হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিলেন ডক্টর গ্রীনবে-র গবেষণাগারে কুকুরটার লাশ পাঠাবেন পরীক্ষার জন্যে তা হলে জানা যাবে টাইগারের র্যাবিস ছিল কি না। গ্রীনবে এখান থেকে পঁয়তাল্লিশ মাইল দূরে। আর এখন বাজে মাত্র তিনটা। তিনি গ্রীনবের হাসপাতালে টাইগারের লাশ পরীক্ষার জন্যে রেখে আসার প্রচুর সময় পাচ্ছেন হাতে। সন্ধ্যেটা ভাল কোনও রেস্টুরেন্টে ডিনার খেয়ে, তারপর ছবি দেখে সকাল সকাল ফিরে আসা যাবে বাড়িতে।
তাই করলেন আবরার। গ্রীনবের হাসপাতালে গেলেন টাইগারের লাশ নিয়ে। ডিনার খেলেন, ব্রিজিত বার্দোর একটি সিনেমা দেখলেন, তারপর সাড়ে দশটা নাগাদ, উইলকক্সে, তাঁর বন্ধুর হেস্টিংস-এর খামার বাড়িতে ফিরে এলেন।
বাড়িটি বেশ বড়, ওপর তলায় তিনটি বেডরুম, যদিও দুটো রুম শুধু ফার্নিশড করা। একটা বাথ। নীচতলায়ও তিনটে ঘর, বড় একটা কিচেন, লিভিং রুমটাও বেশ বড়সড়, আর বাড়তি একটা কামরা আছে, স্টোররুম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ঘরে আবরার তাঁর বন্দুক এবং মাছ ধরার সরঞ্জাম রেখে দিয়েছেন। বেজমেন্টে ছোট গ্যাসোলিন ইঞ্জিনচালিত জেনারেটর আছে, বিরতিহীন বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলেছে। একই ইঞ্জিনের সাহায্যে পাম্প করে ছাদের ট্যাঙ্কিতে পানি তোলার ব্যবস্থা আছে। এ বাড়িতে ফোন নেই, তবে প্রফেসরের তাতে কোনও অসুবিধেও নেই। বরং তিনি খুশি ফোন নামের মূর্তিমান যন্ত্রণাটার হাত থেকে রেহাই পেয়ে। এ বাড়ির দক্ষিণ দিকে একসময় খামার ছিল, কোনও কারণে ওটা এখন পরিত্যক্ত। বাড়ির চারপাশে উঠোন, মিশেছে ঝোপঝাড় আর জঙ্গলের সাথে, জায়গাটাকে রহস্যময় এবং বুনো করে তুলেছে। উত্তর দিকে শুধু একটা রাস্তা, শহরের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। তবে ওদিকেও ঘন জঙ্গল।
সবমিলে জায়গাটা ডক্টরের এতদিন ভালই লাগছিল, শুধু আজকের রাতটা ছাড়া।
আবরার ফ্রিজ খুলে বিয়ারের ক্যান বের করে একটা রহস্য উপন্যাস নিয়ে বসলেন। কিন্তু পড়ায় মন দিতে পারলেন না। কেন জানি অস্বস্তি লাগছে তাঁর। এখানে আসার পর এই প্রথম খুব একা এবং নিঃসঙ্গ লাগছে। জানালার পর্দা নামিয়ে দেয়ার একটা দুরন্ত ইচ্ছে অনেক কষ্টে দমিয়ে রাখলেন তিনি। কারণ তাঁর মনে হচ্ছিল কেউ বুঝি তাঁকে বাইরে থেকে লক্ষ করছে। কিন্তু জানালায় দাঁড়িয়ে কে তাঁকে লক্ষ করবে? কোনও জানোয়ার? জানোয়ার হলেই বা কি এসে যায়? কেউ তাঁকে দেখছে, ভাবনাটা নিজের কাছেই এক সময় হাস্যকর ঠেকল। তিনি জোর করে পড়ায় মন দিলেন খানিক পর খেয়াল করলেন বইয়ের পাতায় চোখ বোলাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু একটা লাইনও পড়ছেন না। বারবার রনি আর কুকুরটার কথা মনে পড়ছে। শেষে নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে উঠলেন আবরার। কাল তো টাইগারের রিপোর্ট পাওয়াই যাবে। যদি দেখেন কুকুরটার সত্যি সত্যি র্যাবিস হয়েছিল, তা হলে ব্যাপারটা চুকে গেল। এ নিয়ে আর ভাববেন না। ছুটি কাটাতে এসেছেন। মজা করে ছুটি কাটিয়ে চলে যাবেন…কিন্তু টাইগারের যদি র্যাবিস ধরা না পড়ে…
