আমি জানি।
তুমি জানো কচু। ঢাকার খবর আসল খবর না। আসল খবর হইল আকাশবাণীর।
তালেব বলল, বিবিসি, ভয়েজ অব আমরিকা, এইসব জাগার খবরও ঠিক।
মোতালেব বলল, হ। রেডিও পাকিস্তানের খবর ঠিক না।
একথার সঙ্গে সঙ্গে মোতালেবকে সাপোর্ট করল সোনামিয়া। হ মাস্টারের কথা ঠিক। মেলেটারিরা যে মানুষ মাইরা সাফা কইরা ফালাইতাছে এই খবর রেডিও পাকিস্তান থিকা কয় না।
খালেক বলল, রেডিও পাকিস্তান থিকা খালি কার্ফুর খবর কয়।
জলিল বলল, ধর না! কার্ফুর খবরই হুনি।
মনে হয় অধিবেশন শেষ হইয়া গেছে।
ট্রানজিস্টার বন্ধ করে দিল খালেক।
তখনই লাঠি ভর দেয়া ভিক্ষুক জমির এসে দোকানের সামনে দাঁড়াল। আল্লার ওয়াস্তে খয়রাত দেন বাবারা।
তালেব খেকুড়ে গলায় বলল, মেলিটারিরা দেশ শেষ কইরা ফালাইতাছে আর তুই চাস খয়রাত? যা ভাগ।
.
০৪.
এই বটগাছটা কতকালের পুরনো কে জানে!
জন্মের পর থেকে বাদল তো এরকম দেখছেই, বাদলের বাবা মির্জা সাহেবও নাকি তাঁর জন্মের পর থেকেও এরকমই দেখছেন। বাদল তার দাদীর মুখে শুনেছিল তার দাদাও নাকি জন্মের পর থেকে এমনই দেখছে গাছটা।
তার মানে কত বছর বয়স হবে এই গাছের?
একশো সোয়াশো বছর!
তবে গাছটি আছে বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে, অনেকখানি জায়গা নিয়ে। অনেকখানি জায়গা ছায়াময় করে রেখেছে সে।
আজ দুপুরবেলা এই বটতলায় এসে বসেছে বাদলরা চারজন। বাদল আলমগির সুজন আর মন্টু।
বাদল বলল, একজন অভিজ্ঞ লোক দরকার।
আলমগির বলল, কী ব্যাপারে?
আমাদের ট্রেনিংয়ের জন্য।
সুজন বলল, অর্থাৎ আমাদেরকে ট্রেনিং দেয়াতে পারবে?
হ্যাঁ। আমরা তো আসলে কিছুই জানি না।
ঠিকই বলেছিস। এভাবে কাজ হবে না।
আলমগির বলল, কীভাবে কাজ হবে বাদলের তা জানার কথা।
মন্টু বলল, হ্যাঁ বাদল শিক্ষিত ছেলে।
বাদল বলল, আমি শুনেছি দেশের সব জায়গায় ট্রেনিং শুরু হয়ে গেছে। কলকাতা আগরতলা মেলাঘর চলে যাচ্ছে আমাদের বয়সী ছেলেরা। ওসব জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং চলছে।
আলমগির বলল, চল তাহলে আমরাও চলে যাই।
আর কয়েকটা দিন দেখি।
সুজন বলল, তাহলে চল এনামুল ভাইকে গিয়ে ধরি। তিনি ইপিআরে ছিলেন। এইসব ট্রেনিং কেমন করে দেয়াতে হয়, জানেন।
শুনে লাফিয়ে উঠল বাদল। ঠিক বলেছিস। চল।
.
০৫.
ক্রাচে ভর দিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল এনামুল।
ছফিটের কাছাকাছি লম্বা, দশাসই চেহারা তার। মুখে হাসি বলতে নেই। খুবই গম্ভীর ধরনের মুখ।
বাদলের দিকে তাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার?
উদ্দেশ্যটা বলল বাদল।
শুনে এনামুল বলল, পাটা এমন ভাঙা ভাঙল, চাকরি আর করতে পারলাম না।
কিন্তু জানেন তো সবই।
হ্যাঁ তা জানি।
ট্রেনিং দেওয়াতে পারবেন না?
