ফার্ম হাউজে পৌছে দেখল দোতলার দুটো কাঁচের জানালায় আলো জ্বলছে। জানালার পাশে একটা গাছ। বেড়ালটা গাছে উঠল। তারপর উঁকি দিল জানালায়।
ঘরে, খাটের উপর একটা বাচ্চা শুয়ে আছে, কাশছে বেদম। বাথরোব পরা, স্লিপার পায়ে এক মহিলা করুণ মুখ করে ঝুঁকে আছে বাচ্চাটার ওপর। আর পাজামা পরা মোটা এক লোক দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়। জানালা বন্ধ থাকলেও বেড়াল ওদের কথা পরিষ্কার শুনতে পেল। লোকটা মহিলার কাছে জানতে চাইছে ডাক্তারকে ফোন করবে কিনা।
দৃশ্যটা ভিনগ্রহের প্রাণীর মনে কোনও কৌতূহলের সৃষ্টি করল না। তবে সে সন্তুষ্ট হয়েছে বেড়ালের গুপ্তচর বৃত্তিতে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সে বেড়ালকেই হোস্ট বানাবে। আপাতত এটার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাক।
রেহাই মিলল সহজেই। এ খামার বাড়িতে ভয়ানক হিংস্র স্বভাবের একটা কুকুর বাঁধা ছিল শিকল দিয়ে। সে সম্মোহিত বেড়ালটাকে গাছ থেকে নামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল গোলাবাড়ির কোণার দিকে, ওখানেই বাঁধা কুকুরটা, বেড়ালটাকে দেখেই দাঁতমুখ খিঁচিয়ে গর্জন ছাড়তে লাগল কুকুরটা। গোলাবাড়ির জানালায় এসে দাঁড়াল বেড়াল, ঘন অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিল। তারপর লাফ দিল কুকুরটার হাঁ করা ধারাল চোয়াল লক্ষ্য করে।
আট
ভিনগ্রহের হন্তারক কোলদের গোলাবাড়ির সিঁড়ির নীচে, নিজের শরীরের মধ্যে আবার ফিরে এল। সতর্ক হয়ে লক্ষ করল বাড়িতে কোহল আর তার স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ আছে কিনা। কুকুর থাকলে ঘেউ ঘেউ করে উঠে ওদের জাগিয়ে দিতে পারে। নাহ্, কুকুর নেই, শুধু নীচের ঘরে, সম্ভবত লিভিংরুমে খাঁচায় পোরা একটা ক্যানারি পাখি আছে। ওই ঘরে তার হোস্টের যাবার প্রয়োজন হবে না।
দোতলার বেডরুমে হেলমুট এবং নিকল কোহল ইতোমধ্যে নাক ডাকার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে।
হেলমুটের মনের ভেতর ঢুকে গেল ভিনগ্রহের প্রাণী। এক লহমায় জেনে ফেলল অনেক কিছুই।
হেলমুট ক্লাস সিক্স পাস, বাইরের জগৎ সম্পর্কে তার জ্ঞান খুবই কম। তবে দুটো জিনিস জেনে উপকার হলো ওটার। জানল, হেলমুটের স্ত্রী’র ঘুম অত্যন্ত গাঢ়, কানের পাশে বোমা ফাটলেও সে ঘুম থেকে জাগবে না। আর আসল ব্যাপার হলো-ভিনগ্রহের প্রাণী এতক্ষণ যা খুঁজছিল তা পেয়ে গেছে। ওদের বাড়ির ফ্রিজে অনেক খাবার আছে। বিশেষ করে সুপ আর গরুর ঝোলের কথা জেনে খিদেটা চাগিয়ে উঠল। ওর পুষ্টির অভাব ঘোঁচাতে পারবে দুটো জিনিসই। এই দম্পতি ওখানে না থাকলে হয়তো তাকে ফ্রিজ খুলে মাংস রেঁধে ঝোল খেতে হত। তবে সেটা কতটুকু পুষ্টিকর হত সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে ভিনগ্রহের খুনীর।
তার নির্দেশে বিছানা ছেড়ে নিঃশব্দে উঠে পড়ল হেলমুট। পা টিপে টিপে এগিয়ে চলল বেডরুমের দরজার দিকে। সাবধানে খুলল, তারপর সতর্কতার সাথে ভিজিয়ে দিল। এরপর এগোল কিচেনের দিকে।
