আমাদের এই কারখানা আসলে একটা ফ্যামিলি। লক্ষ করেছ—এখানে লেবার ট্রাবল হয় না। আমার বাবা এটাকে মানি-মেকিং-মেশিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। আমিও সেই ট্রাডিশন মেনে আসছি। আমার কারখানায় সিনসিয়ারিটির দাম সবচেয়ে বেশি। অ্যান্ড আই ফাউন্ড ইউ টু বি আ ভেরি সিনসিয়ার ওয়ার্কম্যান। সো দিস ফ্ল্যাট আলাউয়েন্স ইজ আ রিওয়ার্ড টু ইউ।একটা ভালো দেখে ফ্ল্যাট খুঁজে নাও তাড়াতাড়ি। সাউথ ব্লকে পাবে। পেতে অসুবিধে হলে, আমায় জানিও।
-স্যার, আমি এতটা আশা করতে পারিনি, আপনি সত্যিই—
–প্লিজ স্টপ। আমার কোন কথা এর মধ্যে নেই।
জয়ন্ত কোনমতে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসছিল। শ্ৰীমন্ত মুখার্জীর জলদগম্ভীর ডাক শুনে আবার দাঁড়াতে হলো।
—শোন। রিমেম্বার দিস অফার ইজ টেম্পোরারি। এভিরিথিং ডিপেন্ডস্ অন হাউ ইউ ক্যারি অন….ও.কে?
-ইয়েস স্যার।
—ফ্ল্যাটে শিফট করেই আমাকে জানাবে। তোমার বাড়ির পুরনো মালপত্র বিশেষ নিও না। আমার ইনটিরিওর ডেকর ওটা সাজিয়ে দেবে। এর ফাইনেন্সিয়াল সাইডটা তোমাকে ভাবতে হবে না। .ধরে নাও, দিস উইল বি মাই গিফট টু জয়িতা—সেদিন ওর গান আমাকে সত্যিই চামড় করে দিয়েছিল—অ্যান্ড আই প্রমিজড় হার আ রিওয়ার্ড।
শ্ৰীমন্ত কথা থামিয়ে জয়ন্তর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিলেন। বিস্মিত জয়ন্ত আরও হবাক। বাশক্তি ফিরে পেয়ে আবার ‘ধন্যবাদ’ বলতে চাইল, কিন্তু গলার স্বর জড়িয়ে গেল।
–কাট ইট। ঐ থ্যাংকস গিভিংটা আমি জয়িতার মুখ থেকে শুনতে চাইব। …সো লঙ…
অর্থাৎ এখন তুমি যেতে পার। ভদ্র ভাষায় ‘গেট-আউট’।
কিন্তু তখনও কি জয়ন্ত বুঝেছিল তাকে জয়িতার জীবন থেকেও ‘আউট’ করে দেওয়া হবে? কে জানে!
ঢং! রাত্রি আড়াইটা। সতেরই জুন তো বারোটার পর থেকেই শুরু হয়ে গেছ। বেলা বারোটা আর মাত্র সাড়েন’ঘণ্টা দূরে। শ্রীমন্তের প্রতীক্ষা অবসানের এবং চূড়ান্ত সিদ্ধারে ডেলাইন।
এখনও কোন প্রশ্ন এলো না রোবটের মুখ থেকে।
বেপরোয়া জয়িতা তাই নিজেই এবার প্রশ্ন করতে বাধ্য হলো। লোকটাকে দিয়ে কিছু কথা বলাতেই হবে!
–ধারণা করতে পারছ নিশ্চয়—কোথায় যাচ্ছি।
–না। এতক্ষণে মুখ খুলল রোবট।
—শিট!
ক্ষিপ্ত, ডিসগাস্টেড জয়িতা ভাবল–এই লোকটাকে নিয়ে এতদিন সে ঘর। করেছে কি করে। অবশ্য সাথে সাথে এটাও ভাবতে বাধ্য হলোনা, লোকটা প্রথম থেকে তো এমন ছিল না। সাত-আট মাস হলো এমন বদলে গেছে। যেন অর্ধ-উন্মাদ।
তাই একটু ভয়ও জেগেছে জয়িতার মনে। সব কিছুই যারা মানতে থাকে, সব কথাতেই ইয়েস বলে—তারা ঠিক সুবিধের হয় না।
অ্যাবরাপ্টলি জ্যাম্পকাটের টেকনিক্ নিল জয়িতা। কাগজপত্র পরশু পেয়ে যাবে। সই করে দেবে। তারিখ বসিও না।
রোবট চুপ।
—কি এখনও বোঝনি, কোথায় যাচ্ছি আমি। আর কি ঘটতে চলেছে? আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে?