আরও এক ক্যান বিয়ার গলায় ঢাললেন প্রফেসর, একসময় ঝিমুনি ভাব এল। বিছানায় গেলেন তিনি। খানিক পর ঘুমিয়েও পড়লেন।
সাত
ভিনগ্রহের হন্তারক এখনও সেই ফাঁপা কাঠের গুঁড়ির মধ্যেই ঘাপটি মেরে আছে। টাইগার তাকে এখানে রেখে যাবার পর থেকে সে আস্তানা ছেড়ে একপাও নড়েনি। শুধু একবারের জন্যে একটা কাকের ওপর ভর করেছিল। আশপাশের এলাকা দেখার ইচ্ছে জেগেছিল তার। রাতের বেলা ঘুমন্ত এক কাকের ওপর সওয়ার হয় সে। কিন্তু কাক রাতে ভাল দেখতে পায় না বলে ওই সময় আর বেরোয়নি সে। বেরিয়েছে সকালে। কাকের চোখ দিয়ে আশপাশের অনেকটা এলাকা মোটামুটি জরিপ করে এসেছে। দেখেছে কোন্ ধরনের লোকজনের বাস এখানে। রাস্তার একেবারে শেষ মাথায় উড়ে গিয়েছিল কাক। ওখানে একটা স্টেশন ওয়াগন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সে। বার্টলসভিলের ওপরে চক্কর দিয়েছে বারকয়েক। তাকে সবচে’ আকর্ষণ করেছে রেডিও-টিভি মেরামতের একটি দোকান। এ দোকান যে লোক চালায় তার নিশ্চয়ই ইলেক্ট্রনিক্স সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান আছে। কাজেই এ লোক তার ভাল হোস্ট হতে পারবে। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও। কিন্তু রনির স্মৃতি যেটুকু ধারণ করে আছে সে, তাতে রিপেয়ারম্যানের নাম পরিচয় নেই তার। এসব জানতে হলে আরও ব্যাপক অনুসন্ধানের প্রয়োজন।
বার্টলসভিল পরিক্রমা মোটামুটি শেষ হলে সে কাকটাকে পেভমেন্টের ওপর ডাইভ দিতে বাধ্য করে তাকে হত্যা করেছে। কাকের কাজ শেষ। কাজেই ওটাকে আর জঙ্গলে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার প্রয়োজন বোধ করেনি সে। কাকের মৃত্যুর সাথে সাথে ভিনগ্রহের হন্তারক ফিরে গেছে নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে।
এই আশ্রয়স্থলটি আগেরটার চেয়ে ভাল জঙ্গলের একেবারে গভীরে বলে নানা পশুপাখি চেনার সুযোগ তার হয়েছে। প্রাণীগুলো প্রায়ই তার আস্তানার সামনে দিয়ে হাঁটা চলা করছে। হরিণ, ভালুক, ভোঁদর আরও কত কী। কত রকম পাখিও দেখেছে সে। এর মধ্যে দুটো পাখি পছন্দ হয়েছে তার হোস্ট হিসেবে-পেঁচা এবং চিকেন হক। এসব প্রাণীর যে কোনওটার ওপর যে কোনও সময় সে ভর করতে পারে। দশ মাইলের মধ্যে এগুলোর একটাকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেলেই হলো।
