র্যালফ মাথা চুলকে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আমার মনে হয় তার দরকার নেই, শেরিফ। সবার সামনে সেদিনের ঘটনা নিয়ে সাক্ষ্য দিতে বিব্রত বোধ করবে মেয়েটা। সবাই ব্যাপারটা নিয়ে এমনভাবে কথা বলছে যেন ঘটনাটার জন্যে শার্লি দায়ী। আমার মেয়েকে আদালতে হাজির করতে পারব না, শেরিফ। সে লজ্জায় মরে যাবে শত শত মানুষের সামনে। ঠিক করেছি এখানে আর নয়। খামার বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া চলে যাব সপরিবারে।’
এসব ঝামেলা সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত একটা বেজে গেছে। বাড়িটাকে এত নির্জন আর নিজেকে কখনও এত একাকী, নিঃসঙ্গ এবং অসহায় মনে হয়নি জন বেরেটের। রনিকে নিয়েই ছিল তাঁর সমস্ত স্বপ্ন। ভেবেছিলেন ছেলেটার বিয়ে দেবেন, নাতি-নাতনীর দাদু হবেন, চাঁদের হাট হয়ে উঠবে তাঁর সংসার। হায়, মানুষ যা ভাবে, সবসময় উল্টোটা ঘটে কেন?
ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বেরেট। চোখ ছাপিয়ে কান্না আসছে। নাহ্, র্যালফের মত তিনিও আর থাকবেন না এখানে। রনি নেই। আপনজন বলতে আর কে রইল তাঁর? এত বড় খামার বাড়ি দিয়ে কী হবে? তিনিও চলে যাবেন সব বিক্রি করে, যেদিকে দু’চোখ যায়।
রাতটা নির্ঘুম কাটল তাঁর চেয়ারে ঠায় বসে। পরদিন সকালে হঠাৎ কী মনে পড়তে মুখ হাত কোনমতে ধুয়েই ছুটলেন র্যালফ রকফিল্ডের বাড়িতে। র্যালফ তাঁর বাড়ির পেছনে, ছোট্ট বাগানে মর্নিং ওয়াক করছিলেন, জনকে দেখে ছুটে গেলেন।
শার্লি কেমন আছে, র্যালফ?’ ম্লান হেসে জিজ্ঞেস করলেন জন।
‘কাল সারারাত ঘুমায়নি। দেখে এলাম ঘুমাচ্ছে। তোমারও দেখছি একই দশা। কিন্তু এত সকালে কী মনে করে?’
‘তোমাকে বলতে এসেছি আমি আবার ওখানে যাচ্ছি।’
‘কোথায়?’
কাল রাতে যেখানে গিয়েছিলাম।’
‘কেন?’
দিনের আলোতে জায়গাটাতে ভাল করে চোখ বুলাতে চাই। আমার মন বলছে আমরা কিছু একটা মিস করে এসেছি। জিনিসটা কী জানি না, তবে শেরিফ অনুসন্ধান চালাবার আগেই একবার ওখানে ঢুঁ মারতে চাই।’
‘চলো, আমিও তোমার সাথে যাব।’
টাইগারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন জন। অপেক্ষা করলেন র্যালফ পোশাক বদলে আসা পর্যন্ত। তারপর তিনজনে মিলে আবার যাত্রা শুরু হলো।
.
