দিপু একটু চিন্তিত হলো। বুঝতে পারছি না।
আমি বুঝতে পারছি।
কী বলো তো?
তুমি আমাকে …..।
কথাটা শেষ করল না অপরা।
দিপু আগের মতোই চিন্তিত গলায় বলল, মা চায়নি এমন কাজ আমি কখনও করিনি।
একথা আমি জানি। জানি বলেই বললাম।
অপরার এই কথাটি যেন শুনতেই পেল না দিপু। নিজের কাছে বলার মতো করে বলল, মাকে কখনও দুঃখ দিইনি আমি।
দিপুর মন অন্যদিকে ঘোরাবার জন্য অপরা বলল, তোমার জন্য একটা সুসংবাদ আছে।
দিপু অপরার দিকে তাকাল। কী?
আমাদের বাড়ির সবাই তোমাকে দেখে মুগ্ধ।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। তোমার ব্যাপারে কারও কোনও আপত্তি নেই।
বুঝলাম। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কোথাও না কোথাও একটা প্যাঁচ লেগেই যায়।
মানে?
এই যেমন আমার মায়ের দিকটায় লাগল। তবে মা যদি কিছুতেই রাজি না হয় তারপরও একটা পথ আমার আছে।
কী?
নানাকে ধরব।
তিনি তোমার কথা রাখবেন?
অবশ্যই। আমি হচ্ছি আমার নানার জান। তিনি কিছুতেই আমার কথা ফেলবেন না।
তারপর অপরার একটা হাত ধরল দিপু। চল।
অপরা আর কোনও কথা বলল না।
কিন্তু দিপুদের বাড়ির সিঁড়িতেই মঈনুল সাহেবের মুখোমুখি পরে গেল ওরা।
মঈনুল সাহেব সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিলেন। নিশ্চয় কোথাও বেরুচ্ছেন তিনি। পরনে ক্রিম কালারের সুন্দর স্যুট। ধপধপে সাদা শার্ট আর গাঢ় নীল রংয়ের টাই। পায়ে চকচকে জুতো। গা থেকে চমৎকার পারফিউমের গন্ধ আসছে। সব মিলিয়ে চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তিনি।
দিপু এবং অপরাকে দেখে নাকের দিকে নেমে আসা চশমাটা চোখের দিকে ঠেলে দিলেন তিনি।
সঙ্গে সঙ্গে অপরাকে দিপু বলল, এই হচ্ছেন আমার নানা। মঈনুল চৌধুরী। শিপিং বিজনেস করেন।
অপরা নরম লাজুক ভঙ্গিতে সালাম দিল।
মঈনুল সাহেব বললেন, তোমাকে আমি ঠিক …..।
দিপু বলল, ও হচ্ছে অপরা?
অপরা?
হ্যাঁ।
বাহ খুব সুন্দর নাম। একেবারেই আনকমন।
তারপর দিপুর দিকে তাকালেন তিনি। তুই না বললেও আমি বুঝতে পারতাম ও হচ্ছে অপরা।
দিপুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। কী করে? মা তোমাকে বলেছে?
না। ওকে নিয়ে রেখার সঙ্গে আমার কোনও কথা হয়নি।
দিপু হতাশ হলো। তাহলে?
ওর মুখ দেখলেই বোঝা যায় ও অপরা।
তোমার কথার অর্থ আমি বুঝতে পারছি না নানু।
মঈনুল সাহেব হাসলেন। ওর মুখটা অতি আপন। এই ধরনের মুখের মানুষ কখনও পর হতে পারে না।
মঈনুল সাহেব অপরার দিকে তাকালেন। যাও উপরে যাও।
দিপু বলল, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
আমার একটা মিটিং আছে।
মঈনুল সাহেব নেমে গেলেন।
.
১৩.
