তাই সেইরাতে ঘরে বজ্রপাতটা তো জয়ন্তই নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনেছিল। আগের ঘটনাগুলো থেকেই তো চোখের ঠুলি খসে পড়ার কথা। তাই বজ্র কহে, দূরে আমি থাকি যতক্ষণ’—তখন কেউ আমার অস্তিত্ব টের পায় না। মাথায় পড়িলে তবে বলে বজ্র বটে।
ঠিক তাই। জয়ন্তের মাথায় বাজ ফেলেই টের পাওয়াতে হলোবাজ পড়েছে বটে।
আজ রাতে তাই বেচারা, পুওর ফেলো জয়ন্তকে এখন—প্রায় মাঝ রাতে তুলতে হবে। নাকি, কথাটা কাল বললেও চলবে?
চিঠিটা খামে এঁটে একটু ভাবল জয়িতা।
না, না, কেমন যেন টেনশন হচ্ছে। এখন মনটা ঠিক মুডে আছে। কাল দিনের বেলা ‘পুওর ফেললা’র গোবেচারা মুখ দেখে আবার যদি ধন্দ শুরু হয়।
না, এখনই বিহিত করতে হবে। এই ক-মাস প্রচুর ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। অনেক সময় পার হয়ে গেছে। কাল শ্ৰীমন্তর—জন্মদিন। কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে না। শ্ৰীমন্দ্র বিশাল ড্রইংরুমটা অবশ্য নতুন সাজে সাজবে। ফুল ভালোবাসে জয়িতা। তাই ফুলের আসর বসবে। আর শ্ৰীমন্তর একান্ত সাধ—ফুলের গয়না পরবে জয়িতা!
গাড়ি আসবে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে ছ’টায়। জয়িতা শ্ৰীমন্তর বাড়ি পৌঁছবে সাতটা? আটটায় আসবেন কয়েকজন। রেজিষ্ট্রেশন ম্যারেজের notice এ সই করবে।
শ্ৰীমন্ত ও জয়িতা। তারপর
তারপর কি, জয়িতাও জানে না।
কিন্তু এত পরিকল্পনা অনেক আগে জেনেও, বহুবার শ্রীমত্র বান্ধনে ধরা দিয়েও, বহুবার ঠোঁটের লিপস্টিকের আস্তরণ নষ্ট করেও, পরিষ্কার হ্যাঁ’-টা বলা হয়ে ওঠেনি জয়িতার।
তাই পরশু আল্টিমেটাম এসেছে। বিরহ-যাতনার অভিমানী বিদায়সম্ভাষণঃ ‘আগামী সতেরই জুন আমার জন্মদিন। ঐ দিন আমার আটচল্লিশ বক্স পূর্ণ হবে। উনপঞ্চাশে পা দেওয়ার মুহূর্তটা যদি আমার একা কেটে যায়, তবে বাকি জীবনটাও তাই কাটবে—যেমন কেটে এসেছে।
…মাঝে মাত্র একটা দিন, একটা রাত। কাল ২৭ জুন, আমাকে মানসিকভাবে হত্যা করার জন্য অথবা নতুন জীবন দানের জন্য তুমি দায়ী থাকবে। আমি ১৭ জুন সকাল বারোটা পর্যন্ত তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকব। বারোটা পার হয়ে গেলে…কি হবে, আমিও জানি না। …শ্ৰীমন্ত।
সর্বনাশ।
এখন রাত দুটো। কাল সকাল বারোটা তো এসে গেল।
ড্রেসিং গাউন জড়িয়ে দরজা খুলে বাইরে এসে লাউঞ্জের আলো জ্বালল জয়িতা। বেশ ভালোই জানে সে-জয়য়ে ঘুম পাতলা। তবু একটু উঁচু স্বরেই ডাকল—একবার একটু উঠতে হবে। দরকার আছে।
অ্যাজ এক্সপেক্টেড, ধড়মড় করে উঠে বসল জয়ন্ত। সোফা-কাম-বেডে তাড়াতাড়ি উঠে বসতে গিয়ে চাদরটা মুখেনাকে জড়িয়ে একটা কৌতুকবহ অবস্থার সৃষ্টি করে ফেলল, তাই এত সিরিয়াস সুগম্ভীর অবস্থাতেও হাসি পেল জয়িতার আহা, বেচারা। বড় ঘরটা এক সুন্দর সাজানো ড্রইং রুম যেখানে শ্ৰীমন্ত এসে বসে। তাই পত্নীপরিত্যক্তা স্বামীর আলাদা কথা এই ইনসাইড লাউঞ্জ। শয্যা সোফা কাম বেড। এখানে তো খাটিয়া পাতা সম্ভব নয়। প্রথমে একটা ক্যাম্প-খাট ছিল। ক্রমশ জয় শয্যা প্রমোশন পেয়ে এখন একটা সোফা কাম-বেড পেয়েছে। দিনের বেলা এটা সোফা, রাতে বেড।
স্বামীর স্পর্শ ও সংস্পর্শ–বিশেষ করে নৈশকালীন সংস্পর্শ—এড়াতে এর চেয়ে সুন্দর ও সহজ উপায় আর কি আছে?
