বিয়ার শেষ করে শিলা রহমান বলল, ‘আজ যে পর্যন্ত ডিকটেশন দিলেন তা টাইপ করতে আমার দু’দিন লাগবে। আজ মঙ্গলবার। বিষ্যুদবার দুপুরের মধ্যে আপনার জিনিস পেয়ে যাবেন, অবশ্য সন্ধ্যা বেলাতেও যদি কাজটা করি।’
‘আপনি সন্ধ্যাবেলাও কাজ করেন নাকি? ‘
‘সাধারণত করি না। তবে আপনারটা করব। কারণ এত মজার কাজ জীবনে পাইনি আমি। আর এ জন্যে কোনও পেমেন্ট নেব না। আপনি যদি টাকা নেয়ার জন্যে জোরাজুরি করেন তা হলে বলব আজকের বিকেলটা খামোকাই নষ্ট হলো আপনার।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন ডক্টর। তিনি বুঝতে পেরেছেন মেয়েটার মনে যা, মুখেও তাই। কাজেই ওর সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। তিনি বড়জোর একটা কাজই করতে পারবেন-বোস্টন ফেরার পর শিলার জন্য একটা উপহার কিনে পাঠিয়ে দেবেন। ওটা নিশ্চয়ই অগ্রাহ্য করতে পারবে না শিলা রহমান।
‘বেশ, শিলা। আপনার কথাই রইল। তা হলে আজ থেকে আপনাকে আমার পার্টনার হিসেবে কাজ করতে হবে। আমি কি আপনাকে এখন কিছু কথা বলতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন। বলুন না।’
‘আপনাকে এখন থেকে চোখ, কান খোলা রেখে চলতে হবে। আপনি শহরে থাকেন। কাজটা সহজ হবে আপনার জন্য। আমি শহরে যাই হপ্তায় একদিন। ফলে কোনও ঘটনা ঘটলে তা জানতে পারি দেরিতে। কাজেই এখন থেকে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা যদি ঘটে, যা আমার মানে আমাদের তদন্তের সাথে মিলে যায়, আপনি সেসব সম্পর্কে ভালভাবে খোঁজ-খবর নিয়ে রাখবেন।‘
‘তাতে কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু আপনার সাথে আমার যোগাযোগ হবে কী করে? আপনার বাসায় বোধহয় ফোন নেই, নাকি আছে?’
‘না, নেই। এ জন্যে এখন বরং আফসোস হচ্ছে। তবে প্রায়ই আমি এ শহরের পোস্ট অফিসে যাই চিঠিপত্র এসেছে কিনা দেখতে। আপনি পোস্ট মাস্টারের কাছে কোনও মেসেজ রেখে গেলে আপনাকে ফোন করব। তা হলে কথা ওটাই রইল-বিষ্যুদবার আপনার সাথে দেখা হচ্ছে। চলুন, ওঠা যাক।’
হ্যান্ডব্যাগে নোটবই আর পেন্সিল ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল শিলা রহমান। সদর দরজা দিয়ে বেরুল ওরা, উঠল স্টেশন ওয়াগনে। ডক্টর স্টার্ট দিলেন ইঞ্জিন, গিয়ার ছাড়লেন; ক্লাচ রিলিজ করতে যাচ্ছেন এমন সময় শিলা বলল, ‘এই রে, আপনার বেড়ালটার সাথে তো পরিচয় করিয়ে দিলেন না। বলর ভাবছিলাম, ভুলে গেছি। অবশ্য অসুবিধা নেই।’
আবরার ক্লাচ পেডালে পা রেখে ঘুরে তাকালেন শিলার দিকে। ‘বেড়াল? আমি বেড়াল পুষি না, শিলা। আপনি আমার বাড়িতে বেড়াল দেখেছেন?’
