ওই ছেলেটির নাম রনি বেরেট, মেয়েটি শার্লি রকফিল্ড। পরস্পরকে ভালবাসে ওরা, বিয়ে করবে শীঘ্রি। জঙ্গলে ঘুরতে বেরিয়েছে ওরা, ফুর্তি করবে।
রনির বাঁ হাত নিজের ডান হাতের মুঠোয় চেপে হাঁটছিল শার্লি, হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিল রনি, দ্রুত সামলে নিল নিজেকে। অবাক দৃষ্টিতে তাকাল শার্লির দিকে। শার্লি উঁকি মেরে কী যেন দেখছে।
‘দেখ, রনি, বলল সে। ‘একটা মেঠো ইঁদুর। কী করছে দেখ!’
‘দূর, ইঁদুর দেখলেই গা ঘিনঘিন করে আমার।’ মুখ বাঁকাল রনি।
ইঁদুরটা, ওদের কাছ থেকে কয়েক হাত দূরে, রাস্তায় বসে আছে, প্রেইরি কুকুরের মত। সামনের ছোট ছোট পা দুটো দ্রুত নাড়ছে, যেন ওদের সঙ্কেত দিতে চাইছে। খুদে, তীক্ষ্ণ চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে ওদের ওপর।
‘কোনও ইঁদুরকে এমন অদ্ভুত কাজ করতে দেখিনি কোনদিন,’ মন্তব্য করল শার্লি, ‘মোটেও ভয় পাচ্ছে না আমাদেরকে, লক্ষ করেছ? এটাকে বাড়ি নিয়ে গেলে কেমন হয়, বলো তো? পুষব!‘
রনি বাধা দেয়ার আগেই উবু হলো শার্লি, হাত বাড়িয়ে খপ করে ধরে ফেলল ইঁদুরটাকে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে খুদে প্রাণীটাকে দেখতে দেখতে বলল, ‘ইস, রনি। কী সুন্দর!’
‘মানলাম সুন্দর,’ বলল টমি, ‘এখন ওটাকে ছেড়ে দাও। বাড়ি নিয়ে যেতে হবে না।’
‘আচ্ছা বাবা, নেব না। এমনি দেখলাম ওকে ধরতে পারি কিনা। উহ্!’ ছুড়ে ফেলল সে ইঁদুরটাকে, যন্ত্রণায় মুখ বাঁকাল। ‘খুদে শয়তানটা আমাকে কামড়ে দিয়েছে।’
ইঁদুরটা ফুড়ৎ করে দৌড় দিল, খানিক দূরে গিয়ে থেমে দাঁড়াল, পেছন ফিরে দেখল ওরা ধাওয়া করেছে কি-না। না, ধাওয়া করছে না। ওরা এমনকী তার দিকে তাকাচ্ছেও না। ওরা ব্যস্ত রয়েছে নিজেদেরকে নিয়ে।
‘বেশি লেগেছে, সোনা?’ উদ্বিগ্ন দেখাল রনিকে।
‘না, তেমন না, আরে, দেখ!’ শার্লি তাকাল রাস্তায়।
দৌড়ে আসছে ইঁদুরটা রনির দিকে। ট্রাউজার বেয়ে উঠতে শুরু করল, এক ঝাপটা মেরে ওটাকে পাঁচ হাত দূরে পাঠিয়ে দিল রনি। আবার এল ওটা-প্রতিহিংসা নিয়ে হামলা চালাল। এবার প্রস্তুত ছিল রনি। সজোরে পা নামিয়ে আনল ছোট্ট, জ্যান্ত প্রাণীটার ওপর, পিষে ভর্তা করে ফেলল। তারপর ছিন্নভিন্ন দেহটা কিক মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে।
‘রনি, তুমি ওটাকে—’
গম্ভীর চেহারা নিয়ে বান্ধবীর দিকে ফিরল রনি। শার্লি, ওটা আমার ওপর দু’বার হামলা চালিয়েছে। যাকগে, তোমাকে কোথায় কামড়েছে বল। রক্ত বের হলে ইঁদুরটাকে নিয়ে শহরে যেতে হবে, র্যাবিস আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখা দরকার। কোথায় কামড় দিয়েছে, শার্লি?’
