রনির বাবা জন বললেন, ‘আমারও তাই ধারণা। আমিও ঢুকে দেখতে চাই ভেতরে কী আছে।’
‘এক মিনিট, জন,’ বাধা দিলেন র্যালফ। ‘গুহার ভেতর কী আছে আমরা কেউ জানি না। আগে টাইগারকে পাঠাই। ভিতরে কিছু থাকলে ও আমাদের সাবধান করে দেবে।’
‘ঠিক বলেছ,’ সায় দিলেন জন। টাইগারের বাঁধন খুলে দিলেন। কুকুরটা এক লাফে ঢুকে পড়ল ভেতরে।
এক মিনিট পর, টাইগারের তরফ থেকে কোনও সাবধান বাণী এল না দেখে দুই বুড়ো হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়লেন গুহায়। গুহার মাঝামাঝি জায়গায় এসে থামলেন। এখানে শুয়ে আছে টাইগার। গুহার এ জায়গাটা বেশ প্রশস্ত এবং উঁচু, দাঁড়ানো যায়। আলো কম হলেও মোটামুটি দেখতে পাচ্ছেন তাঁরা।
‘বোঝাই যায় রনি এ গুহায় ঢুকেছিল,’ বললেন র্যালফ, ‘এ পর্যন্ত এসেও ছিল। কারণ টাইগার ওর গায়ের গন্ধেই এখানে এসেছে। জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডা আর নীরব। এসো, দু’মিনিট জিরিয়ে নিই, তারপর ফিরব।’
ওরা বসে পড়লেন গুহার মেঝেতে, ভিনগ্রহের হন্তারক নজর দিল কুকুরটার ওপর। ক্লান্ত টাইগার আরাম পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওকে এবার কাজে লাগাতে হবে। তবে এখন না, একটু পরে।
‘ভাবছি, রনি এখানে এসেছিল কেন?’ নীরবতা ভেঙে বললেন জন।
‘এটা তো সহজ যুক্তি, জন। অবচেতন মনে এখানে চলে এসেছিল ও। হয়তো ছোটবেলায় এ গুহাটা আবিষ্কার করেছিল রনি, হঠাৎ কোনও কারণে লুকোতে এসে পড়েছিল। অবচেতন মনে মানুষ কত কিছুই তো করে।’
হয়তোবা। কিন্তু ওর লুকোবার দরকার পড়েছিল কেন? নাকি কোনও লুকানো জিনিস খুঁড়ে বের করতে এসেছিল রনি। কী জিনিস জানতে চেয়ো না, তবে এ গুহার নরম বালি কিন্তু হাত দিয়ে খোঁড়া যায়।’
‘কিন্তু লুকোবেটা কী সে? আর খুঁড়তেই বা যাবে কেন?’
‘জানি না আমি। তবে তেমন কিছু যদি আমাদের চোখে পড়ত-’
আর সময় নেই। লোকগুলো যেভাবে সন্দিহান হয়ে উঠেছে এখনই হয়তো মেঝে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেবে। তা হলেই সর্বনাশ। ভিনগ্রহের হন্তারক মনোযোগ দিল ঘুমন্ত টাইগারের ওপর। দুজনকে হয়তো খুন করা সম্ভব হবে না টাইগারের পক্ষে, তবে আকস্মিক হামলায় ওরা নিশ্চয়ই অপ্রস্তুত হয়ে যাবে, মেঝে খোঁড়ার কথা আর মনে থাকবে না। উল্টো দৌড়াতে হবে ডাক্তারের কাছে টাইগারের কামড়ের কারণে সৃষ্ট ক্ষতের চিকিৎসা করতে।
টাইগারের ওপর সওয়ার হলো ভিনগ্রহের প্রাণী। ঘুম থেকে জেগে উঠল জানোয়ারটা, মাথা তুলল। সেই মুহূর্তে র্যালফ বললেন, ‘এখন খোঁড়াখুঁড়িতে কাজ নেই, জন। মেঝে খুঁড়ে কিছু পাব বলেও মনে হয় না। আর পরিষ্কার কিছু দেখাও যাচ্ছে না। আমাদের না আছে ফ্লাশলাইট না কোদাল বা বেলচা! আর এখন মেঝে খুঁড়তে গেলে লাঞ্চের আগে বাড়ি ফিরতে পারব না। তারচে’ এখন বাড়ি যাই চলো। খোঁড়াখুঁড়ি যদি করতেই চাও, পরে রেডি হয়ে আসব’খন।’
