দিপু তবু কথা বলল না।
দিপুর পাশে বসা জিপের মালিক কিংবা ড্রাইভার হতভম্ব হয়ে আছে। একবার দিপুর দিকে তাকাচ্ছে সে, আরেকবার অপরার দিকে।
এই ফাঁকে লাফ দিয়ে জিপ থেকে নামল দিপু। আবার ছবি তুলতে লাগল অপরার।
অপরা বলল, অনেকবার তোমাকে ফোন করেছি। কিছুতেই পাইনি। কোথায় ছিলে তুমি? তোমাকে বলে আসতে পারিনি, আমার যে কী মন খারাপ হয়েছে।
তারপর মিষ্টি করে হাসল সে। এখন মন ভাল হয়ে গেছে। এখন আমি খুব আনন্দ করব। সমুদ্র, সূর্যাস্ত, গভীর রাতে চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া সমুদ্র সব এনজয় করব। এই, তুমি উঠেছ কোথায়?
দিপু একেবারেই নির্বিকার। অন্যদিকে তাকিয়ে চুইংগাম চিবাতে লাগল।
অপরা অসহায় গলায় বলল, এমন করো না প্লিজ। আমার খুব খারাপ লাগছে। কথা বলো। প্লিজ কথা বলো।
দিপু তবু কথা বলল না।
.
০৫.
দূর থেকে হঠাৎ করেই এই দৃশ্যটা দেখে ফেললেন হোসেন সাহেব। সঙ্গে সঙ্গে রঞ্জু এবং ছবিকে ডাকলেন। ওরা দেখল দৃশ্যটা।
হোসেন সাহেব বললেন, ছেলেটা কে?
রঞ্জু বলল, বুঝতে পারছি না।
ছবি বলল, নিশ্চয় অপরার পরিচিত। এখানে এসে হয়তো দেখা হয়ে গেছে।
রঞ্জ বলল, তাই হবে।
তারপর হোসেন সাহেবের দিকে তাকাল। বাবা, তুমি একটু সূর্যের দিকে তাকিয়ে দাঁড়াও তো, তোমার একটা ছবি তুলি।
হোসেন সাহেব সূর্যের দিকে তাকিয়ে দাঁড়ালেন।
রঞ্জু ক্যামেরা তুলল।
.
০৬.
অপরা বেশ রেগে গেছে।
গম্ভীর গলায় বলল, অনেক হয়েছে। আমি কিন্তু এখন রেগে যাব।
দিপু তবু কথা বলল না। চুইংগাম চিবাতে চিবাতে নির্বিকার ভঙ্গিতে ক্যামেরা তুলল।
আচমকা ক্যামেরাটা ছিনিয়ে নিল অপরা। নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। এত করে বলার পরও তুমি আমার সঙ্গে কথা বলছ না! কী করেছি আমি? কী করেছি? তোমার যেমন মন খারাপ হয়েছে, আমার হয়নি? মন কি তোমার একাই আছে? আমার নেই?
কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল অপরা।
দিপু তবু নির্বিকার। আস্তেধীরে হেঁটে গিয়ে ক্যামেরাটা কুড়িয়ে আনল সে। তারপর জিপে চড়ল।
অপরা ছুটে এসে তার সামনে দাঁড়াল। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছ তুমি। অতিরিক্ত। আমি কিন্তু এখন চিৎকার করব। চিৎকার করে কাঁদব। আমাদের ফ্যামিলির সবাই আছে এখানে, আমি সবাইকে ডাকব। আমি কিন্তু কেলেংকারি করব।
দিপু এসবের কিছুই কেয়ার করল না। হাওয়ার বেগে জিপ চালিয়ে দিল।
অপরা পাগলের মতো জিপের পিছু পিছু ছুটতে লাগল। দিপু, যেও। যেও না। দাঁড়াও, প্লিজ দাঁড়াও।
.
০৭.
টুপু অবাক গলায় বলল, ফুপির কী হয়েছে মা?
