‘বসুন, ডক্টর,’ বলল শিলা, ‘আমার নোটবুক নিয়ে আসি-‘
‘ইয়ে, মিস শিলা। এখানে ডিকটেট করতে পারলে ভালই হত। তবে মনে হয় আমার বাসায় বসে কাজটা আরও ভালভাবে করতে পারব। এখান থেকে মাইল আটেক দূরে আমার বাসা, শহরের শেষ মাথায়, বাসকো রোডে। আপনি ওখানে বসে ডিকটেশন নিয়ে এখানে এসে টাইপ করবেন; সমস্যা হবে কোনও? আমি অবশ্য একা থাকি—’ শেষ দিকে আমতা আমতা করতে লাগলেন তিনি।
মুচকি হাসল শিলা। ‘এ পৃথিবীতে আমরা সবাই একা, ডক্টর, ওতে কোনও সমস্যা হবে না। চলুন, যাওয়া যাক।’
শিলা নোটবই আর পেন্সিল নিয়ে ডক্টর আবরারের সাথে তাঁর স্টেশন ওয়াগনে উঠে বসল।
.
হোস্ট হিসেবে বেড়ালের তুলনা নেই, ভাবছে ভিনগ্রহের খুনী। ওরা নিঃশব্দে চলে, দ্রুত গতিসম্পন্ন, শ্রবণশক্তিও প্রখর, যেকোনও সময় যে কোনও জায়গায় যাবার ক্ষমতাও রাখে। তাই মার্জার শ্রেণীটাকে খুব পছন্দ হয়েছে তার।
বিলি র্যামনের দোকানে কালো বেড়ালটাকে সে-ই পাঠিয়েছিল চর হিসেবে। শেরিফ আর সেই ছোটখাট লোকটা, আবরার-ওরা বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করেছে তার মনে। একটা চড়ইকে পাঠিয়েছিল সে আবরারের গাড়ির পিছু পিছু। কিন্তু চড়ুইটা গাড়িটাকে এক পর্যায়ে হারিয়ে ফেলে। তারপর সে একটা কালো বেড়ালকে হোস্ট করে। বেড়ালটাকে দিয়ে সারা শহর চক্কর দিয়েছে সে। কিন্তু অত্যধিক পরিশ্রম সহ্য করতে না পেরে মারা গেছে বেড়ালটা। তারপর সে একটা ধূসর রঙের ক্ষুদে বেড়ালকে হোস্ট বানিয়েছে। বেড়াল পেতে তার কষ্ট নেই। কারণ এদিকে খামার বাড়ির ছড়াছড়ি। আর ওসব খামার বাড়ি থেকে একটা দুটো বেড়াল নিয়ে আসা কোনও ব্যাপার নয়।
ধূসর বেড়ালটাকে সে কাজে লাগিয়েছে শহরের বাইরের খামার বাড়িগুলোতে অনুসন্ধানের জন্যে। তার ধারণা, আবরার নামের সেই লোকটি কোনও খামার বাড়িতে থাকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ধূসর বেড়াল যখন হাল ছেড়ে দিয়ে দুটো ফার্ম হাউজের মাঝখানের একটা মাঠ দিয়ে আসছে সকাল এগারোটার পরে, হঠাৎ পুবদিক থেকে একটা গাড়ি আসার শব্দ শুনে সে তাকিয়ে দেখে, একটা পুরানো স্টেশন ওয়াগন শহরের দিকে যাচ্ছে। আর ড্রাইভিং সিটে বসে আছে আবরার স্বয়ং।
ভিনগ্রহের প্রাণী ততক্ষণে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে আবরার নামের লোকটি শহরের শেষ মাথার খামার বাড়িতে বাস করে। ব্যাপারটা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হবার জন্যে ধূসর বেড়ালকে সে পাঠিয়েছে বাড়ির হাল- হকিকত জানতে।
বেড়াল বেশ কয়েকবার চক্কর দিল গোটা বাড়ি। জেনারেটর চলছে দেখে বোঝা গেল আবরার আবার ফিরে আসবে এ বাড়িতে। সম্ভবত একাই থাকে সে এখানে; নাকি কাউকে রেখে গেছে সে তার অবর্তমানে?