–বুঝেছি।
—কি বুঝেছ?
–যে ঘরে, যেখানে তোমায় মানায়, তুমি সেই ঘরে যাচ্ছ।
—তোমার কিছু বলার আছে?
–না।
—কেন নেই?—হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে কেমন বোকার মতো প্রশ্ন করে ওঠে জয়িতা। অবার এই প্রশ্ন—যার উত্তরের কোন প্রয়োজন নেই। বু মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে কথাটা।
—তোমার যেটা যোগ্য, উপযুক্ত স্থান, সেখানেই তুমি যাচ্ছ। আমি তো তোমায় তোমার উচিত জায়গা দিতে পারিনি।
-সেটা বুঝতে পেরেছ?
–বুঝেছি বলেই তো বললাম।
–কবে থেকে বুঝেছ?
-যেদিন শ্ৰীমন্ত মুখার্জী প্রথম আমাদের সেই পুরনো বাড়িতে এলেন। সেদিন থেকে। প্রায় বছরখানেক আগে।
–সবই যখন এতদিন ধরে বুঝেছ, তখন এমন কিছুই বোঝনি ভান করতে কেন?
—তোমার কোন অসুবিধে ঘটাতে চাইনি, আর—
–আর?
—আর এ সময়টার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম—কখন তুমি চলে যাবার কথা বলবে, পাকাঁপাকি সিদ্ধান্ত নেবে।
-ওঃ, বুঝেও ভেজা বেড়ালের মতো চলতে?
—বেড়ালটাকে ভিজিয়ে দেওয়া হয়েছে, ঠাণ্ডায় কাঁপছে। কি করবে সে?
–বঃ ব্রেভো, এত সুন্দর কথা বলতে কবে শিখলে?
–অবস্থাই শিখিয়ে দিল।
এইবার বুঝল জয়িতা, ভুল হচ্ছে। রোবট আবার মানুষ হয়ে উঠছে। প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। এবং সেটার জন্য জয়িতাই দায়ী। যে কোন মুহূর্তে কথাবার্তা অন্যদিকে মোড় নেবে। সাবধান হতে হবে। কাজের কথা সব সেরে ফেলতে হবে। মোটামুটি সারা হয়ে গেছে অবশ্য।
তবু আবার অকস্মাৎ অসাবধানতা—তোমার কোন কষ্ট হচ্ছে না।
–কষ্ট?
—হ্যাঁ, মানে, কোন অসুবিধে–
—অসুবিধে হচ্ছে না। কষ্ট হচ্ছে।
জয় উত্তর অতি স্পষ্ট।
সর্বনাশ। আবার আত্মহত্যাপ্রবণ কথাবার্তা চলে আসছে। জয়িতা করছে কি!
—এই কষ্ট ক’দিনের মাত্র। পরে বই ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া ডিভোর্সের পর তুমি তো বিয়েও করতে পারবে।
—এ কষ্ট আমার চিরদিন থাকবে।
চলে যায় জয়ন্ত। ধীর পায়ে।
.
আলো নিভিয়ে আবার যখন জয়িতা নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মগ্ন, তখন রাত তিনটে। শ্রীমঙ্ক চেহারাটা আর আগামীকালের কিছু ঘটনার কাল্পনিক দৃশ্য সিনেমার মতো দেখতে দেখতে ঘুমাবার চেষ্টা করল সে।
সিনেমা সে দেখল-ও বটে! তবে সম্পূর্ণ অকল্পনীয় কয়েকটি দৃশ্য। আজ থেকে বহু বছর আগে, বিয়ের কয়েক মাস পরের সময়ের একটি ছোট্ট টি.ভি. সিরিয়াল। এক পর্বের, আধ-ঘণ্টার মতো।
দৃশ্যটা এই রকম।
…ঠাকুর ঘর। রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ। নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরোয়া পরিবেশ। মীরাভজন গাইছে জয়িতা…অব শুনি ম্যয় হরি আওয়ন কি আওয়াজ….।