ফ্রিজ খুলে সুপের জার আর মাংসের বাটি বের করল হেলমুট, দুটো একসাথে ঢালল একটা প্যানে, ভিনগ্রহের প্রাণীটা পেটপুরে যতটুকু খেতে পারে ততটুকু। দুটো তরল পদার্থ এক সাথে মিশিয়ে সে গ্যাসের স্টোভ জ্বালল। অল্প আঁচে গরম করল সুপ আর ঝোলের মিশ্রণটা। তারপর প্যান নিয়ে চলে এল বাইরে, গোলাবাড়ির সিঁড়ির সামনে। ঘন ঝোলের প্যান সিঁড়ির নীচে রেখে কচ্ছপের খোলটাকে বের করে আনল, ছেড়ে দিল তরলটার মধ্যে। তারপর দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ।
ঝোল খেতে খেতে ভিনগ্রহের প্রাণী হেলমুটের মনের আরও গভীরে ঢুকে তার সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য বের করে আনতে লাগল।
হেলমুটের বয়স পঁয়ষট্টি। সে একাচোরা স্বভাবের মানুষ। তার কোনও বন্ধু নেই। সে কাউকে পছন্দ করে না। অন্যরাও তাকে পছন্দ করে না। এমনকী তাঁর স্ত্রীও নয়। একে অন্যের প্রতি কারও বিন্দুমাত্র টান নেই। তারপরও দু’জনে একই ছাদের নীচে আছে স্রেফ ভিন্ন কারণে। নিকোল কোহলের যাবার কোন জায়গা নেই, নিজের রোজগার করার সামর্থ্যও নেই। আর হেলমুটের তাকে দরকার সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটি কাজ করে দেয়ার জন্যে।
তাদের দুই ছেলেমেয়ে। তবে কেউই তাদের সাথে থাকে না, হেলমুটের অত্যাচারে তারা বাড়ি ছেড়েছে অনেক আগেই। তারা শহরে থাকে। মাঝে মাঝে মাকে চিঠি লিখত। কিন্তু হেলমুট স্ত্রীকে কঠোরভাবে নিষেধ করে নিয়েছে চিঠির জবাব দিতে। তারপর থেকে দু’পক্ষের কারও সঙ্গেই কোনও যোগাযোগ নেই। নিকল কোল জানেও না তার ছেলেমেয়েরা এখন কোথায় আছে, কেমন আছে।
হেলমুট বাতের রোগী। দিন দিন রোগটা বেড়েই চলেছে। কিন্তু সে ডাক্তার দেখাবে না। কারণ ডাক্তারের ওপর তার বিশ্বাস নেই। কারও সঙ্গেই সে মেশে না। তার বাড়িতে ফোন নেই, সে কাউকে চিঠি লেখে না, কোনও ব্যক্তিগত চিঠিও আসে না তার নামে। বার্টলসভিলে হেলমুট যায় ঘোড়ায় টানা গাড়িতে শুধু শনিবার মুদি সদায় কিনতে। গাড়ি কেনেনি সে প্রয়োজন নেই বলে। দোকানে গেলেও কারও সাথে ‘হাই, হ্যালো’ বলার প্রয়োজন বোধ করে না হেলমুট, স্রেফ মাল কিনে চলে আসে। গত পনেরো বছরে নিজের খামার বাড়িতে থেকে বার্টলসভিলের বাইরে একপাও যায়নি সে। একেবারে নিঃসঙ্গচারী, অসামাজিক মানুষ বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই হেলমুট।
হেলমুটের মনের ভেতর ডুব দিয়ে কোনও লাভ হলো না ভিনগ্রহের হন্তারকের। এর কাছ থেকে কাজে লাগে, এমন কিছুই জানা গেল না। তথ্য সংগ্রহের জন্যে বরং বেড়ালের ওপর ভরসা করা চলে। কিন্তু হেলমুটের ওপর যতক্ষণ সে ভর করে আছে, ততক্ষণ অন্য কোনও প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করতে পারছে না সে। কাজেই ওকে পথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তার আগে দরকার ঝোলের বাটি থেকে উঠে পড়া এবং আগের আস্তানায় গর্ত খুঁড়ে লুকানো। কারণ ঝোল মেখে তার গায়ে গন্ধ হয়ে গেছে। কোনও প্রাণী গন্ধ শুঁকে অতি উৎসাহী হয়ে সিঁড়ির নীচে উঁকি মারলেই তাকে দেখতে পাবে। তখন তার বারোটা বেজে যাবে।
