দরকার নেই। সে এমনিতেই আসবে।
বাস্তবিকই সুমিদের বাড়ি এসে সেলিমকে দেখতে পেল মনজু। ড্রয়িংরুমে বসে আছে। তার সঙ্গে গল্প করছেন পারু এবং অমি।
এই রুমে ঢুকে মনজুর চলে যাওয়ার কথা বলল সুমি।
শুনে পারু বললেন, আমাদের বিপদ যখন কাটল তখনই তুমি চলে যাচ্ছ বাবা? তোমাকে একবেলা খাওয়াতেও পারলাম না।
মনজু সেই নির্মল ভঙ্গিতে হাসল। আরেকবার যখন আসব তখন রোজই খাব। কারণ তখন তো আমি এই বাড়িতেই থাকব।
তারপর পারুর পাশে গিয়ে বসল সে। আপনাকে একটা অনুরোধ করব।
কী বাবা?
যদি কখনও কোনও প্রয়োজনে আমার কথা আপনাদের মনে হয়, একটু কষ্ট করে আমাকে শুধু একটা ফোন করবেন। দেখবেন আমি এসে ঠিকই হাজির হয়েছি। সংক্ষেপে এই হচ্ছি আমি।
পারু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হ্যাঁ বাবা, করব।
তারপর অমির দিকে তাকাল মনজু। তোকে আমার বলার কথা একটাই, লেখাপড়া শিখে মানুষ হবি। মনে রাখবি তুই একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।
অমি মাথা নীচু করে বলল, আমি মনে রাখব।
মনজু তারপর সেলিমের দিকে তাকাল। বেশ নাটকীয়ভাবে বিদায় নিচ্ছি, না? শেষ নাটকটা আপনার সঙ্গে করছি দুলাভাই। সময় থাকলে আপনার বিয়েটা খেয়ে যেতাম। তারপরও উইস করছি, বিবাহিত জীবন সুখের হোক।
সেলিম মৃদু কণ্ঠে বলল, ধন্যবাদ।
সুমি ততোক্ষণে চোখ মুছতে শুরু করেছে।
মনজু এসে তার সামনে দাঁড়াল। কাঁদছিস কেন?
তারপর বলল, আচ্ছা কাঁদ। ভাল করে কাঁদ। ভাই দূরে চলে গেলে বোনদের একটু কাদা উচিত।
সবশেষে মাসুদ সাহেবের ছবিটার সামনে এসে দাঁড়াল মনজু। হাত তুলে আর্মি কায়দায় স্যালুট করল ছবির মানুষটাকে।
.
১৬.
এতরাতে এয়ারপোর্টে আসবে সুমি এবং সেলিম মনজু তা কল্পনাই করেনি। অবাক গলায় বলল, কিরে তুই আবার এখানে এসেছিস কেন? এতরাতে দুলাভাই বেচারাকেও কষ্ট দিচ্ছিস।
সেলিম বলল, না। কিসের কষ্ট?
সুমি বলল, তোমাকে আমি একটা কথা বলতে এসেছি।
কী কথা?
মানুষ যখন খুব কষ্টে থাকে, দুঃখ বেদনা কিংবা আসময়ের মধ্যে থাকে তখন মনে মনে সে শুধু চায় তার কষ্টটা কেটে যাক, দুঃখ বেদনা একদম চলে যাক জীবন থেকে। অসময় কেটে গিয়ে সুসময় দেখা দিক। মনে মনে সে শুধু সুসময়কে ডাকে, সুখ এবং আনন্দকে ডাকে। আজকের পর থেকে জীবনের যে কোনও কষ্টের মুহূর্তে, দুঃখ বেদনা এবং অসময়ে আমি কেবল তোমাকে ডাকব। মনে মনে বলব, এসো, এসো তুমি। আমার কষ্ট কাটিয়ে দিয়ে যাও। দুঃখ বেদনা কাটিয়ে দিয়ে যাও। আমার অসময়কে ঠেলে দাও সুসময়ের দিকে। এসো, এসো তুমি।
মনজুর একটা হাত ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগল সুমি।
তোমাকে
তোমাকে – ইমদাদুল হক মিলন
০১.
