অপরা কোনও কথা বলল না। বাবার পিছু পিছু হাঁটতে লাগল।
ছবি চলে গিয়েছিল মাঠে, টুপুর কাছে। এখন টুপুর হাত ধরে সে আছে সবার পেছনে।
এই দলটিকে দূর থেকে ফলো করতে লাগল দিপু।
.
০৩.
সূর্য ডোবার এখনও অনেক দেরি।
ছবির কথা শুনে তার দিকে তাকাল রঞ্জু। দেরি হলেই তো ভাল। চল একটু নির্জনে যাই।
মুখ ঘুরিয়ে স্বামীর দিকে তাকাল ছবি। মানে?
রঞ্জু হাসল। আমি অন্যকিছু মিন করিনি। এই বীচটা এখন বাজারের মতো। দেখছ না কী পরিমাণ লোক। হঠাৎ করে তাকালে মনে হয় মেলা বসেছে।
লোকের তো আসলে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। কী করবে? চান্স পেলেই কক্সবাজার চলে আসে।
আমি আসলে এসবই বলতে চেয়েছি।
হাত দিয়ে হিমছড়ির দিকটা দেখাল রঞ্জু। ওই দিকটা বেশ ফাঁকা। চল ওই দিকে যাই।
বাবা অপরা ওদেরকেও ডাক।
ওই তো ওরা আসছে। আমরা যেদিকে যাব ওরাও সেই দিকেই আসবে।
তখন যেন হঠাৎ করে ক্যামেরার কথা মনে পড়ল ছবির। আঁতকে উঠল সে। ক্যামেরা আননি?
রঞ্জু হাসল। কী মনে হয় তোমার?
কই, দেখছি না তো?
এই যে পকেটে।
প্যান্টের একদিককার পকেট দেখাল রঞ্জু। পকেটটা উঁচু হয়ে আছে।
ছবি বলল, বের কর। আমার দুএকটা ছবি তোল।
পকেট থেকে তার ছোট্ট ক্যামেরাটা বের করল রঞ্জু। সবাই আসুক, সবার ছবিই তুলি।
তাতো তুলবেই। এখন আমার দুএকটা তোল।
না থাক।
কেন?
দূর থেকে বাবা নিশ্চয় দেখবেন।
দেখলে কী হয়েছে?
আমার লজ্জা করবে।
কিসের লজ্জা?
বাবা ভাববেন ছেলেটা কী রকম নির্লজ্জ টাইপের। বাবার সামনেই নিজের বউর ছবি তুলছে।
একথা শুনে খুবই বিরক্ত হলো ছবি। আশ্চর্য কথা! বাবার সামনে নিজের বউর ছবি তুলতে পারবে না? লজ্জা করছে? কিন্তু বাবা বোনকে নিয়ে তো এক ফ্ল্যাটেই থাক তুমি। রাতে যখন বউ নিয়ে নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে ঘুমাও তখন লজ্জা করে না? ছেলেটা যে হলো তখন বাবার কথা ভেবে তোমার লজ্জা হয়নি?
তারপর ধমকের সুরে ছবি বলল, তোল ছবি।
রঞ্জু আমতা আমতা গলায় বলল, ঠিক আছে। তুমি তাহলে একটু পানিতে নামো।
সমুদ্রজলে মাত্র পা ছুঁইয়েছে ছবি, হোসেন সাহেব অপরা এবং টুপু এসে দাঁড়াল রঞ্জুর পাশে। মাকে সমুদ্রে নামতে দেখে টুপু ছুটে গেল। আমিও তোমার সঙ্গে থাকব।
রঞ্জু বলল, হ্যাঁ তুমি টুপুকে ধরে দাঁড়াও। আমি ছবি তুলে দিচ্ছি।
হোসেন সাহেব সাবধানী গলায় বললেন, টুপুকে শক্ত করে ধরে রেখ বউমা। সমুদ্রের ঢেউ কিন্তু আচমকা এসে….।
কথাটা শেষ করলেন না তিনি।
কিন্তু এসবের কিছুই ভাল লাগছে না অপরার।
সে বাবার দিকে তাকাল। আমি একটু ওই দিকটায় যাই বাবা?
