অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর ওরা উঠে পড়ল তীরে, তোয়ালে দিয়ে গা মুছল। ছেলেটা কী যেন বলল মেয়েটাকে, মেয়েটা মাথা দুলিয়ে সায় দিল। ছেলেটা তোয়ালে বিছাল মাটিতে। তারপর দু’জনেই শুয়ে পড়ল। একটু পরেই নাক ডাকতে শুরু করল ছেলেটার। মেয়েটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে, আস্তে আস্তে চোখ বুজে এল তারও। সাঁতার কেটে বেজায় ক্লান্ত দু’জনেই। ঘুমিয়ে পড়েছে।
এতক্ষণ এ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল ওটা। রনি গভীর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে, সে ওর শরীরের ভেতর প্রবেশ করল। তবে ঢুকতে একটু কসরত করতে হলো। রনির অবচেতন মন তাকে ঢুকতে দিতে চাইছিল না। বুদ্ধিমান প্রাণীদের হোস্ট করতে গিয়ে এমন সমস্যায় আগেও পড়েছে সে। চার পেয়ে প্রাণীটার ভেতরে ঢুকতে তার মাইক্রো সেকেন্ড সময়ও লাগেনি। কিন্তু যে প্রজাতি যত বুদ্ধিমান তার কাছ থেকে প্রতিরোধটা আসে তত বেশি। তবে রনির অবচেতন মনকে অবশ করে ফেলতে তার সময় লাগল না। একবার ঘুমের গভীরে চলে গেলে যে কাউকে কাবু করে ফেলতে পারে সে। এবারও তাই করল। এখন রনির শরীরটা তার একান্ত নিজের, রনির মনকে সে নিজের ইচ্ছামত চালাতে পারবে, ওকে দিয়ে যা খুশি করানোর ক্ষমতা এখন সে রাখে। রনি তার কাছে সম্পূর্ণ অসহায় এক বন্দী। তার বন্দীত্বের অবসান ঘটবে একমাত্র মৃত্যুর মাধ্যমে।
রনির সমস্ত স্মৃতি বা জ্ঞান নিজের মধ্যে ধারণ করল সে। এই জ্ঞান কাজে লাগাবে সে নিজের প্রয়োজনে, তবে আস্তে ধীরে, রয়ে-সয়ে।
প্রথমেই যে কাজটা করা দরকার তা হলো নিজেকে বা নিজের শরীরটাকে নিরাপদ কোনও জায়গায় লুকিয়ে রাখতে হবে। যাতে কেউ এসে তাকে ধ্বংস করতে না পারে।
রনির জ্ঞান এবং স্মৃতির ভাণ্ডার এ কাজে ব্যয় করল সে। খুঁজতে লাগল লুকোবার ভাল জায়গা। এক সময় পেয়েও গেল। আধা মাইল দূরে, গভীর জঙ্গলে, পাহাড়ের ধারে একটা গুহা আছে। ছোট গুহা, তবে এটার কথা কেউ জানে না। নয় বছর বয়সে রনি এটা আবিষ্কার করছে। ধরেই নিয়েছে প্রথম আবিষ্কর্তা হিসেবে এ গুহার মালিকও সে। কাউকে এ গুহার কথা বলেনি সে। গুহার মেঝে খটখটে, পাথুরে নয়-বালুময়।
যেন জেগে না ওঠে, এভাবে আস্তে উঠে পড়ল সে শার্লির পাশ থেকে (ইচ্ছে করলে মেয়েটার গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে সে। কিন্তু তাতে জটিলতা খামোকা বাড়বে; আর কম শক্তিসম্পন্ন প্রাণীর প্রতি তার তেমন আকর্ষণও নেই)। হাঁটা শুরু করল। রনির পরনে কিছু নেই। তার জুতো, শর্টস, ট্রাউজার, শার্ট সব পড়ে রইল যেখানে একটু আগে সে শুয়েছিল, সে জায়গায়। ওটা মনে করেছে জামাকাপড় পরার দরকার নেই। কারণ যে কেউ এখানে যে কোনও সময় চলে আসতে পারে। কাজেই যত দ্রুত সম্ভব কেটে পড়তে হবে।
