মৃদু মাথা দোলাল আর্থার, টেপটা বের করে জিমের হাতে দিল।
‘থ্যাঙ্কিউ অ্যানিওয়ে। আসার জন্যে ধন্যবাদ।’ দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে জিমের সাথে হাত মেলাল সে। ‘ঘটনাটা কাউকে বলার দরকার নেই কেমন? স্রেফ অলস একটা কৌতূহল ছিল আমার।’
জিম ঠোঁটে একটা আঙুল রেখে হাসল।
‘আপনার জন্যে যদি কিছু করার থাকে…’ বলল আর্থার।
‘আমরা একটা সিরিজ করার চিন্তাভাবনা করছি, স্যার। ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সমাজ জীবন-’
‘ঠিক আছে,’ ওকে বাধা দিল আর্থার। ‘আমার সেক্রেটারির সাথে কথা বলুন। একটা সময় বের করা যাবে।’
জিম থ্রপলটন এমব্যাসী থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিল। বাড়ি ফেরার পথে রাষ্ট্রদূতের সাথে আলাপচারিতার বিষয়টা নিয়েই ভাবল। বিচ্ছিন্ন এবং অদ্ভুত মনে হয়েছে তার গোটা ব্যাপার। সন্দেহ হলো আর্থার গোপনে কিছু করছেন কি না।
.
বিকেল পর্যন্ত টানা কাজ করল ফ্রেডরিক আর্থার। সেক্রেটারি চলে যাবার পর ফোন করল বাড়িতে।
বাসায় নেই শীলা। খুশি হলো আর্থার। স্ত্রীকে মিথ্যা কথা বলতে হলো না। অ্যানসারিং মেশিনে মেসেজ রেখে গেল-ফিরতে দেরি হবে, সাড়ে ন’টা বেজে যেতে পারে। তারপর বেরিয়ে পড়ল অফিস থেকে।
শেষ বিকেলের জ্যামে আটকা পড়ে একটা ঘণ্টা নষ্ট হলো আর্থারের। আরও চল্লিশ মিনিট লাগল গলি-উপগলি ধরে বার্কশায়ারে পৌঁছুতে। রাস্তায় দু’বার থামল সে, ম্যাপ দেখল। ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মত দু’মুখো একটা রাস্তায় পৌছুল, তারপর মোড় নিল বামে। এটা একটা সরু, মেঠো রাস্তা। সারের গন্ধ ধাক্কা মারল নাকে। রাস্তাটা জনশূন্য। একটা খামার বাড়িও চোখে পড়ল না। অডোমিটার চেক করল ও। ডি কার্লোর বর্ণনা অনুসারে আসল জায়গায় চলে আসার কথা ওর।
একটা বাঁক ঘুরতেই সামনে একটা পাব দেখতে পেল আর্থার। আলো জ্বলছে। ছোট উঠনে গাড়ি থামাল সে। ওটা পার্কিং লট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গাড়ি থেকে নামল আর্থার। মুখ তুলে চাইল আকাশের দিকে। হালকা মেঘ জমেছে।
পাবে ঢুকল আর্থার। ছোট পাব। আর দশটা গ্রাম্য শুঁড়িখানার মতই, নিচু ছাত, মোটা, কালো খিলান। গরম পড়েছে। তবু কাঠের ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে।
বার ম্যান ওরফে শুঁড়িখানার মালিক মোটাসোটা, ভালুকের মত পেট, ঠোঁটের ওপর মস্ত গোঁফ, লাল টকটকে গাল। আর্থারকে দেখে ঝলমলে চোখে তাকাল।
আর্থার ব্রান্ডির অর্ডার দিল।
‘আমেরিকান, স্যার?’
‘না, শুধু সোডা।’
হেসে ফেলল শুড়িখানার মালিক। ‘না, স্যার। জিজ্ঞেস করেছি আপনি আমেরিকান কিনা।’
‘ও, হ্যাঁ।’
চারপাশে চোখ বোলাল আর্থার। বার এবং আগুনের ধারে কয়েকজন গ্রামবাসী বসে আছে। একজন তার দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করল। প্রত্যুত্তরে হাসল আর্থার।
ঘরে তৈরি ব্রান্ডি এনে দিল মোটকু আর্থারকে। আর্থার ভেবেছিল খেজুরে আলাপ জুড়ে দেবে লোকটা। গ্রামের শুঁড়িখানায় এমনটাই হয়। আমেরিকান পেলে নানা গপপো শুরু করে দেয়। তবে এ লোকটা ওরকম নয়।
তৃতীয় গ্লাস ব্রান্ডি পান করার পর শুঁড়িখানার মালিককে প্রশ্নটা করল আর্থার। ‘ও, হ্যাঁ,’ বলল সে। ‘এদিকে জিপসীদের আনাগোনা প্রচুর। সবগুলো শয়তানের হাড্ডি।
‘অদ্ভুত কোন জন্মের কথা শুনেছেন আপনি এখানে? বিশ বছর আগে?’
