ছোট ছোট প্রাণীও পরীক্ষা করে দেখেছে সে। যেমন সাগ। তবে হোস্ট হিসেবে সাপ পছন্দ হয়নি তার। এগুলোর গতি ধীর-আর মরতেও সময় নেয় বেশি। দেখা গেল রাস্তায় উঠেছে মরতে, গাড়ির জন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটাতে চাপা পড়ে গেলেও সাপ যে সত্যি সত্যি মারা যাবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? পিঠ ভেঙে যাবার পরেও অনেকক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে সাপ।
কাজেই সে চুপচাপ বসে আছে। কাকে হোস্ট বানানো যায় তাই ভাবছে। এমন সময় তার খিদে পেল। ভিনগ্রহের এই প্রাণীটির খিদেও পায়। তারও পুষ্টির প্রয়োজন। সে যে গ্রহ থেকে এসেছে, ওখানকার অধিবাসীদের জন্ম মূলত পানি থেকে। পানি থেকে সরাসরি মাইক্রোঅর্গানিজম শুষে নিয়েছে নিজেদের মধ্যে। প্রটেকশন বা নিরাপত্তার জন্যে তারা শরীরের ওপর কচ্ছপের খোলের মত খোলস পেয়েছে। অন্যদের হোস্ট বানানো বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তারা পেয়েছে অনেক পরে, নিজেদের বুদ্ধিমত্তার সমৃদ্ধি ঘটার সঙ্গে। তারপর তারা পানি ছেড়ে ডাঙায় উঠে এসেছে। ডাঙায় যে সব প্রাণী ঘুমাচ্ছিল, তাদের ওপর তারা সওয়ার হয়েছে। ডাঙার প্রাণীদের মেরে তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার শুরু করে কয়েকশো কোটি বছর আগে, তাদের গ্রহে। মানুষের চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান এবং শক্তিশালী হলেও এদের পুষ্টি প্রয়োজন হয় মানুষের মতই। তবে মোটামুটি একবার খাওয়ার পর কয়েকমাস না খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারে তারা। পানির বাসিন্দা বলে তরল খাদ্যই এদের প্রিয়। আর খিদে পেলে, খাবার না জুটলে এরা দুর্বল হয়ে পড়ে। যেমন, ভিনগ্রহের হন্তারকের এখন খুব খিদে পেয়েছে। কীভাবে খাবার জোগাড় করা যায় তাই ভাবছে। সুপ বা দুধ পেলেই তার চলে যাবে। কিন্তু খাবারটা জোগাড় করে দেবে কে? এ ক্ষেত্রে মানুষ হোস্টকেই তার পছন্দ হলো। আর তার আশপাশে এরকম হোস্ট আছে এক বৃদ্ধ জার্মান দম্পতি হেলমুট এবং নিকোল কোহল। ওরা কাছের এক ফার্ম হাউজে থাকে। ওদের কাউকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেলেই হলো। খাবার সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু আগে তো খামার বাড়িতে তাকে পৌঁছতে হবে।
ভিনগ্রহের প্রাণী খামার বাড়িতে যাবার জন্য বেছে নিল এক ঘুমন্ত পেঁচাকে। ওটাকে উড়িয়ে নিয়ে এল কোহলদের খামার বাড়ির ওপর।
পেঁচাটা ভিনগ্রহের হন্তারক অর্থাৎ কচ্ছপের খোলাটাকে নখে বাধিয়ে নিয়ে এসেছে। সে বাড়ি ঘিরে একবার চক্কর দিল। ফার্ম হাউজটা অন্ধকার, নীরব। সম্ভবত কুকুর-টুকুর নেই। ভিনগ্রহের অপরাধীর ইচ্ছে এ বাড়ির কোথাও লুকিয়ে থাকবে। লুকোবার চমৎকার জায়গাও পাওয়া গেল-কাঠের সিঁড়ির নীচে, যেটা মিশেছে ব্যাকডোরের সাথে। পাশেই খড়ের গাদা। এখানে আসার কারণ একটাই—এখন থেকে মানুষকে হোস্ট বানানো সহজ হবে তার জন্যে। তা ছাড়া খড়ের গাদার আশপাশে কী ধরনের প্রাণীর বাস তাও দেখা যাবে। প্রয়োজনে গৃহপালিত কোনও প্রাণীর ওপর সওয়ার হবে সে।
পেঁচাটা সিঁড়ির নীচে ভিনগ্রহের প্রাণীটাকে লুকিয়ে ফেলল। এখন আর ওকে প্রয়োজন নেই। পেঁচাটাকে ডাইভ দেওয়াল সে বাড়ির শক্ত দেয়াল লক্ষ্য করে। তবে ভুল হয়ে গেল। পেঁচাটা ডাইভ দেয়ার সময় চোখ বুজে ছিল। তাই দেয়ালে না লেগে আছড়ে পড়ল জানালার ওপর। ভেঙে গেল জানালার কাঁচ। ঝনঝন শব্দে জেগে উঠল কোল দম্পতি। তাড়াতাড়ি নেমে এল বাইরে। একটা পেঁচা মাটিতে পড়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে দেখে অবাক হয়ে গেল ওরা। বুড়ো হেলমুট বন্দুকের এক গুলিতে পেঁচাটাকে যন্ত্রণার হাত থেকে চিরতরে রেহাই দিয়ে দিল। বলল, ‘বেচারা বোধ হয় অন্ধ। দেখতে পায়নি। তাই ওড়ার সময় জানালায় ধাক্কা খেয়েছে।’
‘এটাকে নিয়ে কী করবে এখন?’ জানতে চাইল বুড়ি। ‘এভাবে ফেলে রাখবে?’
