‘শালার ড্যাম্প,’ বিড়বিড় করল আর্থার। গাড়ির গতি বাড়ছে, বাম দিকে তাকাতে এক ঝলক দেখতে পেল ও ওটাকে। মনে হলো একটা কুকুর তাকিয়ে আছে কটমট করে। রিয়ার ভিউ মিররে চাইল আর্থার। কেউ নেই।
মাথাটা ঘুরছে আর্থারের। অতখানি ব্রান্ডি খাওয়া উচিত হয়নি। মদের প্রভাব ওর অনুভূতিগুলোকে ভোঁতা করে দিচ্ছে, তালগোল পাকিয়ে যেতে চাইছে সবকিছু। কিন্তু তিনটে ব্রান্ডি এক সাথে এর আগেও অনেক পান করেছে আর্থার। কই, তখন তো কিছু হয়নি। এখন হচ্ছে কেন?
বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। কাঁচ থেকে খসে পড়েছে পোকাগুলো। কিন্তু ওয়াইপারের অবস্থা আগের মতই। জানালা দিয়ে উঁকি দিল আর্থার। ওই তো দুমুখো রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। টি আকারের সাইন পোস্টটা নির্দেশ করছে বাম দিকে লন্ডন। রাস্তা খালি। হুইল ঘোরাল আর্থার, নিজের অজান্তে চোখ চলে গেল আয়নায়, দাঁড়িয়ে পড়ল ব্রেক কষে। সাইনপোস্টে কি যেন ঝুলছে, ছোট, গোলাপী রঙের। গেঁথে রয়েছে কাঠের সাথে। গাড়ি নিয়ে পিছিয়ে এল আর্থার। না, কিছু না। আলো পড়ে দূর থেকে অমন মনে হয়েছে। অ্যাকসিলেরাটরে চাপ দিল আর্থার, কিন্তু সাড়া দিল না গাড়ি
প্রথমে বামে তারপর ডানে তাকাল আর্থার। দু’পাশেই ঝোপঝাড়। জনমনিষ্যির চিহ্ন নেই কোথাও
ক্লাচ চেপে ধরল আর্থার, গিয়ার বদলাল, দু’পাশে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। ঝিম ধরা ভাবটা আবার ফিরে এসেছে। গন্ধটা হঠাৎ বেড়ে গেছে। বমি আসছে ওর। খকখক কেশে উঠল আর্থার, আবার তাকাল আয়নার দিকে এবং আঁতকে উঠল। দুঃস্বপ্নে দেখা সেই ভয়ঙ্কর বাচ্চাটা খলখল করে হাসছে তার দিকে তাকিয়ে।
চিৎকার দিল আর্থার, চোখে হাত চাপা দিল। ঠিক তখন চলতে শুরু করল গাড়ি। এগোচ্ছে, রাস্তার পাশে, জলভরা একটা ডোবার দিকে। প্রচণ্ড জোরে উইন্ডশিল্ডে যখন ঠুকে গেল মাথা, তখনও চিৎকার করে চলেছে আর্থার।
.
শীলা আর্থার ফাঁকা চোখে তাকিয়েছিল টিভি পর্দার দিকে, মাঝে মাঝে ঘড়ি দেখছে। হঠাৎ বেজে উঠল ফোন।
‘হাই,’ উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বলল সে, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল।
‘না, ফেরেনি এখনও ও। ফিরলে জানাব।’
ফোন রেখে আবার সোফায় বসল শীলা। চোখ চকচক করছে। আধঘণ্টা পর আবার ফোন বাজল। ঝট্ করে রিসিভার তুলল শীলা, ‘হ্যাঁ,’ শব্দটা উচ্চারণ করল পরপর তিনবার, তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কোন্ হাসপাতাল?’ শেষে রিসিভার রেখে দৌড় দিল দরজার দিকে।
.