‘আ-হ্যাঁ। দেখলাম বলেই তো মনে হলো। ওই সময়-’
আবরার লিভার নিউট্রালে এনে ইগনিশন সুইচ অফ করলেন। ‘বোধহয় রাস্তার কোনও বেড়াল ঢুকে পড়েছে। একটু বসুন। আমি চেক করে আসছি। বেড়াল ঢুকলে ওটাকে বের করে দেয়াই ভাল। কার না কার বেড়াল।’
গাড়ি থেকে নেমে আবার বাড়ির মধ্যে ঢুকলেন ডক্টর দরজা বন্ধ করে। দ্রুত নীচতুলা ঘুরে দেখলেন। প্রায় সবগুলো জানালাই বন্ধ। দু’একটা দু’এক ইঞ্চি ফাঁক হয়ে আছে। কিন্তু ওই ফাঁক দিয়ে বেড়াল ঢোকার উপায় নেই। ওপরে গেলেন তিনি। বেড়ালের টিকিটিও চোখে পড়ল না। বেডরুমে ঢুকলেন। এ রুমের একটা জানালা খোলা। গাছের ডাল ঝুলে আছে জানালা থেকে কয়েক ফুট ওপরে। ওখান থেকে লাফ দিয়ে নামা যায় বেডরুমে, কিন্তু বেরুনো সম্ভব নয়। কারণ নীচে নরম ঘাস নেই, আছে শক্ত পাথুরে মেঝে। ওখানে লাফ দিয়ে নামতে গেলে হয় বেড়াল মারা যাবে নয়তো মারাত্মক আহত হবে।
হঠাৎ ভাবনাটা মাথায় এল তাঁর। এ বাড়িতে যদি সত্যি কোনও বেড়াল ঢুকে থাকে, আর ওটার যদি মরার খায়েশ হয়, যেমন কোহলের বেড়ালটা মারা গেল, বা অন্যান্য প্রাণীগুলো-
আবরার বেডরুমের জানালা বন্ধ করে নেমে এলেন নীচে, দরজা খুলে বেরুলেন। বেড়াল থাকলে থাকুক, উনি এসে আবার খুঁজবেন। তখন এ নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে।
গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিলেন আবরার। বললেন, ‘কোনও বেড়াল চোখে পড়েনি আমার, শিলা। আপনি সত্যি দেখেছিলেন তো? কোথায়, কখন?’
‘তখন তো দেখেছিলাম মনে হচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে দেখার ভুল হতে পারে। আপনি যখন ডিকটেশন দিয়ে এক মিনিটের জন্য থেমে কী যেন ভাবতে শুরু করলেন তখন বেড়ালটাকে দেখি আমি। হলওয়ে প্যাসেজের কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল ওটা, রান্নাঘর লাগোয়া সিঁড়ির ধারে। আপনার মনোযোগ নষ্ট হবে ভেবে ওটাকে ডাকিনি আমি। আপনি আবার ডিকটেশন শুরু করলেন, তাকিয়ে দেখি চলে গেছে ওটা।’
এক মুহূর্ত চুপ করে রইল শিলা। তারপর বলল, ‘এখন মনে হচ্ছে ভুলই দেখেছি। অবশ্য ওই সময় ভুল কিছু দেখা অস্বাভাবিক ছিল না।
‘আমারও তাই ধারণা,’ তরল গলায় বললেন ডক্টর। যাহোক, আমার বাড়িতে বেড়ালের খোঁজ পেলে আপনাকে জানাব আমি।’
কিছুক্ষণ কোনও কথা হলো না দু’জনে। আপন মনে গাড়ি চালাচ্ছেন আবরার, নীরবতা ভেঙে শিলা বলল, ‘ডক্টর, আপনার কি মনে হয় এমন কোনও রোগ সত্যি আছে যা প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে সবাইকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচনা যোগায়?
‘এমন কোনও রোগের কথা শুনিনি কখনও। এটা খুব বিরল কোনও রোগ হবে।’
‘খুবই বিরল। এমন কোনও রোগের অস্তিত্ব থাকলে নিশ্চয়ই শুনতে পেতাম।’
‘ঠিকই বলেছেন। তবে, শিলা, ওই রোগের কথা বাদ দিয়ে অন্য কোন সম্ভাবনার কথা মনে হয় না আপনার? অদ্ভুত কোনও কাকতালীয় ঘটনা-অন্য কোনও ব্যাখ্যা?’