–কি হয়েছে?–উৎকণ্ঠিত জয়ন্ত।
–মুখটা ধুয়ে আমার ঘরে এখুনিই একবার এসো।
যো হুকুম! আজ বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল জয়ন্ত শুধু জরুকা-গোলাম নয়; কেমন একটা রোবটে পরিণত হয়ে গেছে।
নিজের ঘরে দুগ্ধ ফেনিল শয্যার ওপর বেশ রিল্যাক্স করেই বসল জয়িতা। জয়ন্ত সামনে দাঁড়িয়ে। একটা চেয়ার রয়েছে। কিন্তু বসার স্কুম না হলে
—বেচারা!—আবার মনে মনে হাসল জয়িতা। বলল বসো।
যো হুকুম! বসল জয়ন্ত। যেন মালকিনের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় বিশ্বস্ত ভৃত্য কৃতার্থ হলো বসার মর্যাদা পেয়ে।
–শোন, কালকে কথাটা বলার সময় হবে না। সকাল থেকেই ব্যস্ত থাকব। তাছাড়া একেবারে শেষ মুহূর্তে জানালে তোমারও কিছু অসুবিধা হতে পারে। তাই
জয়ন্তের ভাবলেশহীন মুখ। আজকাল প্রতিক্রিয়া বিশেষ বোঝা যায় না, তাছাড়া রোবটের আবার প্রতিক্রিয়া কিসের। কিন্তু এই মুহূর্তে জয়িতার কথায় রোবটের চোখেও যেন এক বিস্ময়ের প্রশ্নালু দৃষ্টি জেগে উঠল। কিন্তু কোন কথা নেই!
সামান্য ‘পজ’ দিয়ে জয়িতা বলল—খুব একটা নতুন ব্যাপার নয়। আমার ধারণা—তুমি এতদিনে বিষয়টা বুঝেছ।
আবার পজ, সংক্ষিপ্ত বিরতি কথার মধ্যে, পারফেক্ট ড্রামাটিক সাসপেন্স, বজায় রেখে।
রোবটের প্রশ্নালু দৃষ্টি আরেকটু গভীর হলো মাত্র। কিন্তু এখনও কোন বাক্যস্ফুর্তি নয়।
জয়িতা বুঝল-আর ভণিতা করে সময় নষ্টে লাভ নেই। এ হেন আকাট লোককে সোজাসুজি ‘হিট’ করাই ভালো। এরা বোধহয় সফিস্টিকেটে ভাষা বোঝে না। শিল্পসম্মত কলা-কৌশল, ভঙ্গী, ইঙ্গিত এদের বুদ্ধির অগম্য।
-শোন, কাল আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আর ফিরব না। আমার সামান্য কিছু জিনিষপত্র পরে নিয়ে যাব। তুমি এই ফ্ল্যাটে ইচ্ছে হলে থাকতে পার, বা অন্যত্র খুশি মতো কোথাও চলে যেতে পার। সেটা তোমার ব্যাপার।
ফ্ল্যাট! সত্যি এটা তো ফ্ল্যাট। যার ভাড়া প্রায় দু’হাজার টাকা। এবং সেটা শ্ৰীমন্ত মুখার্জী একটা এক্সেপশনাল ফেবার করে জয়ন্তকে দেন। এই রকম এইচ. আর. এ —অর্থাৎ হাউস রেস্ট অ্যালাউন্স জয়ন্তর মতো সুপারভাইজার-এর পাওয়ার কথা নয়। তবু পেয়েছে জয়ন্ত, এবং কেন পেয়েছে-সেটা বুঝেছে কিনা কে জানে। এই স্পেশাল অফারটার সময় অস্ফুট মৃদু প্রতিবাদ করেছিল বটে। কিন্তু শ্ৰীমন্ত মুখার্জী মালিক, তার উপর সুবক্তা।
