ফ্রিজের দরজা খোলার শব্দ পেল সে, তারপর পরিষ্কার শুনতে পেল ওদের গলা।
তেরো
‘আপনি বিয়ার খান না, মিস রহমান?’ জিজ্ঞেস করলেন ডক্টর। ‘ডিকটেটিং একটা নীরস কাজ। আর ডিকটেশন নেয়া তো আরও নীরস।’
মৃদু হাসল শিলা। ‘খাই। তবে বিয়ার খাওয়ার কথা কাউকে বলতে পারবেন না কিন্তু। এত ছোট শহরে শিক্ষকরা বিয়ার খায় না বা ধূমপান করে না।’
‘কথা দিলাম কাউকে বলব না,’ ফ্রিজ থেকে আরেকটা বিয়ারের ক্যান বের করতে করতে বললেন আবরার। ইতস্তত সুরে যোগ করলেন। ‘ইয়ে-ডিকটেটিং করার সময় ধূমপান করলে আপনার অসুবিধে হবে?’
‘মোটেই অসুবিধে হবে না।’
দু’গ্লাস বিয়ার নিয়ে শিলার সামনে বসলেন ডক্টর, একটা গ্লাস ঠেলে দিলেন মেয়েটার দিকে।
‘কাগজ-কলম আপাতত রাখুন, মিস শিলা। এক্ষুণি ডিকটেটিং শুরু করতে ইচ্ছে করছে না। ডিকটেটিং-এর চেয়ে আমার কথা শুনতেই বোধহয় আপনার ভাল লাগবে। মাঝে মাঝে ভাবি আমার ছাত্ররাও বোধহয় আমার ডিকটেশনের চেয়ে দ্রুত লিখতে পারে।’
‘আপনার ছাত্ররা? আপনি শিক্ষকতাও করেন নাকি, ডক্টর?’
‘হ্যাঁ, মিস শিলা, এম আই টি-তে ফিজিক্স পড়াই। ইলেক্ট্রনিক্সে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছি। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সেও তাই।’
শিলা কাগজ-কলম নামিয়ে রাখল টেবিলে, অবাক দৃষ্টিতে তাকাল ডক্টরের দিকে। ‘আবরার! ড. সি. আর. আবরার? বড় বড় স্যাটেলাইট প্রজেক্ট নিয়ে আপনি কাজ করেছেন, তাই না?’
হাসলেন ডক্টর। ‘তেমন কিছু না। তবে আপনি আমার নামটা জানেন জেনে গর্ববোধ করছি। বিজ্ঞানের প্রতিও আগ্রহ আছে নাকি?’
‘অবশ্যই। বিশেষ করে গ্রহ-তারা ইত্যাদি বিষয়ে আমার আগ্রহ প্রবল। সায়েন্স ফিকশনের একনিষ্ঠ পাঠক বলতে পারেন আমাকে।’
‘আমি আবার রহস্য সাহিত্যে বেশি মজা পাই। রিলাক্সের প্রয়োজন হলে সায়েন্স থেকে যত দূরে সরে যেতে পারি ততই ভাল লাগে।’
‘তা বুঝতে পারছি,’ বলল শিলা রহমান। ‘আপনি কি সায়েন্টিফিক কোনও বিষয়ে আমাকে ডিকটেশন দিতে চান??
‘না ঠিক তা নয়। আসলে যে ব্যাপারে কথা বলতে চাইছি ওটার ব্যাখ্যা দেয়া মুশকিল। এখানে অদ্ভুত কিছু একটা ঘটছে, শিলা। আমি ব্যাপারটা নিয়ে কিছু তদন্তও চালিয়েছি। ভুলে যাবার আগে ওগুলো স্টেটমেন্টের মত করে লিখতে চাইছি।’
তারপর রনি, জন এবং হেলমুটের আত্মহত্যার বিষয়ে নিজের সন্দেহের কথা খুলে বললেন ড. আবরার। প্রসঙ্গত এল কুকুর, কাক, বেড়াল, পেঁচা ইত্যাদি সবার কথা। ডক্টরের ধারণা এরাও আত্মহত্যা করেছে।
‘কিন্তু কেন, মিস শিলা,’ পাইপে আগুন ধরাতে ধরাতে বললেন ডক্টর। ‘এই ছয়টি আত্মহত্যার ঘটনার মধ্যে কি কোনও কানেকশন বা সম্পর্ক রয়েছে? মিসেস কোহলের ফ্রিজ থেকেই বা সুপ আর মাংসের ঝোল অদৃশ্য হয়ে গেল কেন? এসব ছোটখাট ঘটনার মধ্যে কি আপনি রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন না?’
