গুহার মাঝখানে এসে ওটা রনিকে দিয়ে মাটি খোঁড়াল। মাটি মানে বালু। নয় ইঞ্চি মত গর্ত করার পর রনি কচ্ছপরূপী ভিনগ্রহের প্রাণীটাকে ওখানে কবর দিল। গর্তের বালু এমনভাবে বুজিয়ে দিল বোঝার উপায় থাকল না এখানে কিছু একটা আছে। তারপর রনি সাবধানে বেরিয়ে এল গুহা থেকে সমস্ত চিহ্ন মুছতে মুছতে। সবশেষে, গুহা মুখের বাইরে, ঝোপের আড়ালে বসে রইল চুপচাপ।
তাড়াহুড়ার কিছু নেই। নিজেকে নিরাপদেই লুকিয়ে রেখেছে সে। এখন রনির জ্ঞানভাণ্ডার শুষে নেবে সে। যদিও রনির আই কিউ তেমন প্রখর নয়, ইতিমধ্যে বুঝে গেছে সে, তারপরও রনি আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে যতটুকু জানে, ওটুকু জানলেও তার চলে যাবে। কারণ তার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় রনির এই জ্ঞানটুকু অল্পসময়ের জন্য হলেও কাজে লাগানোর মত।
তিন
ঘুম ভেঙে শার্লি রকফিল্ড দেখল রোদের তেজ মরে গেছে, আবছা আঁধার নামছে জঙ্গলে। কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখল ছ’টা বাজে। তার মানে টানা তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েছে সে। এখান থেকে ওর বাড়ি আধ-ঘণ্টার হাঁটা পথ। বাপ-মা হয়তো চিন্তায় পড়ে গেছে আদরের মেয়ে এখনও আসছে না কেন ভেবে।
পাশ ফিরল সে, রনিকে জাগাবে। কিন্তু রনি নেই পাশে। জামা-কাপড় এলোমেলো পড়ে আছে। হয়তো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেছে কাছে কোথাও, ভাবল শার্লি। ওর ফেরার অপেক্ষায় বসে রইল সে।
কিন্তু আধ ঘণ্টা পরেও রনি ফিরল না দেখে উদ্বেগ বোধ করল শার্লি পায়ে স্যান্ডেল চাপিয়ে উঠে দাঁড়াল। নাম ধরে ডাকল, ‘রনি! কোথায় তুমি?’
কোনও সাড়া নেই। শুধু মাটিতে পাতা পড়ার খসখস শব্দ ছাড়া আশ্চর্য নীরব প্রকৃতি। আচ্ছা, রনি ওকে ভয় দেখাবার জন্যে কোথাও লুকিয়ে নেই তো? হঠাৎ, ‘হাউ’ করে বেরিয়ে আসবে ঝোপের আড়াল থেকে। নাহ্, রনি অমন করবে না।
কিন্তু ছেলেটা গেল কোথায়? জামা-কাপড় ছাড়া যাবেই বা কতদূর? নাকি কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে? কোনও কারণে অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে পড়ল না তো? রনির স্বাস্থ্য খুব ভাল। মৃগীরোগ নেই ওর। আর যদি অ্যাকসিডেন্ট হয়-তা হলে হয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে (মারাও যেতে পারে রনি, এ কথা ভাবলেও বুকে কাঁপন ধরে)। ওর যদি গোড়ালি মচকে যায় বা পা ভেঙে গিয়ে থাকে, তা হলেও তো শার্লির ডাকে সাড়া দেয়ার কথা। কিন্তু কোনও সাড়া নেই কেন?
