ওরা দুজন মকবুল সাহেবের মুখোমুখি বসল।
সেলিম বলল, কাগজপত্রগুলো সব রেডি আছে?
জ্বী। হাতের কাছেই আছে।
ড্রয়ার থেকে ফাঁইলটা বের করলেন, সেই মোটা খাতাটা বের করলেন।
এসবের দিকে ফিরেও তাকাল না মনজু। আচমকা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল মকবুল সাহেবের দিকে। আমি মনজু। সুমির ভাই।
মনজুর হাত ধরলেন মকবুল সাহেব। মাসুদ সাহেবের এতবড় ছেলে আছে বলে তো জানতাম না!
আমি তার ছেলে নই, তার সহযোদ্ধার ছেলে।
তাই বলুন।
তারপর সেলিমের দিকে তাকালেন মকবুল সাহেব। চেক এনেছেন বাবা?
সেলিম বলল, জ্বী।
মনজু বলল, তবে অংকটা এখনও লেখা হয়নি। একজাক্ট ফিগারটা…।
চারলক্ষ বেয়াল্লিশ হাজার। চক্রবৃদ্ধি হার।
কোনও অসুবিধা নেই।
তারপর একটু থামল। আপনি আমার বাবার বয়সী। আপনাকে চাচা বলতে পারি?
মকবুল সাহেব বিগলিত হলেন। নিশ্চয়, নিশ্চয়। চা দিতে বলি। চা খান বাবা।
মনজু হাসল। খেতে পারি, তবে দোকানের চা। সঙ্গে নিমাকপারা। বাবা বলেছেন পুরনো ঢাকার দোকানের চায়ের সঙ্গে নিমাকপারা অসাধারণ লাগে।
কোনও অসুবিধা নেই। এখুনি আনিয়ে দিচ্ছি।
মতি নামের অল্প বয়েসি একটা কাজের ছেলে আছে মকবুল সাহেবের। মতিকে ডাকলেন তিনি। মতি, মতি।
ভেতর থেকে ছুটে এল মতি। জ্বী।
সালুর দোকান থেকে কেটলি ভরে চা আন আর দশটাকার নিমাকপারা।
সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেল মতি।
মনজু বলল, আপনাকে খুব ভাল লেগেছে চাচা। আপনি লোক ভাল।
হ্যাঁ বাবা। লোক আমি খারাপ নই।
একাত্তর সালে কোথায় ছিলেন?
গ্রামে ছিলাম বাবা। বিক্রমপুরের ইছাপুরা গ্রাম।
মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন?
অস্ত্র কাঁধে নিয়ে যুদ্ধ করিনি, অর্থাৎ সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা না। তবে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যতটা সম্ভব সাহায্য করেছি।
এটা আপনি না বললেও আমি বুঝতাম।
মকবুল সাহেব অবাক হলেন। কী ভাবে?
মাসুদ চাচাকে টাকা দিয়ে যেভাবে সাহায্য করেছেন তাতে বোঝা যায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আপনার গভীর ভালবাসা আছে।
এই কথাটা ধরল সেলিম। কিন্তু টাকা তো ইন্টারেস্টে দিয়েছেন!
মুখ ঘুরিয়ে সেলিমের দিকে তাকাল মনজু। যেভাবেই হোক, দিয়েছেন তো!
তারপর আবার মকবুল সাহেবের দিকে তাকাল মনজু। চাচা, মাসুদ চাচার ফ্যামিলি সম্পর্কে আপনি সবই জানেন। তাঁর মৃত্যুতে খুবই বিপাকে পড়েছে পরিবারটি। যে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে, জীবন দিয়ে একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন আপনাদেরকে, সেরকম এক বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার আজ বিপর্যস্ত। সেই পরিবারটিকে আপনি একটু সাহায্য করতে পারেন না?
