ছবি হাসল। ডিস্টার্ব কিন্তু করেনি, মজা করেছে।
তারপর একটু থেমে বলল, বাবা, আমার কিন্তু দিপুকে খুব ভাল লেগেছে। অপরার জন্য ওর যে প্রচণ্ড টান, তা আমি বুঝতে পেরেছি।
হোসেন সাহেব কোনও কথা বললেন না।
.
১০.
শৈবালের দক্ষিণ দিকে যে সুন্দর পুকুর, ভোরবেলা সেই পুকুরের ঘাটলায় এসে বসে আছে অপরা। মুখটা বিষণ্ণ, চোখে উদাস দৃষ্টি।
নিজের রুম থেকে দৃশ্যটা দেখতে পেল দিপু। দেখে অপরার জন্য একেবারে পাগল হয়ে গেল। প্রায় ছুটে পুকুরঘাটে এল সে।
দিপুকে দেখে স্বরাচ্ছন্ন চোখে তাকিয়ে রইল অপরা।
অপরার পাশে বসে তার একটা হাত ধরল দিপু। রাগ করেছ?
অপরা কথা বলল না।
দিপু বলল, তোমাদের বাড়িতে ফোন করে হতভম্ব হয়ে গেছি। আমি জানি না অথচ তুমি কক্সবাজারে। কাজের মেয়েটা বলল তোমরা পাজেরো নিয়ে গেছ। সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যান করলাম। জিএমজিতে আমার এক সিনিয়র ফ্রেন্ড আছে, তাকে ফোন করে টিকিট ম্যানেজ করলাম। এবং তোমাদের আগে কক্সবাজার।
কিন্তু নাটকটা না করলেও পারতে।
কেন? কী হয়েছে?
সবাই তোমার কথা জেনে গেল।
আমি তো জানাতেই চেয়েছি।
কী?
হ্যাঁ। তোমাকে ছেড়ে আর একটি মুহূর্তও আমি থাকতে পারছি না। আমার খুব কষ্ট হয়। আমার খুব অস্থির লাগে।
দিপুর কথায় দিপুর জন্য আশ্চর্য এক মমতায় বুক ভরে গেল অপরার। ডান হাতে দিপুর গালটা একটু ছুঁয়ে দিল সে। আমারও লাগে। আমারও খুব কষ্ট হয়। রাতে ঘুম হয় না। শুধু তোমার কথা মনে পড়ে। এখানে এসে তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত খুব মন খারাপ ছিল।
একটু থামল অপরা। তারপর হৃদয়ের গভীর থেকে বলল, দিপু, আমি তোমাকে খুব ভালবাসি।
দুই করতলে দিপু তারপর অপরার মুখখানি তুলে ধরল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে অপরার মতো করেই বলল, আমিও তোমাকে খুব ভালবাসি। তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব।
.
১১.
দিপুর রুমের একদিককার দেয়ালে সাইত্রিশটি ছবি পেস্ট করা।
একেকটি একেক সাইজের। ফলে দেয়াল প্রায় ভরে গেছে। আর দেয়ালটি দিপুর বিছানার মুখোমুখি হওয়ায় বিছানায় শুয়েই ছবিগুলো দেখতে পায় সে।
একজন মানুষেরই বিভিন্ন ভঙ্গিমার ছবি। তবে একই পোশাকের, একই লোকেশানের।
লোকেশান হচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্রতীর। সময় পড়ন্ত বিকেল। সমুদ্রজলে শেষ সূর্যের আভা। বহুদূর সমুদ্রে আকাশ থেকে আস্তেধীরে নামছে দিন শেষের সূর্য।
বিছানায় শুয়ে দিপু এখন অপলক চোখে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। দিপুর মা রেখা এসে দরজায় নক করলেন। এই শব্দে চোখে পলক পড়ল দিপুর। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে দিপু বলল, কে?
বাইরে থেকে রেখা বললেন, আমি।
ও মা! এসো।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন রেখা। ঢুকেই দেয়ালে পেস্ট করা ছবি দেখে অবাক হলেন। এ কি?