নরম, কোমল একটা হাত ওর কপালে বুলিয়ে দিচ্ছে কেউ। হাতটা ধরে ফেলল আর্থার, চোখ মেলার চেষ্টা করল। পারল না। শুনতে পেল একটা নারী কণ্ঠ তাকে বলছে সব ঠিক আছে। আঙুলগুলো শিশুর মত ধরে থাকল আর্থার। হঠাৎ টের পেল সুই ঢোকানো হচ্ছে তার শরীরে। আঁধার হয়ে এল আর্থারের দুনিয়া।
তালুতে দপদপে ব্যথা নিয়ে আবার জেগে উঠল আর্থার। ঘেমে নেয়ে গেছে একেবারে। সেই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নটা আবার দেখেছে। চোখ পিটপিট করল। কি হয়েছে মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়ছে না। মুখে হাত দিল ও। ব্যান্ডেজ বাঁধা মুখে। মাথায়ও। ধীরে ধীরে উঠে বসল বিছানায়। মাথাটা ঘুরে উঠল খুব, আবার শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর বিছানা থেকে পা নামাল আর্থার, দরজার ধারে যাবে। কিন্তু শরীর টলছে। যেতে পারল না। বেডসাইড টেবিল থেকে একটা আয়না তুলে নিল। ভয়ে ভয়ে তাকাল ওদিকে। না, ভয়ের কিছু নেই। নিজের মুখটাকেই দেখতে পাচ্ছে সে। ব্যান্ডেজের নিচে ফোলা মুখ।
‘আর্থার!’
মুখ তুলে চাইল আর্থার। শীলা। দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়। ওকে দেখে হাসল, কাছে এসে হালকা ভাবে ঠোঁট ছোঁয়াল মুখে। তারপর ওকে শুইয়ে দিল বিছানায়।
‘কি হয়েছিল আমার?’ জিজ্ঞেস করল আর্থার।
‘তুমি অ্যাক্সিডেন্ট করেছিলে। রক্তাক্ত অবস্থায় ওরা তোমাকে উদ্ধার করে। তুমি-‘
‘ওরা বাচ্চাটাকে উদ্ধার করতে পেরেছে?’
‘তুমি হ্যালুসিনেশনে ভুগছ,’ শিশু ভোলানো মিষ্টি হাসল শীলা। ‘অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। মাথায় যা লেগেছে তোমার!’
কপালে হাত বুলিয়ে দিল শীলা, ওর হাতটা ধরে রইল আর্থার। টুকরো টুকরো স্মৃতি মনে পড়তে গিয়েও পড়ছে না। ‘এখন ঘুমাও,’ বলল শীলা।
চোখ বুজল আর্থার। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ মেলে দেখল বেশ্যাদের মত নিতম্ব দুলিয়ে চলে যাচ্ছে শীলা। শীলা একবারও জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছে আর্থার। যেন তাতে তার কিছু আসে যায় না। আবার চোখ বুজল আর্থার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একটু পর ঘুমিয়ে পড়ল।
আবার অশুভ সঙ্কেত – ১৫
পনেরো
জীবনে এই প্রথম অ্যামব্যাসাডরের সেক্রেটারির জবান বন্ধ হয়ে গেল। তার বসকে ব্যাগ গোছাতে দেখে হাঁ হয়ে গেছে মেয়েটা, মাথা চুলকাচ্ছে, অস্থির ভঙ্গিতে এক পায়ের ওপর শরীরের ভর চাপাচ্ছে, আবার জায়গা বদল করছে।
‘রোমে কেন?’ শেষে জিজ্ঞেস করল সে। ‘বিশেষ করে এ সময়ে?’
টুথপেস্ট, রেজর, ডেন্টাল ফ্লস,’ জবাবে বলল ফ্রেডরিক আর্থার। ‘আজ বিকেলে হোয়াইট হল-এ যাবার কথা আপনার। আপনি এভাবে-’
‘মার্টিনকে পাঠিয়ে দিয়ো,’ ফস করে ব্যাগের জিপার বন্ধ করল আর্থার। ‘এটা স্রেফ একটা অবজারভেশন জব। আমার অনুপস্থিতির যে কোন একটা কারণ দেখিও। তুমি তো এটা ভালই পারো। আমি কাল লাঞ্চের মধ্যে ফিরে আসব।’.
সেক্রেটারি রাগ রাগ গলায় বলল, ‘কিন্তু কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন সেটা অন্তত বলে যান।’
