‘রাতের বেলা জঙ্গলে বন্দুক ছাড়া পথ চলতে আমি ভরসা পাই না,’ জবাব দিলেন র্যালফ। ‘কে বলতে পারে কখন কী ঝাঁপিয়ে পড়বে গায়ের ওপর। এক মুহূর্ত পরে আবার বললেন, ‘আমি রনির কথা ভাবছি, ওকে যদি খুঁজে পাই।’
‘অবশ্যই খুঁজে পাব।’
‘ভাবছি ওদের বিয়েটা দিয়ে দিলেই হয়। এভাবে লুকোচুরি করে বনে- বাদাড়ে দেখা-সাক্ষাতের ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছে না আমার। তুমি কী বল?’
‘আমার কোনও আপত্তি নেই,’ সায় দেয়ার ভঙ্গিতে বললেন জন। চুপচাপ হেঁটে চললেন তাঁরা। হঠাৎ দেখলেন দূর থেকে একজোড়া আলো দ্রুত এগিয়ে আসছে, গাড়ির হেড লাইট। জন চট করে টাইগারের কলার চেপে ধরলেন, রাস্তা থেকে টান মেরে সরিয়ে দিলেন। আড়ষ্ট হয়ে উঠেছে জানোয়ারটা, কাঁপছে থর থর করে। গাড়িটা চলে যাওয়া পর্যন্ত ওকে শক্ত হাতে ধরে রইলেন জন, তারপর আবার হাঁটা ধরলেন।
টাইগারকে আগেই রাস্তা বাতলে দিয়েছিল শার্লি, ওখানে পৌঁছুতে তেমন বেগ পেতে হলো না। শুধু জঙ্গলে ঢোকার পর লণ্ঠন জ্বালাতে হলো। এদিকে গাছপালা এত ঘন যে চাঁদের আলো ডালপালা আর পাতার প্রাচীর ভেদ করে ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায় না। ফলে আঁধার হয়ে থাকে জঙ্গল।
রনির জামাকাপড় আগের জায়গাতেই আছে। ওগুলো দেখে মনে মনে হতাশ হয়ে উঠলেন জন। ভেবেছিলেন এসে দেখবেন রনি ফিরে এসেছে, পোশাক পরে বাড়ি ফিরে গেছে। ওকে আর খুঁজতে হবে না। এবার ভয় লাগল তাঁর। ছেলেটার কিছু হয়নি তো?
টাইগার রনির জামা-কাপড় শুঁকছে, তারপর এগিয়ে গেল রনি যেখানে শুয়ে ছিল, সেখানে। জায়গাটা এক চক্কর দিয়ে ছুটল ঝোপের দিকে। জন দ্রুত রনির জামা-কাপড় নিয়ে ওর পিছু পিছু দৌড় দিলেন। বুঝতে পেরেছেন তিনি, টাইগার রনির ট্রেইল খুঁজে পেয়েছে, সেদিকেই যাচ্ছে এখন।
চার
ভিনগ্রহের হন্তারক এখন বিশ্রাম নিচ্ছে। ইতিমধ্যে রনির জ্ঞানভাণ্ডার থেকে সব শুষে নিয়েছে। সে এখন জানে এ গ্রহের নাম পৃথিবী। পৃথিবী সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণাও পেয়ে গেছে সে। জানে এ গ্রহের বেশির ভাগ জুড়ে রয়েছে লবণ পানির সমুদ্র, তবে ডাঙাও কম নেই, সেগুলো সব দেশ আর মহাদেশ।
এ মুহূর্তে যেখানে সে আছে এ জায়গা সম্পর্কেও মোটামুটি একটা ধারণা তার হয়েছে। সে জানে সে একটা গ্রামে চলে এসেছে, সবচেয়ে কাছের শহর চার মাইল উত্তরে। তার জানা আছে জায়গাটির নাম বার্টলসভিল, সাকুল্যে হাজার তিনেক লোকের বাস। এটা উইসকনসিন নামে এক রাজ্যে অবস্থিত, রাজ্যটা আমেরিকা নামের একটি দেশের অংশ। এখান থেকে পঁয়তাল্লিশ মাইল দক্ষিণ পূর্বে বড় একটা শহর আছে, গ্রীনবে। গ্রীনবের একশো মাইল দক্ষিণে মিলওয়াকি, আরেকটি বড় শহর। মিলওয়াকির নব্বুই মাইল দূরে রয়েছে আরও একটি বড় শহর