পা দুটো ভেঙে আসছে বাদলের, বুকটা হাপড়ের মতো ওঠানামা করছে আর মাথাটা যেন চরকির মতো ঘুরছে।
তবু নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করল সে। প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু গ্রামে ঢোকার মুখে যে মাঠ সেই মাঠের ধারে এসে লুটিয়ে পড়ল সে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
মাঠের ওপারে গ্রামের মসজিদ।
ফজরের নামাজ শেষ করে মাত্র বেরিয়েছেন মির্জা সাহেব। তাঁর সঙ্গে জলিল মোতালেব সোনামিয়া ও তালেব। ছুটতে ছুটিতে মাঠপারে এসে যে একজন মানুষ লুটিয়ে পড়ল এই দৃশ্যটা প্রথমে দেখলেন মির্জা সাহেব। অবাক হয়ে সঙ্গের লোকদের দিকে তাকালেন তিনি। ব্যাপারটা
কী? কে ওইভাবে পড়ে গেল?
ততোক্ষণে অন্যদের চোখেও পড়েছে দৃশ্যটা।
তালেব বলল, চলেন তো দেখি।
চারজন মানুষ পা চালিয়ে বাদলের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বাদলকে দেখে দিশেহারা হয়ে গেল।
মির্জা সাহেব বললেন, আরে এ তো বাদল! আমার ছেলে?
তারপর দুহাতে বাদলকে প্রায় কোলে টেনে নিলেন তিনি। বাদল, বাবা, বাবা, তুই কোত্থেকে এলি? কী হয়েছে?
ততোক্ষণে মাঠপারে ম্যালা লোকজন। মির্জা বাড়ির পুরনো গোমস্তা নবু, দশ বারো বছরের কাজের ছেলে বিলু।
বাদালের মুখের দিকে তাকিয়ে নবু বলল, ভাইয়ে ফিট হইয়া গেছে। একদম ফিট হইয়া গেছে।
মির্জা সাহেব অস্থির গলায় বললেন, কিন্তু বাদল তো ছিল ঢাকায়। সূর্যসেন হলে থাকে, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। সে এভাবে কোত্থেকে এল?
সোনামিয়া বলল, এইসব কথা পরে বলেন। আগে জলধর ডাক্তাররে খবর দেন।
মির্জা সাহেব বিলুর দিকে তাকালেন। বিলু, তুই যা। তাড়াতাড়ি গিয়া জলধররে নিয়া আয়।
সঙ্গে সঙ্গে জলধর ডাক্তারের বাড়ির দিকে ছুটল বিলু।
জলধরকে নিয়ে বিলু যখন ফিরল বাদলকে ততোক্ষণে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। বড়ঘরের পালঙ্কে শুয়ে আছে সে। এখনও জ্ঞান ফেরেনি। তার চারপাশে প্রচুর লোকজন। মির্জা সাহেব, তাঁর স্ত্রী বকুল এবং তেরো চৌদ্দ বছরের মেয়ে খুকি। খুকি এবং বকুল দুজনেই কাঁদছে। বকুল বিলাপের সুরে বলছেন, হায় হায় কী হল আমার ছেলের! বাদল, বাদল!
জলধর ডাক্তার আস্তেধীরে পানির ছিটা দিচ্ছিলেন বাদলের মুখে।
এক সময় চোখ খুলল বাদল। চোখ দুটো টকটকে লাল, এবং সেই চোখে আতংকিত দৃষ্টি। ভয়ার্ত ভঙ্গিতে সে বলল, আমি কোথায়? এ্যা, কোথায় আমি? কোথায়?
ছেলের মুখের ওপর ঝুঁকে বকুল বললেন, বাড়িতে বাবা। তুমি এখন বাড়িতে।
বাড়িতে এসে পড়েছি?
