যাহ।
সত্যি।
আমি কি শিশু যে আমাকে তুমি কোলে নেবে।
অপরার মুখের কাছে মুখ নিয়ে দিপু বলল, না তুমি শিশু নও। তুমি হচ্ছ আমার ভবিষ্যৎ শিশুর মা।
কিছুক্ষণ পরই এই রুমে ফিরে এলেন রেখা। তার হাতে ভেলভেটের ছোট্ট একটা অর্নামেন্ট বক্স। অপরার পাশে বসে বক্সটা খুললেন তিনি। ডায়মন্ডের সুন্দর একটা নাকফুল বের করলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে বিজনেসের কাজে বেলজিয়াম গিয়েছিলেন দিপুর বাবা। তুমি নিশ্চয় জানো ডায়মন্ড সবচে’ ভাল পাওয়া যায় বেলজিয়ামে। সেখান থেকে তিনটি ডায়মন্ড এনেছিলেন। তার একটি দিয়ে নিজেই এই নাকফুলটা করিয়ে ছিলেন। করিয়ে ছিলেন আমার জন্যই। কিন্তু আমার কখনও পরা হয়নি। তিনি মারা গেলেন, তারপর তো আর নাকফুল পরা যায় না। তখন থেকে ভেবে রেখেছি, এটা পরবে আমার ছেলের বউ।
দিপু অবাক গলায় বলল, কিন্তু অপরা পরবে কী করে?
রেখা বললেন, কেন? অসুবিধা কী?
ওর তো নাকে ফুটোই নেই।
অপরা লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নীচু করল। ফুটো একবার করিয়ে ছিলাম, বন্ধ হয়ে গেছে।
রেখা বললেন, নাকফুল ব্যবহার না করলে কখনও কখনও এমন হয়।
হাত বাড়িয়ে নাকফুলটা নিল অপরা। আর হবে না। নাক আমি আবার ফুটো করিয়ে নেব।
.
১৪.
দিপু বলল, নাক ফুলটায় তোমাকে খুব মানিয়েছে।
অপরা বলল, আমি জানি।
কে বলেছে?
ভাবী।
তার বলা আর আমার বলা এক হলো?
না তা নয়।
তাহলে?
এমনি বললাম।
অপরা মিষ্টি করে হাসল। এই নাকফুল পরার জন্য কী কষ্ট করেছি জান?
জানি।
কী বল তো?
নতুন করে নাক ফুটো করিয়েছ।
তাতে আমার কষ্ট হয়েছে না?
না হয়নি।
মানে?
আজকাল নাককান ফুটো করতে কোনও কষ্ট নেই। বিউটি পারলারগুলোতে গেলেই একধরনের স্প্রে করে, যেগুলো লোকাল এনেসথেসিয়ার কাজ দেয় তারপর সুট করে ফুটো করে ফেলে।
বাবা তুমি এত কিছু জানো?
জ্বী।
তারপরই কেমনে অস্থির হলো দিপু। ইস চোখের পলকে যদি পরীক্ষাটা হয়ে যেত, চারটা মাস যদি কেটে যেত।
দিপুর অস্থিরতাটা বুঝল অপরা। তারপরও বলল, তুমি এত অস্থির হয়েছ কেন?
তোমাকে ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না।
আমার করে?
তাতো আমি জানি না। আমি শুধু আমারটাই জানি।
আমার অবস্থাও তোমার মতোই।
এই, বিয়ের পর আমাদের প্রতিটি দিন কীভাবে শুরু হবে?
অপরার গলা স্বরাচ্ছন্ন হয়ে গেল। সকালবেলা উঠেই আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসব।
তারপর?
তুমি তখনও ঘুমে। কিন্তু আমি তোমাকে শব্দ করে ডাকব না। আলতো করে ছুঁয়ে দেব তোমার গাল।
তোমার স্পর্শে আমি চোখ মেলে তাকাব। চায়ের কথা ভুলে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকব। বুঝতেই পারব না দৃশ্যটি বাস্তব না স্বপ্ন।
হ্যাঁ, ঠিক তাই।
তুমি আমাকে রান্না করে খাওয়াবে না?
