‘কথাটা মনে থাকে যেন। নগদ চাই আমি।
মনে থাকবে। ধন্যবাদ, ক্যাপ। আসছি আমি।’
দেয়ালের হুক থেকে কোট আর হ্যাটটা নিতে নিতে বিলি বেড়ালকে বলল, ‘শোন, আমি একটু বেরুচ্ছি। চলে আসব এক্ষুণি। তুই ততক্ষণ থাকতে পারিস। বৃষ্টি কমলে চলে যাস। বলতে লজ্জা নেই তোকে রাখার মত সামর্থ্য আমার নেই। যখন রাখার ক্ষমতা হবে তোর মত বেড়াল আমি পুষব। এখন গেলাম রেঁ।’
বিলি র্যামনের বকবকানিতে কোনও ভাবান্তর ঘটল না বেড়ালের চেহারায়। বিলি র্যামন দরজা বন্ধ করে চলে যাবার পর সে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে চারপাশ দেখতে লাগল। ঘরে খানদুয়েক টেলিভিশন, চেসিস, নানা বাজে পার্টস ছাড়া কিছু নেই। রদ্দি মাল দেখে যেন হতাশই হলো বেড়াল। মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
একটু পরেই মাল নিয়ে চলে এল বিলি র্যামন। এসে দেখে বেড়ালটা একটা খোলাপাতার দিকে মনোযোগ নিয়ে তাকিয়ে আছে। ওটা ইলেক্ট্রনিক সার্কিট বিষয়ক বইয়ের ছেঁড়া পাতা।
‘কীরে, ইলেক্ট্রনিক্সের ওপর খুব আগ্রহ দেখছি তোর।’ বেড়ালটার দিকে তাকিয়ে হাসল বিলি র্যামন, তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়ল ডলফ মার্শের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে।
কাজ করতে করতে বেড়ালটার সাথে আপন মনে কথা বলতে লাগল বিলি র্যামন। সবই তার ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে গল্প।
বেড়ালটা ভাল শ্রোতা। মনোযোগ দিয়ে বিলি র্যামনের দুঃখের পাঁচালি শুনে গেল। এদিকে বিলি র্যামনের কাজ শেষ। সে সেট রেখে উঠে দাঁড়াল।
বৃষ্টি থেমে গেছে। বেড়ালটা একবার ‘মিউ’ করে ডেকে ছুট দিল দরজার দিকে। বেড়ালটাকে ভালই লেগেছে বিলি র্যামনের। ওটাকে বিদায় দিতে খারাপ লাগছে এখন। সে দরজা খুলতে খুলতে বলল, ‘যখন মন চায় চলে আসবি। দরজা বন্ধ থাকলেও জানালা খোলা থাকবে। খিদে পেলেই চলে আসবি। একসাথে লাঞ্চ করব, কেমন?’
বেড়াল কিছু না বলে বেরিয়ে গেল, এক ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল রাস্তার ওপারে।
হয়তো কারও পোষা বেড়াল, ভাবল বিলি র্যামন। বাড়িতেই গেছে। ক্ষমতায় কুলোলে সে-ও একদিন অমন একটা নাদুস-নুদুস বেড়াল পুখবে।
কিন্তু বিলি র্যামন কোনদিনই জানবে না অল্পের জন্য অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে সে বেড়ালরূপী যমের তাকে হোস্ট হিসেবে পছন্দ হয়নি বলে ওটা তাকে ছেড়ে চলে গেছে।
বারো
বার্টলসভিলে পরপর দুটো আত্মহত্যার ঘটনার মধ্যে রীতিমত রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন ড. আবরার। সারাটা সকাল তাঁর গেছে এ ঘটনা দুটোর ওপর নোট তৈরি করতে। কিন্তু তিনি চান গল্পের আকারে স্টেটমেন্ট লিখতে। তিনি ডিকটেশন দেবেন, অন্য কেউ লিখে দেবে। সমস্যা হলো এ শহরে তাঁর পরিচিত এমন কোনও টাইপিস্ট নেই যে নির্ভুল ইংরেজিতে তাঁর ডিকটেশন লিখে নিতে পারে।