‘বা-বাম বুকে, মুখের কাছে আনার সময় কামড় দিয়েছে। তবে রক্ত বের হয়নি। সোয়েটার আর ব্রা ছিল-‘
তবু চেক করে দেখতে হবে। তোমার জামা-না থাক এখানে খুলতে হবে না। লোকজন এসে পড়তে পারে, চলো, এগোই। অন্য কোথাও গিয়ে পরীক্ষা করে দেখব।
শার্লির হাত ধরে পা বাড়াল রনি। এত জোরে হাঁটা দিল, ওর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে প্রায় দৌড়াতে হলো শার্লিকে
‘দেখ একটা কচ্ছপ,’ কয়েক কদম যাবার পর বলে উঠল শার্লি।
হাঁটার গতি কমাল না রনি, ‘প্রাণী নিয়ে অনেক খেলা হয়েছে। এবার চলো তো!’
খানিকটা এগোবার পর মোড় ঘুরল ওরা, এখানে প্রচুর ঝোপঝাড়, তারপর টলটলে একটা পুকুর। বেশ নির্জন পরিবেশ। এখানে লোকজন আসে বলে মনে হয় না। ওরা এসেছে পুকুরে মজা করে সাঁতার কাটবে।
রনির বয়স আঠারো, শার্লি সতেরোয় পা দিয়েছে। ছোটবেলা থেকে দুটিতে বন্ধুত্ব। একই স্কুলে পড়ত ওরা, একই ক্লাসে। বছর দুই আগে হাইস্কুলের পড়া শেষ করেছে ওরা। পড়াশোনার প্রতি তেমন আগ্রহ নেই রনির। বাপের খামারে কাজ করে। বাপবেটা দু’জনের খেয়ে পরে চমৎকার চলে যায়। দু’পরিবারই ওদের সখ্যর কথা জানে। টমির বাবা, মি. বেরেট শার্লিকে পুত্রবধূ করে ঘরে নেয়ার জন্যে মুখিয়ে আছেন। শার্লির বাবা মারও আপত্তি নেই রনির মত সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান এবং সৎ পাত্রের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে। জানেন রনির ঘরে শার্লি সুখেই থাকবে। কারণ রনি খুবই ভালবাসে শার্লিকে।
রনি আর শার্লি মাঝে মাঝে ঘুরতে বেরোয়। রনির কাজই হলো নতুন জায়গা খুঁজে বের করা, যেখানে শার্লিকে নিয়ে মজা করে গল্প করা যাবে। সে সম্প্রতি এই জঙ্গলের মধ্যে চমৎকার এই পুকুরটির খোঁজ পেয়েছে। সাঁতারের কথা বলতেই লাফিয়ে উঠেছে শার্লি, তারপর দুজনে মিলে চলে এসেছে এখানে।
পুকুরে নামার আগে শার্লির ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে দেখল রনি। সোয়েটার ভেদ করে ইঁদুরের দাঁত কামড় বসাতে পারেনি মাংসে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল রনি। হাসল, ‘যাক, বাবা। বাঁচা গেল! চলো, সাঁতার কাটি।’
ওরা জামাকাপড় ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাকচক্ষু কালো দীঘির পানিতে। ঠাণ্ডা স্পর্শে জুড়িয়ে গেল গা। দু’জন পরস্পরের দিকে পানি ছুঁড়ছে, হাসছে, জানে না ঝোপের আড়াল থেকে কিছু একটা দেখছে ওদেরকে। এমন কিছু একটা যা শীঘ্রি ওদের জীবন নরকের চেয়েও দুঃস্বপ্নময় করে তুলবে।
দুই
ওটা সাঁতার কাটতে দেখছে রনি এবং শার্লিকে। অস্থির হয়ে আছে কখন ওরা ক্লান্ত হয়ে তীরে উঠবে, তারপর ঘুমিয়ে পড়বে। ওরা ঘুমুলেই ওদের যে কাউকে নিজের হোস্ট বানাতে পারবে সে। তবে ছেলেটাকেই প্রথম পছন্দ তার। কারণ মেয়েটার চেয়ে ছেলেটা লম্বায় বড়, গায়ে গতরেও শক্তিশালী মনে হচ্ছে এবং সম্ভবত বুদ্ধিমান। বুদ্ধিমান, শক্তিশালী প্রাণীই তার দরকার।