‘কাল সকালে কবর দেব,’ গরগর করল হেলমুট। ‘ব্যাটার জন্য কাল আবার আমাকে শহরে যেতে হবে গ্লাস কিনতে।
‘কাল যেতে হবে না,’ বলল তার স্ত্রী। শনিবার গেলেই চলবে। আমি ফাঁকা জায়গায় কাপড় টাঙিয়ে দেব। এখন চলো শোবে।’
বুড়ো-বুড়ি ঢুকে পড়ল নিজেদের বেডরুমে। খানিকপর আগের মত আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল গোটা বাড়ি। ভিনগ্রহের প্রাণী দেখল বুড়ো-বুড়ি এখনও ঘুমায়নি। সে অপেক্ষা করতে লাগল ওরা কখন ঘুমিয়ে পড়বে। এই ফাঁকে সে খামার বাড়ির গৃহপালিত প্রাণীগুলোর ওপর নজর বোলাতে লাগল। জানতে চায় হোস্ট হিসেবে কোনটাকে ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যাবে।
এই বাড়িতে শুয়োর আছে একটা, একটা ঘোড়া, তিনটে গরু, কতগুলো ইঁদুর আর একটা বেড়াল। শুয়োর আর ইঁদুরগুলোকে প্রথমেই বাতিল করে দিল সে ওরা কোনও কাজে লাগবে না ভেবে। গরু বরং ওদের চেয়ে ভাল। গায়ে শক্তিও আছে বেশ। ধারাল শিং নিয়ে গরুগুলো যখন তখন কিলিং- মেশিনে পরিণত হতে পারে। ঘোড়াও তাই। গরুর চেয়েও এরা কাজের। দ্রুত দৌড়াতে পারে, সহজে টপকে যেতে পারে ছোটখাট বেড়া। আর ওদের খুরের লাথি শিং-এর গুঁতোর চেয়েও ভয়ঙ্কর।
সবশেষে রইল বেড়াল। এ প্রাণীটাকেই ভিনগ্রহের খুনের পছন্দ হয়ে গেল সবচে’ বেশি। রনির ধার করা স্মৃতি থেকে সে জানে চার পেয়ে এই প্রাণীটা বেশ বুদ্ধিমান, রাতের আঁধারে এদের চোখ জ্বলে। এরা গুপ্তচর বৃত্তিতে খুবই পটু, তা ছাড়া বেশিরভাগ সময় ওরা ঘুমিয়ে কাটায় বলে এদের হোস্ট বানানো ভারী সোজা। স্রেফ পরীক্ষা করার জন্য সে একটা ঘুমন্ত বেড়ালের ওপর সওয়ার হলো। জেগে উঠল বেড়াল। সম্মোহিত অবস্থায় হাঁটা দিল। নাহ্, আঁধারে সত্যি চোখ জ্বলে এই প্রাণীটার। সব কিছু দিনের মত দেখতে পাচ্ছে। সে বেড়ালটাকে বাড়ির চারপাশে কয়েকবার চক্কর দেওয়াল। নিঃশব্দে, সামান্য শব্দও না করে বেড়ালটার এই পরিভ্রমণ চমৎকৃত করে তুলল ভিনগ্রহের হন্তারককে। বেড়াল কেমন গাছ বাইতে পারে দেখার জন্য খড়ের গাদার পেছনে একটা গাছে ওটাকে তুলল সে। সরসর করে গাছের মাথায় উঠে গেল বেড়াল। মগডাল থেকে উঁকি দিল। আরেকটা খামার বাড়ি চোখে পড়ল, মুখ ফিরিয়ে আছে শহরের দিকে। এখন দেখা যাক বেড়াল কেমন গুপ্তচরের কাজ করতে পারে। গাছ থেকে বেড়ালটাকে নামাল সে, মাঠ ধরে ছোটাল পাশের খামার বাড়ির দিকে। রাতের আঁধারে ছায়ার মত ছুটে চলল বেড়াল।