দোতলার সিঁড়িতে একটা পা মাত্র নামিয়েছেন হোসেন সাহেব সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে পড়ল মেয়ের কথা। সঙ্গে সঙ্গে পাটা তুললেন তিনি। নামলেন না।
তাকে থামতে দেখে পেছনের দলটাও থেমেছে। রঞ্জু, রঞ্জুর বউ ছবি এবং তাদের পাঁচ বছরের ছেলে টুপু।
হোসেন সাহেব ছবির দিকে তাকালেন। অপরা কই, বউমা?
বাবার কথায় রঞ্জুরও যেন বোনের কথা মনে পড়ল। তাই তো!
তারপর ছবির দিকে তাকাল রঞ্জু। অপরা যাবে না?
কী জানি?
হোসেন সাহেব বললেন, তুমি একটু ওর রুমে যাও তো বউমা। দেখ তো ব্যাপারটা কী!
ঠিক আছে। আপনারা নামুন, আমি দেখছি।
দ্রুত হেঁটে অপরার রুমে এসে ঢুকল ছবি।
কিন্তু অপরা রুমে নেই। খুবই মন খারাপ করা ভঙ্গিতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
শৈবালের এই বারান্দা থেকে পরিষ্কার দেখা যায় সমুদ্র।
বিকেলবেলার সমুদ্রের দিকে উদাস,অপলক চোখে তাকিয়ে আছে অপরা। মুখ দেখে বোঝা যায় তার মন ভাল নেই।
ছবি এসে অপরার সামনে দাঁড়াল। তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
অপরা বিষণ্ণ চোখে ছবির দিকে তাকাল। তাহলে কী করব?
কী করবে মানে? কক্সবাজার এসে বিকেলবেলা লোকে কী করে? তাড়াতাড়ি চল। সূর্য ডুবে যাবে।
আমি যাব না ভাবী।
কেন?
ভাল লাগছে না।
বল কী! সবাই মিলে এখানে বেড়াতে এলাম আর প্রথম দিনেই তোমার ভাল লাগছে না?
অপরা কথা বলল না।
ছবি যেন একটু বিরক্ত হলো। ভাল না লাগলে এসেছ কেন?
আসতে চাইনি। তোমরাই জোরাজুরি করলে!
সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে অপরার একটা হাত ধরল ছবি। এখনও সেই জোরাজুরিটা করছি। চল।
আমার সত্যি ভাল লাগছে না।
সমুদ্রতীরে চল, দেখবে ভাল লাগছে। সমুদ্র মানুষের মন বদলে দেয়।
অপরা মনে মনে বলল, আমারটা বদলাতে পারবে না।
তারপর ছবির সঙ্গে তার রুম থেকে বেরুল।
.
০২.
শৈবালের সামনের দিককার বাগানে বেশ একটা আড়াল দেখে দাঁড়িয়ে আছে দিপু। তার পরনে স্কীনটাইট ফেডেড জিনস আর আকাশি রংয়ের টিশার্ট। পায়ে বুট, চোখে সানগ্লাস। মুখে চুইংগাম আছে দিপুর। আর হাতে একটা ক্যামেরা। ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় কারও জন্য অপেক্ষা করছে সে।
কিন্তু চোখে সানগ্লাস থাকার ফলে বোঝা যাচ্ছে না কোনদিকে তাকিয়ে আছে সে।
দিপুর অদূরে শৈবাল থেকে সমুদ্রের দিকে যাওয়ার পায়েচলা পথ। সেই পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন হোসেন সাহেব আর রঞ্জু। পাশে সবুজ ঘাসের মাঠ পেয়ে তাতে ছুটোছুটি করছে টুপু।
এসময় অপরাকে নিয়ে ছবি এসে দাঁড়াল হোসেন সাহেব এবং রঞ্জুর সামনে।
মেয়েকে দেখেই চঞ্চল হলেন হোসেন সাহেব। কোথায় ছিলি তুই? তাড়াতাড়ি চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রে সূর্য ডোবে খুব তাড়াতাড়ি। এই দেখবি নামতে শুরু করেছে, তারপরই দেখবি টুপ করে চলে গেছে পানির তলায়।