টেনশনের চোটে মুখ শুকিয়ে গেল শার্লির, বুকের ভেতর পাঁজরের গায়ে দমাদম হাতুড়ির মত পিটছে হৃৎপিণ্ড। সে ঝোপঝাড় মারিয়ে বেরিয়ে এল চারপাশে তাকাতে তাকাতে। হাঁটছে, সেই সাথে উঁচু গলায় ডাকছে রনির নাম ধরে। আধ-ঘণ্টা পরে, আশপাশের প্রায় একশো গজ জায়গা খুব ভালভাবে খুঁজেও রনির টিকিটিও চোখে না পড়ায়, এবার সত্যি ভয় পেয়ে গেল শার্লি। এতদূরে রনি হয়তো আসেওনি।
ওর সাহায্য দরকার, বুঝতে পারল শার্লি। এবার বাড়ির পথ ধরে প্রায় দৌড় শুরু করল। তিন মাইল রাস্তা একটানা দৌড়াবার পর, পরিশ্রম এবং টেনশনে প্রায় নেতিয়ে পড়ল মেয়েটা। ওর চেহারা দেখে ভয় পেয়ে গেলেন ওর বাবা। ব্যগ্র কণ্ঠে জানতে চাইলেন, ‘কী হয়েছে, শার্লি?’
কেঁদে ফেলল শার্লি। ফোঁপাতে ফোঁপাতে পুরো ঘটনা খুলে বলল।
সব শুনে উঠে দাঁড়ালেন র্যালফ রকফিল্ড। বললেন, ‘কাঁদিস না, মা। দেখছি কী করা যায়।’
তিনি তখুনি ফোন করলেন রনির বাবা, তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু জন বেরেটকে। সবকথা শুনে মুখ অন্ধকার করে ফেললেন বেরেট। শুধু বললেন, ‘তুমি থাক বাড়িতে, আসছি আমি।’
ফোন ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন জন বেরেট। তারপর ওয়ারড্রোব খুলে রনির পুরানো একজোড়া মোজা বের করে পকেটে ঢোকালেন। তাঁর কুকুর টাইগারকে মোজার গন্ধ শুকিয়ে রনির খোঁজে বেরুবেন। তারপর লণ্ঠন, দেশলাই ইত্যাদি নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন।
ডগ হাউসের সামনে ঘুমাচ্ছে টাইগার। আস্তানাটা রনিই ওর জন্যে বানিয়ে দিয়েছিল। টাইগারের বয়স সাত, সাদায় কালোয় মেশানো রং, বিশাল আকারের এক হাউন্ড। সে শিকারের গায়ের গন্ধ শুঁকে তাকে খুঁজে বের করতে ওস্তাদ। তার সবই ভাল, শুধু গাড়িঘোড়া ভয় পায়। বলা যায়, যান্ত্রিক বাহনটার প্রতি তার প্রচুর অ্যালার্জি আছে।
‘চলরে, টাইগার,’ ডাক দিলেন জন। ‘কাজ আছে।’
লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল হাউন্ড। তারপর মনিবের পিছু পিছু এগোল রকফিল্ডের খামার বাড়ির দিকে। ততক্ষণে সাঁঝ নেমে গেছে পুরোপুরি।
র্যালফ রকফিল্ড লণ্ঠন আর শটগান নিয়ে রেডি ছিলেন, বন্ধুকে দেখে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। তাঁর সাথে শার্লিও আছে।
কোনও শুভেচ্ছা বিনিময় হলো না। জন জিজ্ঞেস করলেন শার্লিকে, ‘এই রাস্তাটা মোড় ঘুরে ব্রিজের পাশ দিয়ে উত্তর দিকে চলে গেছে না?’
‘জ্বী, আংকেল, আমি আপনাদের সঙ্গে যাব। দেখিয়ে দেব রনির জামা কাপড়গুলো কোথায় পড়ে আছে।
‘তোমাকে যেতে হবে না, শার্লি,’ শান্ত গলায় বললেন তার বাবা, তুমি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। টাইগারই আমাদের ওখানে নিয়ে যেতে পারবে।’
বাপের মুখের ওপর কথা বলার সাহস নেই শার্লির। সে বাধ্য মেয়ের মত ঘরে ঢুকল। ওঁরা দুজন কুকুরটাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন।
ঝকঝকে চাঁদ উঠেছে আকাশে। দিনের আলোর মত পরিষ্কার চারদিক। লণ্ঠন না আনলেও চলত।
‘বন্দুক কেন, র্যালফ?’ প্রশ্ন করলেন জন। শটগান কী কাজে লাগবে?’