আলতো ভঙ্গিতে অপরার চিবুকে হাত দিলেন রেখা।
মুখখানি তুলে ধরলেন। তারপর মুগ্ধ চোখে অপরার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
একটুখানি দূরে মুখে গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিপু।
রেখা একবারও দিপুর দিকে তাকালেন না। মুগ্ধ গলায় অপরাকে বললেন, ছবির চে’ তুমি অনেক বেশি সুন্দর।
এই বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই বুকটা চিব ঢিব করছিল অপরার। মঈনুল সাহেবের কথায় প্রাথমিক ভয়টা তার কেটেছিল। এখন রেখার কথায় একেবারেই ভারমুক্ত হয়ে গেল সে। বুকের ঢিবঢিবানিটা বন্ধ হলো। মনটা আশ্চর্য এক ভাল লাগায় ভরে গেল।
রেখা বললেন, এমনও হতে পারে দিপু তোমার ছবিগুলো ঠিক মতো তুলতে পারেনি।
দিপুর মুখ থেকেও ততোক্ষণে টেনশান উধাও। অস্বস্তি কেটে যাওয়া গলায় বলল, আমি ছবি খুব ভাল তুলি মা।
এবার দিপুর দিকে তাকালেন রেখা। আবার কি সেই গোয়ালের উপমাটা দেব?
না না দরকার নেই।
অপরা ঠোঁট টিপে হাসল।
রেখা দিপুকে বললেন, তুই আর এখন কোনও কথা বলবি না।
দিপু বাধ্য শিশুর মতো বলল, আচ্ছা।
রেখা আবার অপরাকে নিয়ে ব্যস্ত হলেন। তোমাকে দেখে আমার মন ভরে গেছে মা। অনেকদিন পর বাড়িটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। দিপুর বাবা বেঁচে থাকলে তিনি যে আজ কী খুশি হতেন!
দিপু ভুলে গেল মা তাকে কথা বলতে বারণ করেছেন। বেশ উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, বাবা নেই তো কী হয়েছে? বাবার অভাব আমি কখনও ফিল করিনি। আমার তুমি আছ, নানু আছেন।
তারপর একটু থামল দিপু। মা, অপরাকে তোমার পছন্দ হয়েছে?
এবার হাসিমুখে ছেলের দিকে তাকালেন রেখা। ছবি দেখেই পছন্দ হয়েছিল।
দিপু যেন আকাশ থেকে পড়ল। কী?
হ্যাঁ।
তাহলে যে বললে …..।
বাস্তবে দেখার জন্যই তোর সঙ্গে অমন ব্যবহার করেছিলাম।
সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মতো ছুটে গিয়ে রেখাকে জড়িয়ে ধরল দিপু। আমার খুব ভাল লাগছে মা, খুব ভাল লাগছে। মনে হচ্ছে, তোমাকে একটু কোলে নিই।
ধুৎ পাগল।
সত্যি। মনে হচ্ছে কোলে নিয়ে তোমাকে শিশুর মতো দোলাই।
দিপুর কাণ্ড দেখে অপরা তখন মুখ নীচু করে হাসছে।
দিপুর হাত ছাড়িয়ে দিতে দিতে রেখা বললেন, পাগলামো করিস না। ছাড়।
মাকে ছেড়ে দিল দিপু।
রেখা দরজার দিকে পা বাড়ালেন। অপরাকে বললেন, তুমি বসো মা। আসছি।
রেখা বেরিয়ে যাওয়ার পর অপরার সামনে এসে দাঁড়াল দিপু। বিশাল করে একটা হাঁপ ছাড়ল।
অপরা বলল, কী হল?
বুকের ওপর হাজারমনি একটা পাথর চেপেছিল। সেই পাথরটা নেমে গেছে।
অপরা মিষ্টি করে হাসল। আমারও একই অবস্থা।
আমি আমার মাকে খুব ভালবাসি। মাকে অত খুশি দেখে তাকে আমার কোলে নিতে ইচ্ছে করছিল।
তাতো শুনলামই।
আমি জানি তুমি শুনেছ। কারণ তোমার সামনেই তো বললাম।
তাহলে এখন আবার বলছ কেন?
অন্য কারণে।
কী কারণ?
এখন ইচ্ছে করছে তোমাকে কোলে নিতে।