দিপু সরল গলায় বলল, কী আবার? দেখতে পাচ্ছ না, ছলি।
কিন্তু কার ছবি?
অপরার।
রেখা অবাক হলেন। অপরা কে?
দেখছ না একটি মেয়ে।
তা দেখছি। নাম অপরা?
হ্যাঁ।
অদ্ভুত নাম তো!
অদ্ভুত মানে?
অপরা। শুনলেই অপয়া মনে হয়।
দিপু গম্ভীর হল। বাজে কথা বলো না। অপরা মানে জান?
না।
যে পর নয়।
বুঝলাম। কিন্তু মেয়েটা কে?
দিপু হাসল। আগেই তো বলে দিলাম যে পর নয়।
রেখা সরল গলায় বললেন, তারপরও আমি বুঝতে পারিনি।
বুঝতে পারনি?
না।
দিপু কেমন বিরক্ত হল। তুমি চট করে সব বুঝতে পার না কেন মা?
দিপুর পাশে বসলেন রেখা। পারছি না যখন, বুঝিয়ে বল।
তোমার বউ হবে।
একথায় মোটেই চমকালেন না রেখা। নির্বিকার গলায় বললেন, তাই নাকি?
হ্যাঁ।
রেখা কথা বললেন না। দিপুর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দিপু বলল, কেন? তোমার পছন্দ হয়নি।
রেখা গম্ভীর গলায় বললেন, না।
কী?
হ্যাঁ পছন্দ হয়নি।
দিপু বেশ উত্তেজিত হলো। বিছানায় উঠে বসল। অপরাকে তোমার সত্যি পছন্দ হয়নি?
বললাম তো! সত্যি পছন্দ হয়নি।
আর ইউ সিওর?
সিওর না হয়ে কেউ পছন্দ অপছন্দর কথা বলে!
দিপু যেন নিভে গেল। স্নান গলায় বলল, কিন্তু মা, অপরা খুব সুন্দর। মেয়ে।
রেখা আগের মতোই নির্বিকার গলায় বললেন, আমার মনে হচ্ছে না।
আমি বলছি, সে সত্যি খুব সুন্দর মেয়ে।
হতে পারে। হয়তো ছবিগুলোই ভাল হয়নি। অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে যাদের ক্যামেরা ফেস ভাল না। এমনিতে দেখল মাথা খারাপ হয়ে যায় কিন্তু ছবি দেখলে বিরক্ত লাগে। মোটেই সুন্দর মনে হয় না।
হ্যাঁ কারও কারও ক্ষেত্রে এরকম হয়। কিন্তু অপরার ছবিগুলো কিন্তু আমার খুব ভাল লাগছে।
তুই তুলেছিস?
হ্যাঁ।
নিজের তৈরি ঘি সব গোয়ালাই ভাল বলে।
তাহলে অপরাকে তোমার সামনা সামনি দেখা উচিত।
দেখা।
তোমার কাছে নিয়ে আসব?
আনতে পারিস।
বলেই উঠলেন রেখা।
দিপু বলল, কিন্তু তুমি আমার রুমে এসেছিলে কেন?
কী যেন বলতে এসেছিলাম।
বল।
এখন আর মনে নেই।
বলে একেবারেই নির্বিকার ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেলেন রেখা।
মায়ের আচরণে দিপু খুবই অবাক হলো।
.
১২.
সব শুনে অপরা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
দিপুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার খুব ভয় করছে।
কেন?
ছবি দেখে মা আমাকে পছন্দ করেননি।
বাস্তবে দেখলে নিশ্চয় করবেন।
যদি না করেন?
আমার মনে হয় করবেন।
এজন্যই আমার ভয় করছে।
কিচ্ছু হবে না। তুমি চল।
নিজের অসম্ভব সুন্দর চোখ তুলে দিপুর দিকে তাকাল অপরা। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
সিওর।
যদি তোমার মা আমাকে পছন্দ না করেন তাহলে তুমি কী করবে?
