‘হ্যাঁ, ব্যাখ্যা আমি একটা দিতে পারি। আপনি গাডারডিন সোয়াইনের কথা শুনেছেন, ডক্টর?’
চোদ্দ
‘গাডারডিন সোয়াইন…’ আনমনা গলায় বললেন ডক্টর। ‘কথাটা কোথায় যেন শুনেছি। কিন্তু মনে করতে পারছি না।’
‘বাইবেলে আছে,’ বলল শিলা। ‘বুক অভ লিউকে। একবার যীশুখৃষ্ট ভূতে পাওয়া এক লোককে দর্শন দিতে এলেন। কাছেই ছিল একদল রাজহাঁস। দাঁড়ান, বাইবেল থেকে উদ্ধৃতিটা তুলে ধরছি আমি তারপর শয়তান বা ভূতগুলো লোকটিকে ছাড়িয়া চলিয়া গেল এবং প্রবেশ করিল রাজহাঁসদের মধ্যে এবং রাজহাঁসের দল দ্রুত হ্রদের গভীরে নামিয়ে পড়িল এবং দম বন্ধ হইয়া মরিয়া গেল।’
ডক্টর আঁতকে উঠলেন। শিলা, আপনি নিশ্চয়ই বলতে চাইছেন না যে আপনি ভূত বা জিমে ধরা কোনও কিছুতে বিশ্বাস করেন।
‘অবশ্যই বিশ্বাস করি না। তবে কারও ওপর ভর করা-’
‘কে বা কী ভর করবে? আমি বাস্তববাদী মানুষ, শিলা। আমি টেলিপ্যাথি বা টেলিকাইনিসিসের সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিতে চাই না। এমনকী সম্মোহন বা পোস্ট হিপনোটিক সাজেশনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও মেনে নিতে রাজি। কিন্তু প্যারাসাইকোলজি যদি ব্যাখ্যাও দিতে চায় যে কেউ কারও ওপর ভর করতে পারে এবং তাকে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে, আমি তা বিশ্বাস করব না কিছুতেই।’
‘কিন্তু এ কথা বিশ্বাস করেন, এ- ব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবী ছাড়াও ছড়িয়ে আছে কোটি কোটি গ্রহ? এ সব গ্রহে যে অন্য কোনও প্রাণীর বাস নেই তা কী করে-কী করে জানব, ও সব গ্রহের কোনও প্রাণীর অন্যের ওপর ভর করে তাকে দিয়ে যা খুশি করানোর ক্ষমতা রাখে? আপনি কী করে নিশ্চিত হন এসব ঘটনার পেছনে ভিনগ্রহবাসীর হাত নেই?’
‘হুম্ম’ বললেন আবরার। ‘আমি নিশ্চিত হয়ে কিছু বলছি না। আর জানিও না সত্যি এরকম কিছু এখানে আছে কিনা। কিন্তু শুধু একজন ভিনগ্রহবাসী কেন, ভিনগ্রহবাসীরা নয় কেন?
‘কারণ আমার ধারণা একজনই এসব ঘটাচ্ছে। ভেবে দেখুন, মেঠো ইঁদুরটা মারা যাবার পর রনি মরে গেল। তারপর মরল রনিকে খুঁজতে যাওয়া কুকুরটা, তারপর পেঁচাটা, তারপর বেড়ালটা। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাইছি। দুটো মৃত্যুর ঘটনা কখনোই একসাথে ঘটছে না। যে এ ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে সে একজনকে মেরে তারপর আরেকজনকে তার হোস্ট বানাচ্ছে। অর্থাৎ হোস্টের মৃত্যু ঘটার পর সে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
শোল্ডার ব্লেডে কী যেন সুড়সুড় করে উঠল ডক্টরের। কণ্ঠে জোর এনে বললেন, ‘এ সবই আসলে আপনার কল্পনা, আমারও মনে হয় রহস্য সাহিত্য ছেড়ে এখন থেকে সায়েন্স ফিকশন পড়তে হবে।’
‘তাই পড়ন। তবে যা ঘটছে, একটু খতিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন তা নিছক কল্পনা হয়তো নয়। আপনার বাড়িতে যে বেড়ালটাকে আমি দেখেছি, ওটা যদি সত্যি ওখানে থেকে থাকে, আমার ধারণা ওটা সেই ভিনগ্রহবাসীর হোস্ট। বেড়ালটাকে পাঠানো হয়েছে আমাদের ওপর নজর রাখার জন্য।’
হেসে উঠলেন আবরার। ‘তা হলে ওটাকে হত্যা করার পর ভিনগ্রহবাসী নিশ্চয়ই আমার ওপর ভর করবে? যদি এমন কিছু ঘটে, আপনাকে আমি জানাব, শিলা।’
ঠাট্টা করে কথাটা বললেও শিলাকে তার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়িতে ঢোকার সময় ব্যাপারটা আর ঠাট্টা মনে হলো না ডক্টর আবরারের কাছে। শিলা যা বলেছে তার কোনও যুক্তি নেই। কিন্তু ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়?