ঝোপ ঠেলে রাস্তার ওপাশে যাবার আগ মুহূর্তে পেছন ফিরে তাকাল সে। মেয়েটা এখনও অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঘুরল সে। দুলকি চালে ছুটল গুহার দিকে।
রনির মনের ভেতর ঢুকে বসে আছে সে, ওর মনের কথা পড়তে পারছে। জেনে অবাক হয়েছে রনি এবং মেয়েটা তাকে রাস্তায় দেখেও কেন থেমে পড়েনি। তাদের দৃষ্টিতে সে সামান্য একটা কচ্ছপ ছাড়া কিছুই নয়। পাঁচ ইঞ্চি লম্বা একটা কচ্ছপের খোলসের মধ্যে তার বাস। কচ্ছপ সম্পর্কে সে জানে এটা ধীরগতি একটা প্রাণী, বোকাসোকা, কারও সাতে পাঁচে নেই। কচ্ছপটার ওজন আর তার ওজন প্রায় একই—দুই পাউন্ড। তার জানা আছে কচ্ছপ মানুষের কাছে একটি সুখাদ্য ‘বলে বিবেচিত। তবে সচরাচর ক্ষুধার্ত মানুষ ছাড়া কেউ কচ্ছপ ধরতে যায় না। ভাগ্যিস, ওরা ক্ষুধার্ত ছিল না। মেঠো ইঁদুরটাকে সে তার হোস্ট বানিয়েছিল। পরে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ওটাকে ত্যাগ করেছে। বলা যায় ইঁদুরটাকে বাধ্য করেছে সে রনির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। জানত রনি তাকে মেরে ফেলবে এবং সে ইঁদুরের দেহের বন্ধন থেকে মুক্তি পাবে, ঢুকে যেতে পারবে নিজের খোলসে।
শুরুতে বলেছিলাম তার সুনির্দিষ্ট কোনও আকার নেই। কথাটি সম্পূর্ণ সত্যি নয়। তার আকার একটা আছে-অনেকটা কচ্ছপের মত দেখতে সে। তবে পৃথিবীর কচ্ছপের মত নয়। মেয়েটা যখন বলল, ‘দেখো, একটা কচ্ছপ!’ তার আত্মা উড়ে গিয়েছিল ভয়ে। ভাগ্যিস, ছেলেটা তার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। তা হলেই সর্বনাশ হত। ওরা টের পেয়ে যেত আদৌ সে কচ্ছপ নয়। কচ্ছপের খোলসের নীচে হাত, পা, মাথা কিছুই নেই। ওরা যদি আরও বেশি কৌতূহলী হয়ে খোলটা ভেঙে ফেলত বা ফাটিয়ে ফেলত, ভেতরে কী আছে দেখার জন্যে, তা হলে কোনও হোস্টের ওপর আশ্রয় করেও বাঁচতে পারত না সে, মারা যেত সাথে সাথে। কারণ কাউকে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সময় সেই জিনিস বা প্রাণীর নিজস্ব অস্তিত্ব বা সত্তা বলে কিছু থাকে না।
ছুটতে ছুটতে রনির সেই গুহায় চলে এল সে। গুহাটা ছোট, ভেতরে ঢুকতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে। চারপাশে ঝোপঝাড় এটাকে ঢেকে রেখেছে দেখে সন্তুষ্ট বোধ করল সে।
ভেতরটা প্রায় অন্ধকার, তবে রনির চোখ দিয়ে সে ভালই দেখতে পাচ্ছে। রনির স্মৃতি থেকে চমৎকার একটা’ ছবি পাচ্ছে সে জায়গাটার। (এখানে একটা কথা বলা দরকার, সে যখন কারও ওপর সিন্দবাদের ভূতের ওপর সওয়ার হয়, তখন হোস্টের উপলব্ধি ক্ষমতা দিয়েই সে সব কিছু দেখে এবং শোনে। কাজেই হোস্ট যদি ক্ষীণ দৃষ্টির হয় তারও দৃষ্টি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।) গুহাটা তেমন বড় নয়, ফুট বিশেক হবে লম্বায়, সবচেয়ে চওড়া জায়গা হচ্ছে মাঝখানটা, ছয় ফুটের মত। এখানে একজন মানুষ মোটামুটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