হোসেন সাহেব মেয়ের দিকে তাকালেন। কোনদিকে?
হাত তুলে দূরের একটা বালিয়াড়ি দেখাল অপরা। মাঝখান দিয়ে ঝিরঝিরে একটি জলের ধারা বয়ে গেছে।
একেবারেই ফাঁকা নির্জন জায়গা।
হোসেন সাহেব বললেন, ঠিক আছে। যা।
অপরা হাঁটতে লাগল। এক সময় সেই বালিয়াড়িতে এসে সমুদ্রের দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে রইল।
সূর্য তখন আস্তেধীরে সমুদ্রজলের দিকে নামছে।
.
০৪.
বেশ অনেকটা দূর থেকে অপরাকে একা হয়ে যেতে দেখল দিপু।
দেখেই তার মাথায় একটা প্ল্যান এলো। হিমছড়ি থেকে একটি পরিবার নিয়ে ফিরছিল ভাড়ার হুডখোলা জিপ। যাত্রী নামতেই সেই জিপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল দিপু। জিপটা ভাড়া নিয়ে নিল। ড্রাইভারকে বলল, এক ঘণ্টার জন্য ভাড়া নেব। টাকা যা লাগে দেব। তবে আমার একটা শর্ত আছে।
কী শর্ত?
ড্রাইভ করব আমি।
আর আমি কোথায় থাকব?
আমার পাশে।
আপনি ভাল চালাতে পারেন তো?
বোধহয় আপনার চে’ ভাল পারি।
তবে ঠিক আছে।
তারপর ড্রাইভারকে পাশে বসিয়ে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল দিপু। সামুদ্রিক হাওয়ার বেগে জিপ চালিয়ে দিল। এক টানে প্রায় অপরার কাছাকাছি।
অপরা তখনও তার মতো করে তাকিয়ে আছে সমুদ্রের দিকে। জিপ গাড়িটা এসে যে অদূরে থেমেছে, খেয়ালই করল না।
ড্রাইভিং সিটে বসেই ক্যামেরা তুলল দিপু। একটার পর একটা ছবি তুলতে লাগল অপরার।
কোনও কোনও ক্ষেত্রে মানুষের সিক্সথ সেন্স খুব কাজ করে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। কেউ কোনও মেয়েকে আড়াল থেকে দেখছে কিংবা তাকে নিয়ে কিছু ভাবছে, বলছে, মেয়েরা যেন চট করেই তা টের পায়। মনের ভেতর থেকে কেউ যেন তাদেরকে কাণ্ডটার কথা বলে দেয়।
অপরাকেও যেন কেউ বলল, এই মেয়ে, দেখ, একজন তোমার ছবি তুলছে।
সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরে তাকাল অপরা। তারপর দিপুকে দেখে যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল, পাগল হয়ে গেল। মুহূর্তে কোথায় উধাও হলো তার মনমরা ভাব, বিষণ্ণতা। অদূরে বাবা এবং ভাই ভাবী আছেন, টুপু আছে, কিছুই মনে রইল না তার। পাগলের মতো দিপুর দিকে ছুটতে লাগল সে।
কিন্তু দিপু একেবারেই নির্বিকার। অপরা তার দিকে ছুটে আসছে আর সে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের ভঙ্গিতে তার ছবি তুলতে লাগল।
দিপুর জিপের কাছে এসে আনন্দে উত্তেজনায় ফেটে পড়ে অপরা বলল, তুমি? সত্যি তুমি? তুমি কখন এলে? কী করে জানলে আমরা এখানে এসেছি?
দিপু আগের মতোই নির্বিকার। একটিও কথা বলল না। অপরা কথা বলছে আর সে ছবি তুলছে। যেন অপরার প্রতিটি শব্দকে ক্যামেরাবন্দি করতে চাইছে সে। প্রতিটি মুখভঙ্গিকে চিরস্থায়ী করে রাখতে চাইছে।
কিন্তু অপরার এসব একদম ভাল লাগছে না। অস্থির গলায় সে বলল, কথা বলছ না কেন? কী হয়েছে? এই, তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ? কিন্তু আমার কোনও দোষ নেই। হঠাৎ করে প্রোগ্রামটা হলো। আমি আসতে চাইনি।