বন্ধুর কথায় সায় দিলেন জন। টাইগার আবার মাথা নামিয়ে নিল। দু’বন্ধুর পেছন পেছন বেরিয়ে এল গুহা থেকে। ওদের সাথে বেশ খানিকটা পথ,এক সাথে হাঁটল, হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। পুবে, বাড়ি থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ছুটতে শুরু করল সে। জন কত ডাকাডাকি করলেন, কিন্তু কান দিল না টাইগার। আপন মনে দৌড়াতে লাগল।
মনিবের দৃষ্টির আড়াল হতেই লাফ মেরে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল টাইগার, তারপর এগোল গুহা অভিমুখে।
গুহায় ঢুকে নরম বালু খুঁড়ল টাইগার, কচ্ছপের খোলস বা ভিনগ্রহের হন্তারককে মুখে তুলে নিল। বেরিয়ে এল গুহা থেকে, খোলসটাকে সাবধানে নামিয়ে রাখল জমিনে। তারপর আবার গুহায় ঢুকল সে, একটু আগে খোঁড়া গতটাকে বুজিয়ে দিল সতর্কতার সঙ্গে। তারপর বোজানো গর্তের ওপর গড়াগড়ি খেল কয়েকবার। বোঝার উপায় রইল না এখানে কোনও গর্ত আছে। তারপর আবার কচ্ছপের খোলসটাকে মুখে তুলে নিল টাইগার। প্যাট্রিজ পাখির চেয়ে ভারি নয় ওটার শরীর, আর এত আলতোভাবে ধরে রেখেছে টাইগার যেন আহত পাখি মুখে করে নিয়ে চলেছে।
জঙ্গলে ঢুকল কুকুর, রাস্তা এমনকী গেম ট্রেইলও এড়িয়ে চলল, অত্যন্ত নির্জন জায়গা খুঁজছে। ঘন, লম্বা ঘাস, চারদিকে ঝোপের বেড়ার আড়ালে ছোট, ফাঁপা একটা কাঠের গুঁড়ি পেয়ে গেল। অন্তত কিছু সময়ের জন্যে এখানে লুকিয়ে থাকার কাজ চলবে। মুখ থেকে কচ্ছপের খোলটাকে ফাঁপা কাঠের গর্তে রাখল টাইগার, থাবা দিয়ে ধাক্কা মেরে ওটাকে ঝোপের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। কারও বোঝার সাধ্য নেই এখানে গুঁড়ি আছে।
তারপর যে পথে এসেছিল সে পথে ফিরে চলল টাইগার। একশো গজ যাবার পর বসে পড়ল। ভিনগ্রহের হন্তারক তখন ভাবছে কী করা যায়।
ভিনগ্রহের প্রাণী এখন নিরাপদেই আছে। ওই লোকগুলো এখন সমস্ত গুহা খুঁড়ে ফেললেও তার কিছু এসে যাবে না। কিন্তু কথা হলো, কুকুরটাকে সে কি আরও কিছুক্ষণের জন্যে নিজের হোস্ট করে রাখবে? ব্যাপারটা নিয়ে ভাবল সে। তারপর সিদ্ধান্তে পৌছল-জানোয়ারটা তার উদ্দেশ্য পূরণ করেছে। এখনও ওটাকে বাঁচিয়ে রাখলে সে অন্য কারও ওপর সওয়ার হতে পারবে না। এখন তার দরকার অন্য কোনও হোস্ট। হতে পারে সেটা বাজ, পেঁচা বা হরিণ। কিন্তু এগুলোকে ভালমত পর্যবেক্ষণ করার সময় সে পাবে না যতক্ষণ টাইগারের ওপর সওয়ার হয়ে থাকবে। কাজেই ওর মরে যাওয়াই ভাল।
টাইগার এবার রাস্তায় উঠে এল। দাঁড়িয়ে থাকল এক কোণে। দূর থেকে একটা গাড়ি আসছে। ড্রাইভার কিছু বুঝে ওঠার আগেই, গাড়িটা তার সামনে আসতেই, চাকা লক্ষ্য করে লাফ দিল টাইগার। সাথে সাথে পিষে ভর্তা হয়ে গেল কুকুরটা।