আবরারের কথা শুনতে শুনতে চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছিল শিলার, চেহারা বিবর্ণ। আবরার ধারণা করলেন ভয়ে নয়, উত্তেজনায়।
শিলা শান্ত গলায় বলল, ‘এবার আপনি ডিকটেশন শুরু করতে পারেন, ডক্টর।’
পাইপ ফুঁকতে ফুঁকতে ডিকটেশন শুরু করলেন আবরার। তবে ধারাবাহিকভাবে নয়; মাঝে মাঝে দু’এক মিনিটের জন্য চুপ করে থাকলেন, প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করলেন বাছাই করে, কারণ ডক্টর চাইছেন পরিষ্কার, বিশদ একটি গল্প।
মোটামুটি ঘণ্টা দেড়েক ডিকটেশন চলল। প্রথম তিনটে আত্মহত্যার ঘটনা এবং টাইগারের র্যাবিস বিষয়ক নেতিবাচক রিপোর্ট পর্যন্ত এসে থামলেন ডক্টর। বললেন, ‘কোহলের ব্যাপারে পরে কথা বলব। আপনিও নিশ্চয়ই লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। একটু রেস্ট নেয়া দরকার।’
‘আমার রেস্টের প্রয়োজন নেই,’ বলল শিলা। ‘নতুন আরেকটা অংশে ঢুকতে যাচ্ছি। রনির ব্যাপারটা সবই জানি আমি। তবে মি. কোহলের ব্যাপারে কিছুই জানি না। কাজেই আপনি শুরু করতে পারেন, ডক্টর।
‘দশ মিনিট সময় দিন আমাকে, শিলা, আরেক গ্লাস বিয়ার চলবে তো?’
শিলা ক্ষীণ আপত্তি জানালেও আমল দিলেন না ডক্টর। তার জন্যে বিয়ার নিয়ে এলেন।
গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে শিলা জানতে চাইল, ‘ক’ কপি দরকার আপনার?’
‘তিন কপি,’ বললেন ডক্টর। ‘একটা আমার জন্য আর দুটো পাঠাব আমার বন্ধুদেরকে তাদের মতামত জানতে। এদের একজন খুব বড় ডাক্তার। তাকে জিজ্ঞেস করব র্যাবিসের মত আর কোনও দুর্লভ রোগ আছে কিনা যে রোগ প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাই পাগল হয়ে যায়। আরেকজন অংকবিদ। সে সবকিছু যুক্তি দিয়ে বিচার করে। তার কাছে জানতে চাইব যে সব ঘটনা ঘটছে এখানে তার মধ্যে কোনও পারস্পরিক সম্পর্ক আছে নাকি স্রেফ কাকতালীয় বলে মনে করে সে এগুলোকে।’
‘আমি যদি নিজের জন্যে একটা কপি তৈরি করি, আপনার কোনও আপত্তি আছে, ডক্টর?’
‘কোনও আপত্তি নেই, শিলা।’
হাসল শিলা রহমান। ‘বেশ। আমি অবশ্য নিজের জন্যে একটা কপি তৈরি করতাম। তবে আপনার অনুমতি পেয়ে ভাল হলো।’
আবরারও হাসলেন। খোলামেলা স্বভাবের শিলাকে তাঁর ভাল লেগেছে। কোনও জটিলতা নেই তার ভেতরে। এ ধরনের সহজ সরল মানুষ পছন্দ করেন ডক্টর। ইতোমধ্যে ভাবতে শুরু করেছেন নিজের সেক্রেটারী হবার প্রস্তাব শিলাকে দেবেন কিনা। তাঁর ডিপার্টমেন্টের বাজেট আগামী বছর বৃদ্ধি করা হবে। তিনি এই প্রথম একজন ফুলটাইম সেক্রেটারী এবং রেকর্ড ক্লার্ক পাবেন। শিলা তার প্রস্তাবে রাজি হলে ভালই হবে। তিনি একজন দক্ষ সেক্রেটারী পাবেন আর শিলা এখানকার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবে এম আই টি-তে। তবে প্রস্তাবটা পরে দিলেও চলবে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।