অবশ্যই পারব।
একথা শুনে চারজনের মুখেই হাসি ফুটল।
আলমগির বলল, খুব খুশি হলাম এনামুল ভাই।
সুজন গভীর উৎসাহের গলায় বলল, তাহলে আজ থেকেই শুরু করুন।
এনামুল বলল, কিন্তু বাঁশের লাঠিতে তো ট্রেনিং হবে না।
মন্টু হতাশ গলায় বলল, তাহলে?
বন্দুক, রাইফেল এসব জোগাড় কর।
আলমগির বলল, এসব আমরা কোত্থেকে জোগাড় করব?
বাদল বলল, আমি জানি কোত্থেকে জোগাড় করতে হবে।
মন্টু বলল, কোত্থেকে?
দেশের বিভিন্ন থানা থেকে অস্ত্র জোগাড় করছে আমাদের বয়সী ছেলেরা।
এনামুল বলল, এছাড়াও একটা পথ আছে।
কী?
নিজ নিজ এলাকার যেসব বাড়িতে বন্দুক আছে সেসব বন্দুক জোগাড় করা।
জ্বী। ঠিকই বলেছেন।
পুলিশ ইপিআরের জোয়ানরা যার যার অস্ত্র কাঁধে ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেইসব অস্ত্র দিয়েও ট্রেনিং হচ্ছে।
বাদল দৃঢ় গলায় বলল, আপনি চিন্তা করবেন না। আমাদের এলাকার সব বন্দুক আমরা নিয়ে নেব।
আলমগির বলল, দরকার হলে থানা লুট করব আমরা।
এনামুল উফুল্ল গলায় বললেন, সাবাস!
.
০৬.
নিজের বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছেন জলধর ডাক্তার।
পরনে ধুতি আর হাতাঅলা কোড়াগেঞ্জি। গলার পৈতে একপাশে ঝুলছে। পৈতের সঙ্গে প্রায় ঝুলে পড়েছে তার ভুড়ি।
জলধর ডাক্তারের শরীর বেশ মোটা। অত্যন্ত আমুদে ধরনের লোক তিনি। মুখখানা সব সময়ই হাসি হাসি, উজ্জ্বল। কিন্তু এই মুহূর্তে সেই উজ্জ্বল মুখ কেমন ম্লান, চিন্তিত। হ্যারিকেনের আলোয় খুবই বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। বুকের কাছে তাঁর ছোট্ট একখানা ট্রানজিস্টার। নীচু ভলিউমে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র শুনছিলেন তিনি। এই মাত্র খবর শেষ হলো। সঙ্গে সঙ্গে ট্রানজিস্টার অফ করলেন তিনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
অদূরে জলধরের মুখোমুখি তাঁর বিধবা মেয়ে মাধবির বিছানা। হাত পা গুটিয়ে বিছানায় বসে আছে মাধবি। বাবাকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখে তাঁর দিকে তাকাল।
জলধর বললেন, না অবস্থা ভাল না।
তা বুঝতে পারছি। ঢাকার খবর কিছু বলল?
ঢাকা শান্ত। তাই নাকি?
হ্যাঁ। ওরা পলিসিটা ধরেছে অন্যরকম। ঢাকায় এখন আর তেমন কিছু করছে না। আর্মি ছড়িয়ে গেছে সারাদেশে। গ্রামে গঞ্জে মফস্বলে।
গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ মারছে।
মাধবি দুঃখি গলায় বলল, মিলিটারিরাও তো মানুষ! মানুষ হয়ে মানুষ এভাবে মারে কী করে?
জলধর বিছানায় উঠে বসলেন। ওরা মানুষ না। মানুষের মতো দেখতে এক প্রকারের জন্তু। বুড়িগঙ্গার ওপারে, কেরানীগঞ্জ, সুভাই, জিঞ্জিরা এসব এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। ঢাকা আক্রান্ত দেখে ভেবেছে নদীর ওপারে নিরাপদ থাকা যাবে। এপ্রিলের দুই। তারিখে, ভোররাতে হঠাৎ জন্তুগুলো সেখানে আক্রমণ চালায়। তিন চারহাজার লোক মেরে ফেলে এক সকালে। মাঠঘাট আর বাড়ির উঠোনে শুধু লাশ, শুধু লাশ।
