এ কাজটা করলেই ভাল হত। কিন্তু ‘ভাল’টা বুঝতে পেরেছে সে অনেক দেরিতে। অবশ্য কাজ একটা এখনও করা যায়। রনির স্মৃতি লোপ করে দিতে পারে সে। কাল সকালে রনিকে পাঠিয়ে দিতে পারে বাড়িতে। তার আত্মীয়স্বজন নিশ্চয়ই জানতে চাইবে কী হয়েছিল তার। রনির স্মৃতি সাময়িক ভাবে লোপ করে দেওয়ার কারণে সে কিছুই মনে করতে পারবে না। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। ডাক্তার পরীক্ষা করলেই বুঝতে পারবেন ওটা অ্যামনেসিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ। হয়তো রনিকে নিয়ে দু’একদিন হৈচৈ হবে। তারপর সব থিতু হয়ে গেলে রনিকে সে আবার নিয়ে আসবে। নিজের কাছে। নিজের কাজ ফুরোলে রনিকে হত্যা করবে সে। তবে মৃত্যুটা এমনভাবে দেখাতে হবে যেন দুর্ঘটনায় মারা গেছে রনি। তাতে কারও মনে কোনও সন্দেহ জাগার অবকাশ থাকবে না।
ভিনগ্রহের প্রাণীটার পরিকল্পনায় ছেদ ঘটাল কুকুরের ডাক। রনির চোখ দিয়ে ঝোপের আড়াল থেকে সে তাকিয়ে দেখল দুটো আলো, হেলতে দুলতে আসছে এদিকেই, সেই সাথে শোনা যাচ্ছে ঘেউ ঘেউ। ডাক শুনেই বুঝে ফেলল সে ওটা টাইগার, রনির বাবার কুকুর।
দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে নিতে দেরি হলো না ভিনগ্রহের প্রাণীর। রনির বাবা ছেলের চিন্তায় কুকুর নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। নির্ঘাত সেই মেয়েটা বলে দিয়েছে রনিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সে ভেবেছিল (বলা যায় রনি ভেবেছে) কাল সকালের আগে তার খোঁজ পড়বে না। বাবা যে কুকুর নিয়ে রাতের বেলাতেই হারানো ছেলের খোঁজে বেরিয়ে পড়বেন কে জানত?
আসছে ওরা, দু’জন পুরুষ, একটা কুকুর। একজন রনির বাবা, অপরজন সম্ভবত শার্লির বাবা। আর কুকুরটা সরাসরি গুহার দিকেই ছুটে আসছে!
ওদের এখান থেকে ভাগাতে হবে, সরিয়ে দিতে হবে। কোনওভাবেই গুহার ভেতর ঢুকতে দেয়া যাবে না। আর একশো গজ দূরে ওরাও নেই, সোজা এগিয়ে আসছে, কুকুরটা অনুসরণ করছে রনির ট্রেইল।
রনি, বা বলা যায় রনির শরীর, উঠে দাঁড়াল লাফ মেরে, ঝোপ ঘুরে ছুট দিল আলোকিত লণ্ঠনের দিকে।
ওকে দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন দুজনে। টাইগার আনন্দে গরগর করে উঠল, ঝাঁকি খেল শরীর, গলায় বাঁধা চামড়ার বেল্ট ছেড়ে দিতে বলছে মনিবকে। জন বেরেট চেঁচিয়ে উঠলেন-রনি! কী ব্যাপার?’
নাহ্! গুহার বড্ড কাছে ওরা। ঘুরে দাঁড়াল, রনি আবার দৌড়াতে লাগল, ক্রমে সরে যাচ্ছে গুহার কাছ থেকে, পেছন থেকে জন গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচাতে লাগলেন, ‘রনি, রনি, দাঁড়াও।’
রকফিল্ড বললেন, ‘কুকুরটাকে ছেড়ে দাও। ওকে ধরে নিয়ে আসুক।’ বেরেটের গলা শুনল রনি, ‘হ্যাঁ, ছেড়ে দিই। আর দু’জনকেই এক সাথে হারাই আর কী!’