আমি রাধতে পারি না।
আমার জন্য শিখে নিও।
নেব। প্রতিদিন খুব যত্ন করে তোমাকে খাওয়াবো।
তুমি আমার সঙ্গে খাবে না?
না।
কেন?
আমি খাব তোমার খাওয়া শেষ হলে।
দিপু আবার বলল, কেন?
তুমি খেতে বসেছ, অমনি চলে গেছে ইলেকট্রিসিটি। হাত পাখায় তখন আমি তোমাকে বাতাস করব।
আমার জন্য এত কষ্ট কেন করবে তুমি?
আমি যে তোমাকে ভালবাসি।
ভালবাসলে এত কষ্ট করতে হয়?
এটা যে কষ্ট একথা তোমাকে কে বলেছে?
দিপু কথা বলল না।
অপরা আগের মতোই স্বরাচ্ছন্ন গলায় বলল, রাতের বেলায় তোমার যেদিন ঘুম আসবে না, মাথায় হাত বুলিয়ে আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেব।
তাহলে তুমি ঘুমোবে কখন?
তুমি ঘুমোবার পর।
তখন তোমার নিজেকে একা মনে হবে না?
না। কারণ আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে রাখব যে।
আমার ওপর রাগ করে কখনও বাপের বাড়ি চলে যাবে না তো?
বাপের বাড়ি যাব না।
তাহলে?
গেলে চাচার কাছে চলে যাব।
দিপু অবাক হলো। তোমার চাচা আছেন নাকি?
হ্যাঁ আছেন।
কখনও বলনি তো!
বলা হয়নি।
কেন?
কারণ বাবা তাঁর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখেননি।
বল কী?
হ্যাঁ।
কেন?
একমাত্র ছোটভাইর সঙ্গে জায়গা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ হয়েছিল বাবার। বাবার অমতে চাচা তার অংশ বিক্রি করে কোনও এক মফস্বল শহরের পাশে গিয়ে স্কুল করেছেন।
স্কুল করা খারাপ কী?
বাবা হয়তো তা চাননি।
চাচার বাড়িও কি ওখানে?
হ্যাঁ।
সংসারে কে কে আছে?
অপরা হাসল। সংসারই নেই।
দিপু অবাক হলো। মানে?
চাচা বিয়েসাদি করেননি। স্কুলটাই তার জীবন।
তার মানে তোমাদের কারও সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।
একজনের সঙ্গে আছে।
কার সঙ্গে?
বুঝতেই পারছ।
তোমার সঙ্গে?
হ্যাঁ।
তোমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়?
না। তিনি আমাকে চিঠি লেখেন।
মুখের মজাদার একটা ভঙ্গি করল দিপু। তো আমার সঙ্গে রাগ করে তুমি সেই চাচার কাছে চলে যাবে?
অপরা মাথা নাড়ল।
তারপর বলল, কিন্তু এখন যে আমাকে একটু সোমাদের বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে।
কেন?
নোট নিতে হবে।
তা দিচ্ছি কিন্তু তুমি বাড়ি ফিরবে কী করে?
ওসব তোমার ভাবতে হবে না।
তাহলে কে ভাববে?
আরে বাবা, সোমাদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ি কাছেই। রিকশা করে চলে যাব।
বুঝলাম। কিন্তু ভাবতে হবে না বলছ কেন? তোমার সবকিছু নিয়ে ভাবতে চাই আমি। তোমার বলা প্রতিটি কথা, প্রতিটি বিষয় এমন করে মনে গেঁথে থাকে আমার, তুমি যখন পাশে না থাকো তখন শুধু ওসবই ভাবি। আমার মাথা জুড়ে, মন জুড়ে, চোখ জুড়ে শুধু তুমি তুমি তুমি।
দিপুর চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর মায়াবি হাতে তার গালটা একটু ছুঁয়ে দিল অপরা।
বনসীমান্ত
০১.
গ্রামের কাছাকাছি এসে বাদল টের পেল সে আর ছুটতে পারছে না।