সঙ্গে সঙ্গে তিনজন মানুষ অপরার দিকে তাকাল। তাকিয়ে দিশেহারা হয়ে গেল। বালিয়াড়ির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে সে।
এই দৃশ্য দেখে প্রথমে ছুটল রঞ্জু। তার পিছু পিছু ছবি। সব শেষে হোসেন সাহেব এবং টুপু।
অপরাকে জড়িয়ে ধরে ছবি বলল, কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?
হোসেন সাহেব হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললেন, ছেলেটা কে?
রঞ্জু বলল, তোকে ডিস্টার্ব করেছে?
ততোক্ষণে নিজেকে সামলেছে অপরা। চোখ মুছতে মুছতে বলল, তোমরা যা ভেবেছ তা নয়।
হোসেন সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, তাহলে কী? ব্যাপারটা কী?
ভাবীকে আমি সব বলব। তার কাছ থেকে জেনে নিও।
.
০৮.
শৈবালের সামনে এসে জিপ থেকে নামল দিপু।
মানিব্যাগ বের করল। কত?
পাঁচশো টাকা দেন।
দিপু একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে দিল।
ড্রাইভার অবাক। যা চাইলাম তাই দিলেন?
হ্যাঁ।
আপনে খুব অন্য ধরনের মানুষ।
হ্যাঁ। আসুন। খোদা হাফেজ।
কিন্তু আমার একটা কথা আছে।
কী কথা?
মানে একটা কথা জিজ্ঞেস করব। করব, সাহেব?
না।
শুনেই না করে দিচ্ছেন?
এই প্রথম সানগ্লাসটা খুলল দিপু। মুখ থেকে চুইংগাম ফেলল। শুনতে হবে না। আমি জানি কথাটা কী?
বলেন তো কী?
আপনি জানতে চাইবন মেয়েটা আমার কে? কেন এভাবে আমি তার ছবি তুলোম। কেন আমি তার সঙ্গে একটাও কথা বললাম না।
জ্বী। কারেক্ট।
ওসব জানার আপনার কোনও দরকার নেই। আপনি আসুন।
হন হন করে হেঁটে সিঁড়ির দিকে চলে গেল দিপু।
দিপুর দিকে তাকিয়ে জিপঅলা হাসিমুখে বলল, বুঝছি। মাথায় ছিট আছে।
.
০৯.
শৈবালের সুইটগুলোতে সুন্দর লিভিংরুম আছে।
রাতেরবেলা হোসেন সাহেব রঞ্জু আর ছবি বসেছে লিভিংরুমে। হোসেন সাহেব বললেন, এখন বল বউমা, ব্যাপারটা কী? অপরা তোমাকে কী বলল।
ছবি মাথা নীচু করে বলল, ওদের দুজনের অনেকদিনের সম্পর্ক।
তাই নাকি?
জ্বী।
রঞ্জু বলল, ছেলেটার নাম কী?
নাম বলল ছবি।
হোসেন সাহেব বললেন, করে কী সে?
মাস্টার্স দেবে।
কোত্থেকে?
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।
সাবজেক্ট।
বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান।
রঞ্জু বলল, ফ্যামিলি কেমন?
খুবই ভাল।
অবস্থা?
বিশাল। ধানমন্ডিতে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। কিন্তু বাড়িটি মায়ের।
হোসেন সাহেব অবাক হলেন। মানে?
বাবা নেই। গার্জিয়ান হচ্ছেন নানা।
কী করেন তিনি?
বিজনেস।
কিসের?
শিপিং বিজনেস। প্রচুর টাকার মালিক। দিপুর মা তার একমাত্র সন্তান। দিপুও তার মা বাবার একমাত্র সন্তান।
রঞ্জু বলল, অর্থাৎ ঝামেলামুক্ত পরিবার।
ছবি বলল, হ্যাঁ একেবারেই ঝামেলামুক্ত।
হোসেন সাহেব বললেন, বুঝলাম। কিন্তু ছেলেটার স্বভাব চরিত্র আমার পছন্দ হয়নি।
ছবি অবাক হলো। স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে আপনি জানলেন কী করে?
না মানে এভাবে আমাদের পিছু পিছু কক্সবাজার পর্যন্ত চলে এসেছে। সীবিচে মেয়েটিকে ডিস্টার্ব করেছে।