নিজের ওপর বিরক্ত লাগছে ভিনগ্রহের হন্তারকের। হোস্টকে তার হত্যা না করলেও চলত। ওকে স্রেফ অজ্ঞান করে রাখলেই হত। জ্ঞান ফিরে আসার পর রনির কিছুই মনে পড়ত না। ওরা হয়তো তখন রনিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেত। ডাক্তার রুনির আকস্মিক স্মৃতি ভ্রংশের ব্যাপারটা ধরতে না পারলে যেত মনোবিজ্ঞানীর কাছে। এতে ভিনগ্রহের হন্তারকের ভাল হত। সে জানে বার্টলসভিল বা উইলকক্সে কোনও সাইকিয়াট্রিস্ট নেই। রনিকে নিয়ে যেতে হবে গ্রীনবে বা মিলওয়াকিতে। তাতে ওসব জায়গা সম্পর্কে জানতে পারত ভিনগ্রহের প্রাণীটি। ওখানে নতুন, রনির চেয়ে বুদ্ধিমান হোস্ট পেয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু ছিল না।
তবে নিজেকে কৃতকর্মের জন্যে বেশি দোষ দেয়াও যায় না। কারণ পৃথিবী নামের এ গ্রহে একেবারেই নতুন সে। সবকিছু বুঝে উঠতেও তো সময়ের প্রয়োজন।
এখন যে জায়গায় আছে সে, এখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এদিকে মানুষ হোস্ট পাওয়া তার জন্যে খুবই কষ্টের হবে। এসব জঙ্গলে লোকজন কদাচিৎ আসে শিকার করতে। তবে সে যেখানে আস্তানা গেড়েছে, তার রেঞ্জের চল্লিশ গজের মধ্যে তারা যে এসে সুখে নিদ্রা যাবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? কাজেই নতুন কোনও মানুষ হোস্ট পেতে হলে প্রথমে তাকে জানোয়ার হোস্ট ব্যবহার করতে হবে। সেই জানোয়ারটাকে পাঠাতে হবে ঘুমন্ত মানুষের কাছে। তবে এতে ঝুঁকি আছে। অবশ্য এ ধরনের ঝুঁকি নিতে সে অভ্যস্ত। রনির স্মৃতি ঘেঁটে সে দেখেছে এদিকে হরিণের আনাগোনা! প্রচুর। হোস্ট হিসেবে পাখিদেরকেও ব্যবহার করা যেতে পারে। হতে পারে সেটা চিকেন হক বা পেঁচা। তবে পেঁচা তার ওজন নিয়ে উড়তে পারবে কিনা সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই তার।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল সে হোস্ট হিসেবে পাখিই হবে তার উপযুক্ত। হরিণ-টরিণ পথ চলতে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে পারে। কিন্তু পাখিদের এসব ঝামেলা কম। পাখি হয়ে উড়ে, সুযোগ বুঝে ঘুমন্ত মানুষের ওপর সওয়ার হবে সে, তারপর পাখিটাকে মেরে ফেলবে। আর নতুন হোস্টের কাজ হবে তাকে এখান থেকে নিরাপদ কোনও জায়গায় সরিয়ে ফেলা।
তবে তাড়াহুড়োর কিছু নেই। এবার সে আস্তে-ধীরে ভেবেচিন্তে কাজ করবে। যাতে আর কোনও ভুল করে না বলে। তার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। মোটামুটি দশ মাইল দূরত্ব থেকেও সে মানুষ বা যে কোনও প্রাণীর হাঁটা-চলা বা নড়াচড়া টের পায়। যেমন এই মুহূর্তে সে মাটিতে কম্পন টের পাচ্ছে বুঝতে পারছে বড় ধরনের কিছু একটা এগিয়ে আসছে তার আস্তানার দিকে। একটা নয়, দুটো। একটু পর সে বুঝতে পারল দুটোও নয়, আসলে তিনটে প্রাণী হেঁটে আসছে। সে তার উপলব্ধি ক্ষমতা প্রয়োগ করল। এরা সেই তিনজন, গত রাতে টমির খোঁজে যারা এসেছিল। রনির বাবা, সেই মেয়েটির বাবা আর কুকুরটা। সোজা এগিয়ে আসছে গুহার দিকে। ওদের কথা শুনে বোঝা গেল রনির ট্রেইল ধরে আসার কারণ। ওরা জানতে চায় রনি কালরাতে দৌড়ে আসার আগে আসলে কোথায় ছিল।
কিন্তু কেন? এটা জেনে ওদের কী লাভ? কিন্তু ওরা যেভাবে গন্ধ শুঁকে আসছে তাতে সে ধরা পড়ে যাবে। বিশেষ করে যদি গুহার মেঝে খুঁড়ে ফেলে। ভিনগ্রহের প্রাণী রীতিমত অসহায় বোধ করল দেখে কুকুরটা ওদেরকে টেনে নিয়ে এসেছে ঠিক গুহামুখে। সে শুনতে পেল মেয়েটার বাবা অর্থাৎ র্যালফ বলছে, ‘গুহাটা দেখে মনে হচ্ছে রনি এর মধ্যে ঢুকেছিল।