হঠাৎ এড হোলিসের কথা মনে পড়ে গেল প্রফেসরের। বার্টলসভিলের একমাত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ক্ল্যারিয়ন’-এর সম্পাদক। আবরারের পুরানো বন্ধু। সাথে সাথে এড হোলিসের অফিসে চলে গেলেন আবরার। শর্টহ্যান্ড জানা একজন দক্ষ টাইপিস্টের কথা তাঁকে বলতে এড মিস শিলা রহমানের- কথা বললেন। জানালেন মিস শিলা এখানকার হাইস্কুলে ইংরেজি পড়ায়, টাইপ তার পার্ট টাইম জব। সে শর্টহ্যান্ড এবং টাইপিং-এ খুবই দক্ষ। আর ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী বলে তার ভাষাও চমৎকার। শিলার বাবা আমেরিকান, মা বাঙালি। রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন দুজনেই। সে একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকে। তার কোনও বয়ফ্রেন্ড নেই। গড়গড় করে তথ্যগুলো দিলেন এড। ছোট্ট এ শহরে একটি বাঙালি মেয়ে একা জীবন-যুদ্ধে টিকে আছে শুনে আবেগে আপ্লুত হলেন আবরার।
‘ঠিক এরকম একজনকে দরকার আমার।’ বললেন প্রফেসর। ‘কোথায় পাব তাকে?’
এড বললেন, ‘আচ্ছা, দেখছি।’
টেলিফোন ডাইরেক্টরি ঘেঁটে একটা নাম্বার বের করলেন তিনি। তারপর ওই নাম্বারে ফোন করলেন। ‘মিস রহমান? আমি এড হোরিস। শুনুন, আমার এক বন্ধুর কয়েকদিনের জন্যে আপনাকে দরকার। টাইপ আর শর্টহ্যান্ডের কাজ। পারবেন?… বেশ। এক সেকেন্ড ধরুন।’
মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে এড ফিরলেন বন্ধুর দিকে। ‘মিস রহমান বলছেন, যখন খুশি তুমি তাঁকে পেতে পার। ইচ্ছে করলে আজই কথা বলতে পার। একটার দিকে যেতে পারবে? ঠিকানা আমি বলে দেব।’
‘তা হলে তো ভালই।’
এড হোরিস আবার ফোনে কথা বলতে লাগলেন, ‘ঠিক আছে, মিস রহমান। আমার বন্ধু একটার দিকে আপনার সাথে দেখা করবে।… ওকে, বাই।’
ফোন নামিয়ে রাখলেন এড। প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘ভদ্রমহিলা তাঁর রেট তোমাকে মনে করিয়ে দিতে বলেছেন। দিনে দশ ডলার। অথবা ঘণ্টা প্রতি দেড় ডলার।
‘অসুবিধে নেই। এখন ঠিকানাটা বলো। আমি একটার মধ্যে পৌঁছে যাব তোমার মিস রহমানের কাছে।’
কাঁটায় কাঁটায় একটায় মিস শিলা রহমানের বাসায় এলেন আবরার। শিলা অপেক্ষা করছিল তার জন্যে। দরজা খুলেই বলল, ‘ড. আবরার?’
মাথা ঝাঁকালেন আবরার।
‘ভেতরে আসুন, প্লীজ,’ আহ্বান জানাল শিলা। মিস শিলা রহমানের বয়স ত্রিশের কোঠায়। আবরারের চেয়ে লম্বা সে, পাঁচ ফুট ছয়, হালকা- পাতলা গড়ন, চোখে স্টিলরিমের চশমা, পরনে পরিচ্ছন্ন ধূসর রঙের পোশাক। চুলের রঙ বাদামী, এক বেণীতে বাঁধা। ঘাড়ের পেছনে ঝুলছে।
এখন মাথায় একটা হ্যাট আর হাতে একটা ছাতা ধরিয়ে দিলেই স্টুয়ার্ট পামারের মহিলা গোয়েন্দা চরিত্র হয়ে উঠত শিলা রহমান।
