্রত্যেক মানুষের সুখী হবর অধিকার আছে।
আরও জোরে হাসতে থাকে এবং তারপরেই জয়িতাকে বুকের মধ্যে সজোরে চেপে ধরে। যেন হারিয়ে যাবে জয়িতা। জয়িতা ঠোঁটের উপর আলতো কামড় দেয় জয়ন্ত। জয়িতার ‘উঃ শুনে বলে—আগে বলো—ঠিক বলেছি কিনা, নইলে কিন্তু আরও জোরে!
মুক্তি পাবার জন্যই হোক, অথবা স্বামী সোহাগে মানসিক বিবর্তনে হোক, জয়িতা বলে—ঠিক বলেছ।
এইবার ঘর ছেড়ে রেবার আগে গান ধরে জয়ন্ত–
—মোরা গরীব হতে পারি,
(তা বলে) সুখের সাথে নয়তো আড়ি–
(তাই) মুখ কোর না হাঁড়ি।
শেষ দৃশ্য :
জয়ন্ত রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে কারখানার দিকে যাচ্ছে। জানলা দিয়ে হাত নাড়ে জয়িতা। একটু জোরে বলে—তাড়াতাড়ি ফিরো–
জয়ন্ত সম্মতিসূচক হাত নাড়ে। দূরে মিলিয়ে যায় সাইকেল।…
ঝনঝন করে কি যেন ভাঙল কোথাও। মনে হয় কাঁচের কোন জিনিস।
ঘুম ভেঙে যায় জয়িতার, আজকের জয়িতার। দুগ্ধফেনিল শয্যায়। চমকে উঠে বসে। জানলার ওপারে আকাশ সাদাটে-ঘোলাটে হয়ে এসেছে।
