টাইগারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভিনগ্রহের হন্তারক, আশ্রয় নিল নিজের খোলের মধ্যে। ভেবে আমোদিত হলো এবার সে আর কোন ভুল করেনি
হ্যাঁ, ভুল তার হত না, যদি গাড়িটার আরোহী ড. সি. আর. আবরার না হয়ে অন্য কেউ হত। তার আসলে অপেক্ষা করা উচিত ছিল অন্য গাড়ির জন্য। কারণ, ভিনগ্রহের হন্তারকের জানা নেই টাইগারকে ড. সি. আর. আবরারের গাড়ির নীচে ফেলে দিয়ে আসলে সে’ নিজের নিয়তিকেই ডেকে এনেছে।
ছয়
ড. সি. আর. আবরার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অভ টেকনোলজি’র পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালরে পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। পিএইচডি করতে আমেরিকায় আসার পরে আর দেশে ফিরে যাননি। ডক্টরেট নেয়ার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে গেছেন। সম্ভব মেধাবী, পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষটিকে বেঁটেই বলা যায়- টেনেটুনে পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি হবেন। তাঁর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল রাতের মত কালো, মাঝেমধ্যে ঝিলিক দেয় দু’একটি রুপোলি কেশ। চিরকুমার এই ভদ্রলোকের চেহারার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো বুদ্ধিদীপ্ত চোখ জোড়া। কোনও কারণে রেগে গেলে বা অবাক হলে ও দুটো বাদামী হিরের মত ঝকঝক করে জ্বলতে থাকে।
এ মুহূর্তে তিনি ছুটিতে আছেন। তাঁর পরনে ঢিলেঢালা পোশাক, মুখে কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি। দেখে বোঝার উপায় নেই এ মানুষটি দেশের সবচে’ পণ্ডিত ব্যক্তিদের একজন।
টাইগার যে তাঁর গাড়ির নীচে চাপা পড়ল, এ জন্যে আবরারকে মোটেই দোষ দেয়া যায় না। কুকুরটা যেন শূন্য থেকে উদয় হয়েছিল তাঁর সামনে। তিনি ব্রেকও কষেছিলেন। কিন্তু তাঁর আগেই দফারফা হয়ে গেল টাইগারের।
পশুপ্রেমী প্রফেসরের জানোয়ারটার দশা দেখে বেশ মন খারাপ হলো। কার কুকুর এটা? প্রফেসর ঠিক করলেন শহরে নিয়ে যাবেন লাশ। খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করবেন কুকুরের মালিকের। তারপুলিন দিয়ে টাইগারের লাশ ভালভাবে জড়িয়ে নিয়ে গাড়িতে আবার স্টার্ট দিলেন আবরার।
বার্টলসভিলে পৌঁছে দু’এক জায়গায় খোঁজ নেয়ার পর জানা গেল এটা জন বেরেটের কুকুর। তবে জন বাড়ি নেই। আদালতে গেছেন ইনকোয়েস্টে। আবরার ওখানেই রনির কথা জানতে পারলেন। শুনলেন’ জনের একমাত্র ছেলে রনি আত্মহত্যা করেছে।
আদালতে গিয়েও জনকে পাওয়া গেল না। শুনানি শেষে মরচুয়ারিতে গেছেন ছেলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে। আবরার তখন শেরিফের সাথে কথা বললেন। কুকুরটা হঠাৎ আবরারের গাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, শুনে বিস্ময় প্রকাশ করলেন শেরিফ। বললেন, ‘যদ্দূর জানি জনের কুকুরটা ছিল কারশাই জাতের। গাড়ি দেখলে এক মাইল দূর থেকে ছুটে পালাত।
‘তাই নাকি?’ অবাক হলেন আবরারও। ‘তা হলে ককুরচীর নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। নইলে ওভাবে ছুটে আসবে কেন আমার গাড়ি লক্ষ্য করে। ভাল কথা- আপনাদের এলাকায় র্যাবিস রোগের কোনও কেস আছে?’
‘বহুদিন হলো আমরা ও রোগটার কবল থেকে মুক্ত, মি. আবরার,’ নীরস গলায় জবাব দিলেন শেরিফ। একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ডক্টর, তারপর বললেন, ‘শুনলাম রনি নামে একটা ছেলে মারা গেছে। এর কি অটোপসি করা হয়েছে?’
‘অটোপসি কেন, কীসের জন্য? ও তো আত্মহত্যা করেছে।’ শুরু কুঁচকে জবাব দিলেন শেরিফ।
‘এখানে আর কোনও অদ্ভূত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, শেরিফ?’
কৌতুকের দৃষ্টিতে ডক্টরের দিকে তাকালেন শেরিফ!
‘অদ্ভূত বলতে কী বোঝাতে চাইছেন বুঝতে পারছি না। এখানে গত কয়েক বছরে কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ওগুলো এখনও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। তবে সেগুলো ছিল সেফ ডাকাতির জন্যে খুন। ওসবের মধ্যে অদ্ভুত কোনও ব্যাপার ছিল না। কিছু মনে করবেন না, মি. আবরার, আপনি কি ভার্সিটিতে অপরাধ বিজ্ঞান পড়ান?’
‘না,’ মৃদু হেসে জবাব দিলেন আবরার। ‘আমি পদার্থ বিজ্ঞান পড়াই। বিশেষ করে ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে নাড়াচাড়া করি। আমি স্যাটেলাইট প্রোগ্রামের ওপরেও কিছু কাজ করেছি।’
‘তার মানে রকেট?’ শেরিফের গলার স্বরে সম্ভ্রম ফুটল।
‘না, রকেট না। বেশিরভাগই স্যাটেলাইটের ডিটেকটর এবং ট্রান্সমিটিং সেট নিয়ে কাজকারবার। আমি প্যাডলহুইল স্যাটেলাইটের ডিজাইনও করে থাকি। তবে এ মুহূর্তে মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত।’
‘বেশ, বেশ! কোথায় উঠেছেন আপনি?’
‘এখান থেকে মাইল দশেক দূরে এক খামার বাড়িতে। জায়গাটার নাম ওল্ড বার্টন প্লেস….
‘হেস্টিংস-এর খামার বাড়ি তো? চিনেছি। হেস্টিংস-এর সাথে আগে দু’একবার মোলাকাত হয়েছে। তা একা নাকি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন?’
‘বিয়ে-থা করিনি এখনও। একা থাকতেই ভাল লাগে। যাকগে, শেরিফ। আজ উঠি। জনের কুকুরের লাশটা নিয়ে গেলাম। ওকে বলবেন আমি লাশ কবর দিয়ে দেব।’
শেরিফের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের গাড়িতে উঠলেন ড. আবরার। মনটা খচখচ করছে। রনি আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু আত্মহত্যার ব্যাপারটা মেনে নিতে চাইছে না তাঁর যুক্তিবাদী মন। মানুষ প্রাথমিক কোনও লক্ষণ ছাড়াই হঠাৎ পাগল হয়ে যেতে পারে না বা আত্মহত্যাও করে না। আর কুকুরটা নিশ্চয়ই র্যাবিস আক্রান্ত ছিল। নইলে অমন উন্মাদের মত আচরণ করবে কেন? শেরিফ বললেন ওটা গাড়ি-ঘোড়া ভয় পেত। তা হলে, আবরারের গাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কেন? ওটাও আত্মহত্যা? কিন্তু লেমিং ছাড়া অন্য কোনও পশু আত্মহত্যা করে বলে শোনেননি আবরার।