দরজা সাবধানে বন্ধ করলেন ডক্টর। চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। কিছুই চোখে পড়ল না, কিছু শুনতেও পেলেন না।
পাইপ ধরিয়ে লিভিংরুমে চলে এলেন তিনি, বসলেন গদি মোড়া চেয়ারে। একটা পেপার ব্যাক টেনে নিলেন। কিন্তু বইটা খুলতে ইচ্ছে করল না।
বাড়িটা সার্চ করে দেখবেন, নাকি একবার? কিন্তু বেড়াল খোঁজার কাজ বড় ক্লান্তিকর। আর এখানে বুদ্ধিমান কোনও বেড়াল লুকিয়ে থাকবে বলেও মনে হয় না। কারণ এখানে লুকোনোর জায়গাও নেই। আর কোথায় খুঁজবেন তিনি? হয়তো ওটা এখন কিচেনে বসে আছে। তাঁর আওয়াজ পেয়ে হলঘরে ঢুকে পড়বে। আর বেড়াল নিঃশব্দে চলাফেরায় ওস্তাদ। তিনি টেরও পাবেন না কোত্থেকে কোথায় যাচ্ছে ওটা
অবশ্য ওটা যদি সত্যি বেড়াল হয়ে থাকে। ওটা কি সত্যি বেড়াল? সাধারণ বেড়াল হলে তো লুকোচুরি খেলার কথা নয়। এতক্ষণ লুকিয়েও বা থাকবে কেন?
বেড়ালটাকে আবার খোঁজা শুরু করলেন ডক্টর কিন্তু বৃথাই খোঁজ চলল। ওটার টিকিটিও দেখা গেল না কোথাও। খুঁজতে খুঁজতে খিদে লেগে গেল আবরারের। তিনি দরজা ভাল করে বন্ধ করে খেতে গেলেন পাবে। ওখানে ডিনার সেরে, পোকার খেলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাঝরাত হয়ে গেল।
বাড়ি ফেরার পর আবার বেড়ালের চিন্তায় পেয়ে বসল তাঁকে। চাঁদের আলোয় ফক ফক করছে সারা বাড়ি। ইঁদুর দৌড়ে গেলেও চোখে পড়বে আবরারের। তিনি কিচেনে ঢুকে আলো জ্বাললেন। যাবার আগে ময়দা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মেঝেতে। যদি সত্যি বাড়িতে বেড়াল থাকে, ময়দা খাওয়ার লোভে ওটা আসতে পারে ওখানে।
ময়দার ওপর বেড়ালের পায়ের ছাপ! উঁচু স্বরে ডাকলেন ডক্টর। ঠিক আছে, বেড়াল, তোমার চেহারাটা এবার দয়া করে দেখাও বাপু। কোনও কিছু খেতে চাইলে বলো। আমি তোমাকে মারব না। তবে তোমার চেহারা না দেখা পর্যন্ত তোমাকে আমি এখান থেকে যেতেও দেব না।’
ফ্রিজ খুলে বিয়ারের ক্যান বের করলেন আবরার, বসলেন টেবিলে। এই প্রথম তাঁর ভয় ভয় লাগছে। ভয়টা কী নিয়ে বুঝতে পারছেন না, তবে জানেন কিচেনের আলো নিভিয়ে অন্ধকারে দোতলার বেডরুমে যাওয়া সম্ভব হবে না তাঁর পক্ষে!