হাসল লোকটা। ‘জিপসীদের সবার জন্মই অদ্ভুত। কিন্তু আপনি ঠিক কি বলতে চাইছেন বুঝতে পারলাম না, স্যার।’
শ্রাগ করল আর্থার। জিপসীদের অনেক অদ্ভুত জন্মের কথা শুনেছি কিনা তাই আর কি।’
‘আপনি সাংবাদিক, স্যার?’
‘না। স্রেফ ট্যুরিস্ট।’
মাথা ঝাঁকিয়ে সরে গেল শুঁড়িখানার মালিক আরেক খদ্দেরের কাছে। ড্রিঙ্কটা শেষ করল আর্থার, উঠে পড়ল। নিজের ওপর রাগ লাগছে খুব। খামোকা সময় নষ্ট। এখানে কি পাবার আশায় এসেছে সে? আর্থার ঠিক করল জায়গাটা এক চক্কর দেখে বাড়ি ফিরে যাবে।
গ্রামবাসীদের শুভরাত্রি জানিয়ে পাব থেকে বেরিয়ে এল আর্থার। ওরা ওকে যেতে দেখল। শুঁড়িখানার মালিক বার ফ্ল্যাপ তুলে ধাক্কা মেরে হাফ-ডোরটা খুলল। তারপর সরে দাঁড়াল। খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল তার কুকুরটা। অনুসরণ করল আর্থারকে। মাথা তুলে বাতাসের গন্ধ শুঁকল, তাকাল মেঘের দিকে, তারপর নিঃশব্দে এগোল, মাটিতে তার পায়ের কোন ছাপ পড়ল না।
.
একটা জলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফ্রেডরিক আর্থার। জলায় থকথকে কাদা আর আগাছা ছাড়া কিছু নেই। স্যাঁতসেঁতে একটা গন্ধ ঢুকে পড়ছে ফুসফুসে। শুধু শুধু সন্ধেটা নষ্ট করার জন্যে নিজেকে আবার গালি দিল আর্থার। তারপর ঘুরল।
পাবটাকে দেখা যাচ্ছে না। কপালে ভাঁজ পড়ল আর্থারের। খানিক এগোবার পর ছাতের কাঠামোটা নজরে এল। ওরা আলো নিভিয়ে দিয়েছে। ঘড়ি দেখল আর্থার। এত তাড়াতাড়ি? শ্রাগ করল সে। এ নিয়ে তার মাথা না ঘামালেও চলবে। সে পা বাড়াল গাড়ির দিকে। হঠাৎ হিম বাতাস বইতে শুরু করল। গায়ে কাঁটা দিল আর্থারের।
গাড়ির ভেতর ঢুকল আর্থার। সারের গন্ধটা পাচ্ছে আবার। এবার যেন ভেতর থেকে আসছে। ইঞ্জিন চালাল আর্থার, ফ্যানের সুইচ অন করল। ঘুরল না ফ্যান। লাল বাতিটা জানান দিল বৈদ্যুতিক সমস্যা হয়েছে। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে উঠল আর্থার। ভাবল, ফ্যান নষ্ট হয়েছে হোক, এখন ভালয় ভালয় বাড়ি ফিরতে পারলেই বাঁচি।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে, টপাস করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল উইন্ডশিল্ডে। গ্লাসে, ওয়াইপারের গায়ে জমে আছে মরা পোকা। উইন্ডশিল্ড ওয়াশার চালু করতে গিয়ে দেখল ওটাও নষ্ট। এদিকে গন্ধটা বেড়েই চলেছে। জানালা খোলার জন্যে বোতাম টিপল আর্থার। খুলল না। মনে মনে গালি দিল ও। জুতোর ভেতর মুঠো করল পায়ের আঙুল, স্যাঁতসেঁতে ভাবটা যেন গোড়ালি বেয়ে উঠে আসছে।