বাড়িতে ঢোকার রাস্তা খুঁজল বেড়াল। নেই। নীচতলায় জানালা অনেক, তবে দু’এক ইঞ্চি মাত্র ফাঁক করা। ঢোকা যাবে না। শুধু ওপরের তলার একটা জানালা খোলা।
বেড়াল বাড়িটার গন্ধ শুঁকল, কান পাতল। কোনও সাড়াশব্দ নেই। তার মানে এখানে দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি থাকে না।
ভিনগ্রহের হন্তারক এবার বেড়ালটাকে বিশ্রাম দিল। উঠোনের এক প্রান্তে, ঝোপে ঘুমিয়ে পড়ল বেড়াল। কোনও শব্দ কানে গেলেই জেগে উঠবে সাথে সাথে।
রেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। ঘণ্টাখানেক পর গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। আবরার এসেছে তার স্টেশন ওয়াগন নিয়ে। তবে একা নয়, সাথে এক মহিলাও আছে।
মহিলাকে চিনতে পারল ভিনগ্রহের প্রাণী। রনির স্মৃতিতে এ মহিলার কথা ছিল। এর নাম শিলা রহমান, রনির হাইস্কুলের ইংরেজির টিচার। মহিলা আবরারের বান্ধবী নাকি? হাতে আবার শর্টহ্যান্ড নোটবুকও দেখা যাচ্ছে। মনে পড়ে গেল মিস শিলা অবসরে টাইপিং বা বুক কিপিং-এর কাজ করে বাড়তি দু’পয়সা কামায়। তার মানে ওকে এখানে নিয়ে আসার কোনও উদ্দেশ্য আছে আবরারের! বেশ তো, আররার যদি মহিলাকে চিঠি লেখার ডিকটেশন দেয় তাহলে চিঠির বিষয় শুনে আবরারের সম্পর্কে সে আরও বিস্তারিত জানতে পারবে।
ওরা ঘরে ঢোকামাত্র বেড়ালটা বাড়ির চারপাশ চক্কর দিতে শুরু করল। প্রতিটি জানালায় গিয়ে কান পাতল ওদের কথা শোনার আশার। কিন্তু শোনা যাচ্ছে না।
ভেতরে ঢোকারও উপায় নেই! জানালা বন্ধ। দোতলার জানালা খোলা থাকলেও অত উঁচুতে লাফ দিয়ে ওঠা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে দৌড়ে পেছনের দরজায় গেল। ওটা রান্নাঘরের দরজা। কান পাতল। কিন্তু দরজার পাল্লা এত ভারী যে ভেতরের লোকজনের কথা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না!
আরেকবার বাড়িটা চক্কর দিল বেড়ালটা। রীতিমত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সে আবরার মিস রহমানকে কী ডিকটেশন দেয় জানার জন্যে। হঠাৎ গাছটা চোখে পড়ল তার। আগে দেখেনি। এলম বৃক্ষ। গাছটার মগডাল গিয়ে ঠেকেছে দোতলার খোলা জানালার কাছে। বেড়াল চট করে উঠে পড়ল গাছে। ডাল বেয়ে সাবধানে এগোল জানালার দিকে। তারপর লাফ দিল
এটা বেডরুম। তবে আবরার ব্যবহার করে বলে মনে হলো না। সে জানালার দিকে তাকাল। জানালার কাছে নুয়ে পড়া ডালটার চারফুট ওপরে উঠে গেছে সে লাফ দিয়ে নামবার সময় ঝাঁকি খেয়ে। এখন আর ও রাস্তা দিয়ে বেরুনোর উপায় নেই। বেরুতে হলে নীচে যেতে হবে। আবরার নিশ্চয়ই নীচতলার জানালা চব্বিশ ঘণ্টা বন্ধ রাখে না।
বেড়াল একছুটে হলঘর পেরিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল নীচে। তারপর নিঃশব্দ পায়ে হলওয়ে ধরে এগোল। এটা সদর দরজা হয়ে মিশেছে রান্নাঘরে। প্যাসেজে মোড় ঘোরার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে চুরি করে শোনার উপযুক্ত জায়গা এটা।