ঝড়ের বেগে দৌড়ে ওদের পেছনে ফেলে দিল রনি। আসলে তো আর ও দৌড়াচ্ছে না, ওকে দৌড় করাচ্ছে ভিনগ্রহের প্রাণীটা। নিজের ওপর কোনই নিয়ন্ত্রণ নেই রনির। ওর শরীরের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা অদৃশ্য জিনিসটা ওকে দিয়ে যা খুশি করাচ্ছে।
দৌড়াতে দৌড়াতে রনি সেই আর্টিফ্যাক্ট বা ছুরিটার কাছে চলে এল। ঘন ঘাসের আড়াল থেকে ওটা খুঁজে বেরও করল। তারপর বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে ঘ্যাঁচ করে বসিয়ে দিল নিজের কব্জিতে। বাইরেটা জং ধরা হলেও ব্লেডটা যথেষ্ট ধারাল। ডান হাতের পর বাঁ হাতের কব্জিও কেটে ফেলল রনি। দু’হাতের শিরাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, স্রোতের বেগে রক্ত বেরুচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দুনিয়া আঁধার হয়ে এল, দড়াম করে পড়ে গেল ও।
কুকুরটাকে নিয়ে ওরা দু’জন যখন রনির কাছে পৌঁছুলেন ততক্ষণে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে যাত্রা করেছে সে। আর ওদিকে মৃত রনিকে ছেড়ে গুহায়, নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এল ভিনগ্রহের হন্তারক।
পাঁচ
রাতটা দুঃস্বপ্নের মত কাটল জন বেরেটের। পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ-এরচে’ করুণ ব্যাপার কী হতে পারে? আচ্ছন্নের মত বাড়ি ফিরেছেন তিনি। ফোন করে খবরটা দিয়েছেন শার্লিকে। শার্লি যেন মনে মনে প্রস্তুত হয়েই ছিল এরকম একটা দুঃসংবাদ শুনবে। তার মন বলছিল রনিকে আর কোনদিন জীবিত দেখতে পাবে না সে। খবরটা শোনার পর থেকে পাথর হয়ে গেছে শার্লি
এদিকে র্যালফ রকফিল্ড খবর দিয়েছেন উইলকক্সের শেরিফকে। বিশ মাইল দূর থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এলেন তিনি, সাথে করোনার। ঝোপের আড়াল থেকে শেরিফের লোক রনির লাশ উদ্ধার করল, স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে ঢোকাল। শহরে আবার ছুটে চলল অ্যাম্বুলেন্স মরদেহ নিয়ে।
বার্টলসভিলের শবাগারে লাশ পরীক্ষা করে করোনার ঘোষণা করল-কাটা কব্জি থেকে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের কারণেই মারা গেছে রনি। এটা স্পষ্ট আত্মহত্যা। কিন্তু প্রশ্ন হলো-রনির মত প্রাণ চঞ্চল, স্বাস্থ্যবান ছেলে আত্মহত্যা করবে কেন? আর অবাক ব্যাপার রনি আত্মহত্যা করেছে ভাঙা, জং ধরা পকেট নাইফ দিয়ে। শেরিফকে জন জানালেন তিনি জীবনেও রনির কাছে ভাঙা ছুরি দেখেননি। তা ছাড়া রনি যখন তাদের সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল, শপথ করে বললেন র্যালফ এবং জন, রনির হাতে কিছুই ছিল না। যেখানে বসে কাজটা করেছে ছুরিটা ওখান থেকেই নিয়েছিল রনি। কিন্তু ও কি আসলেই জানত যে ছুরিটা ওখানেই থাকবে। আর অন্ধকারে ওটার খোঁজই বা পেল কীভাবে সে?
‘ঠিক আছে,’ বললেন শেরিফ। ‘কাল দুটোর দিকে আমি অনুসন্ধান দল পাঠিয়ে দেব।’ র্যালফের দিকে ঘুরলেন তিনি। ‘ভালকথা র্যালফ। আপনার মেয়ের সাথে কথা বলতে হবে আমার। শুনলাম বিকেলে সে রনির সাথেই ছিল। ওরা একসাথে নাকি সাঁতারও কেটেছে। তার একটা সাক্ষ্য দরকার।’