মকবুল সাহেব ফ্যাল ফ্যাল করে মনজুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মতি এসময় চা এবং নিমাকপারা নিয়ে এল।
এক মুঠো নিমাকপারা মুখে দিয়ে এক চুমুক চা খেল মনজু। তারপর পকেট থেকে চেক বই বের করল। চক্রবৃদ্ধি হারে কত টাকা বললেন?
মকবুল সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন, সব হিসাব তো আপনি উলট পালট করে দিয়েছেন বাবা। আপনার কথা শুনে একাত্তর সালে ফিরে গেলাম। সেই দুর্দিন থেকে যারা আমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন, দেশ স্বাধীন করে দিয়েছেন সেরকম এক মুক্তিযোদ্ধার পরিবার বিপদে পড়েছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে সাহায্য করব। আপনি আমার মূল টাকাটাই দিন বাবা। তিনলাখ। ইন্টারেস্ট বাদ।
মনজু মুগ্ধ গলায় বলল, গ্রেট।
.
১৫.
হোয়াইট হাউস হোটেলের লবিতে বিষমুখে বসে আছে সুমি।
প্রায় ছুটতে ছুটতে তার সামনে এল মনজু। তুই হঠাৎ আমার হোটেল? রিসেপসান থেকে ফোন করেছে, এক মহিলা মানে ভদ্রমহিলা দেখা করতে চান। শুনে আমি তো হতভম্ব। আমার কাছে আবার ভদ্রমহিলা কে? এই, তুই কি ভদ্রমহিলা নাকি? বলতে পারলি না তুই আমার বোন!
সুমি কথা বলল না। অপলক চোখে মনজুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
মনজু অবাক হলো। কী ব্যাপার? এত গম্ভীর হয়ে আছিস কেন?
সুমি গম্ভীর গলায় বলল, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
সুমির কথা বলার ধরনে কী যে মুগ্ধ হলো মনজু! বলল, তুই যে আমাকে তুমি করে বলছিস এবং সত্যি আপন ভেবেছিস এতেই আমি খুশি। এখন যদি তুই আমার সঙ্গে রাগারাগিও করিস, আমি কিছু মনে করব না। বল, কী কথা?
তুমি আগে আমার সামনে বস।
মনজু বসল।
সুমি বলল, এসব তুমি কী করেছ?
কথাটা প্রথমে বুঝতে পারল না মনজু। বলল, কী করেছি?
তারপরই চমকাল। সর্বনাশ! দুলাভাই কি তোকে সব বলে দিয়েছে? না না এটা তো ঠিক করেনি।
সে বলেনি।
তাহলে?
মকবুল সাহেব আমাকে ফোন করেছিলেন।
তাই বল।
কিন্তু আমাদের জন্য এতটা তুমি কেন করলে?
শোন, মানুষের জীবন আসলে এক যুদ্ধক্ষেত্র। বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যেকেই যুদ্ধ করছে। কখনও দেশের জন্য, কখনও জীবনের জন্য। যুদ্ধের নিয়ম হচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও সহযোদ্ধাকে সাহায্য করা। যে সাহায্য তোর বাবা আমার বাবাকে করেছিলেন।
এতকাল পর তুমি সেই ঋণ শোধ করলে?
ঋণ শোধ নয়। জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত হওয়া কিছু যোদ্ধার পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছি। সংক্ষেপে এই হচ্ছি আমি।
একটু থামল মনজু। শোন, আজই ফিরে যেতে হচ্ছে। রাত সাড়ে এগারোটায় ফ্লাইট।
সুমি চমকাল, কী?
হ্যাঁ। বাবা ফোন করেছিলেন। আমাকে ছাড়া নাকি ভাল লাগছে না। আমাকে নাকি খুব মিস করছেন। এজন্য হঠাৎ করেই …।
মার সঙ্গে দেখা করে যাবে না?
অবশ্যই। চল এখুনি যাই।
চল।
তার আগে দুলাভাইকে একটা ফোন করি। আজ তো ছুটির দিন। তাকেও আসতে বলি।