শিকাগো। এ সব শহরের নাম সে জানে, কারণ রনি ওই শহরগুলোতে গিয়েছিল। তবে বার্টলসভিল এবং তার আশপাশের এলাকা সে ভালই চেনে। এটা তার খুব কাজে লাগবে। তার মনের ছবিতে এ এলাকার বুনো এবং সব ধরনের প্রাণীর ছবি ফুটে আছে। প্রাণীগুলোর ক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও সে অজ্ঞাত নয়। আবার কাউকে হোস্ট হিসেবে ব্যবহার করতে হলে কার ওপর সওয়ার হতে হবে ভালই জানা আছে তার।
তবে সমস্যা হলো, যার ওপর সে এ মুহূর্তে ভর করে আছে বিজ্ঞান সম্পর্কে তার ধারণা বা পড়াশোনা নেই বললেই চলে। অথচ তার সবচেয়ে দরকার ইলেকট্রনিক্স ভাল জানে এমন কাউকে। তার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে কোনও ইলেকট্রনিক্সের ওপর ভর করা। তবে সে লোকের ইলেকট্রনিক্সের পুঁথিগত বিদ্যা থাকলেই চলবে না, জানতে হবে কী ভাবে এ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নানা যন্ত্রপাতি তৈরি করা যায়। কাজটা কঠিন, হয়তো মূল লক্ষ্যে পৌঁছুতে তাকে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে, সওয়ার হতে হবে অনেকের ওপর। তবে প্ল্যান মাফিক এগোতে পারলে এ কাজে সফলও একশোভাগ। সে তাই করবে। কারণ তাকে বাড়ি ফিরতে হবে।
পৃথিবীতে তাকে পাঠানো হবে এমন ধারণাও তার ছিল না। আসলে কর্তৃপক্ষ তাঁদের মর্জি মত ভয়ংকর অপরাধীদের যেখানে খুশি পাঠিয়ে দেন। গ্যালাক্সিতে গ্রহের অভাব নেই। কিন্তু ভিনগ্রহের অপরাধীটির পৃথিবীতে থাকার কোনও ইচ্ছে নেই, সে নিজের বাসভূমে ফিরে যেতে চায়। এখান থেকে ফিরে যেতে পারলে তাকে ক্ষমা তো করা হবেই, বীরের মর্যাদা পাবে সে। কারণ, নির্বাসনে যারা যায়, তাদের একশোভাগের একভাগও বাড়ি ফিরতে পারে কিনা সন্দেহ। সে ফিরতে পারলে নতুন এই গ্রহ সম্পর্কে প্রচুর তথ্য দিতে পারবে তার লোকদের। তার অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া হবে। সম্ভব হলে সে এখানকার কোনও মানুষ হোস্টকে নিয়ে যাবে সঙ্গে করে। তা হলে তার খাতির দেখে কে? অবশ্য নিজের দেশে ফেরা সম্ভব যদি কাজগুলো করা হয় সাবধানে। ধীরে এবং কোনও ভুল না হলে। অবশ্য ইতিমধ্যে সে একটা ভুল করে বসেছে। রনিকে ন্যাংটা অবস্থায় এখানে নিয়ে আসা উচিত হয়নি। রনিকে সাময়িকভাবে সম্মোহন করলেও চলত-লম্বা ঘাসের মধ্যে তাকে লুকিয়ে রেখে সে চলে যেত ঘুমন্ত মেয়েটার কাছে। তারপর ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকত তার পাশে। তারপর মেয়েটির ঘুম ভাঙলে ওরা চলে যেত যে যার বাড়িতে। পরদিন সকালে রনিকে আবার নিয়ে আসত সে এখানে। রনি তাকে ঘাসের জঙ্গল থেকে তুলে নিয়ে গুহার মধ্যে আরও ভাল কোনও জায়গায় রেখে দিত। তারপর সুবোধ ছেলের মত ফিরে যেত বাড়িতে, কারও মনে কোনও সন্দেহ না জাগিয়ে।