মির্জা সাহেব বললেন, হ্যাঁ বাবা। বাড়িতে এসে পড়েছ।
এবার মির্জা সাহেবের দিকে তাকাল বাদল। বাবা, বাবা…
কথা শেষ না করে মায়ের দিকে তাকাল। মা মা, সব শেষ হয়ে গেছে মা। সব শেষ হয়ে গেছে। হলের একটি ছেলেও বেঁচে নেই। যাকে যাকে পেয়েছে সবাইকে গুলি করে মেরেছে। সবাইকে।
বলিস কী?
হ্যাঁ মা। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় লাশ। শুধু লাশ, শুধু লাশ। রাত দুপুরে লাশের ওপর দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে সদরঘাট পর্যন্ত এসেছি। তারপর নদী পার হয়ে….।
বাদলের কথা শুনে আতঙ্কিত গলায় জলধর বললেন, সর্বনাশ! ঢাকায় আর্মি নেমে গেছে? কিলিং শুরু হয়ে গেছে?
বাদল বলল, ডাক্তার কাকা, ডাক্তার কাকা, হলের মেয়েদেরকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে। রাজারবাগে পুলিশদের সঙ্গে ওদের যুদ্ধ হয়েছে। মানুষ মেরে শেষ করে ফেলেছে ওরা। আমি কোনও রকমে বেঁচে এসেছি।
জলধর চিন্তিত গলায় বললেন, বঙ্গবন্ধুর কথা মতো এখন তাহলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।
.
০২.
বনসীমান্ত গ্রামের স্কুল মাঠ আজ লোকে লোকারণ্য।
মাঠের মাঝখানে লম্বা একখানা বাঁশ পোতা। কিছুদিন আগেও এই বাঁশের মাথায় উঠে যেত পাকিস্তানি পতাকা। স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা সার ধরে দাঁড়িয়ে গাইতো ‘পাক ছার জমিন’।
সেই বাঁশের মাথায় বাদল আজ তুলছে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা পতাকা। এই দৃশ্য দেখতে বনসীমান্তের লোকজন তো বটেই, চারপাশের গ্রামের লোকজনরাও এসে জুটেছে।
বাদলের অদূরে সার ধরে দাঁড়িয়ে আছে পনের বিশজন যুবক। তাদের সঙ্গে কয়েকজন মধ্যবয়সীও আছে। প্রত্যেকের হাতে বাঁশের লাঠি। দূরে ভিড় করে আছে মানুষজন। নবু এবং বিলুও আছে।
পতাকা তোলা শেষ করে পতাকার উদ্দেশে স্যালুট করল বাদল। তার দেখাদেখি সার ধরে দাঁড়ানো যুবকরাও করল।
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো বিলুর খুব ভাল লাগল ব্যাপারটা। সেও বাদলের মতো করে স্যালুট করল পতাকাকে।
.
০৩.
খালেকের চায়ের দোকানে আজকাল ভিড়টা যেন একটু বেশি হয়।
বাজারের তিনটি চায়ের দোকানের মধ্যে তার দোকানে ভিড় বেশি হওয়ার কারণ খালেকের দোকানে একটা ট্রানজিস্টার আছে। মারফি কোম্পানীর লাল রংয়ের ট্রানজিস্টার। যতক্ষণ দোকান খোলা ততোক্ষণ ট্রানজিস্টারটা সে বাজায়। ওই শুনতে গাহাকরা ভিড় করে।
আজ বিকেলে দোকানে বসে ট্রানজিস্টারের নব ঘোরাচ্ছে খালেক। দোকানে গাহাক আছে ভালই। কিন্তু কে কে আছে না আছে সেদিকে যেন খেয়াল নেই খালেকের।
খালেকের মনোযোগ আকর্ষণের জন্যই কি না কে জানে, তালেব বলল, খালেক, তুমি কি আকাশবাণী কলিকাতা ধরতাছ?
খালেক কথা বলল না।
জলিল বলল, রেডিও পাকিস্তান ঢাকা ধর মিয়া।
এবার জলিলের দিকে তাকাল খালেক। ক্যান?
ঢাকার খবর হইল আসল খবর।
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল মোতালেব। কে কইছে তোমারে?
