‘মাধ্যাকর্ষণের কারণে, না?’
‘ঠিক ধরেছেন,’ নিজেকে প্রতারিত মনে হচ্ছে ওয়াল্টারের। মেয়েটা যখন চাকা দেখাতে চাইল সে বুঝতে পারেনি সত্যি স্টুয়ার্ডেসটা তাকে এসব বিশ্রী জিনিস দেখাতে নিয়ে আসবে।
‘ঘটনাটা এখুনি ঘটবে,’ বলল মেয়েটা ওয়াল্টারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে। এয়ারক্রাফটের পেটের ভেতরের দরজা খুলে গেল, হিসিয়ে উঠল হাইড্রলিক। দমকা হাওয়ার ঝাপটায় ওয়াল্টারের শার্ট পতপত করে উড়তে লাগল, বাতাসের চাপে বন্ধ হয়ে আসতে চাইল নিশ্বাস।
‘দেখছেন, চাকাগুলো নড়তে শুরু করেছে। তবে ভয়ের কিছু নেই।’
ইঞ্জিনের কান ফাটানো শব্দে আর বাতাসের গর্জনে মেয়েটার গলা প্রায় শুনতেই পেল না ওয়াল্টার। নিচে তাকাল ও। চাকার ফাঁক দিয়ে নিউ ইয়র্কের শহরতলি, বাড়ি-ঘর দেখা গেল।
আবার শিউরে উঠল ওয়াল্টার, ধরে ফেলল হ্যাচের কিনারা। পিছিয়ে আসতে শুরু করেছে, মেয়েটার হাতের স্পর্শ পেল কাঁধে। মনে মনে হাসল ওয়াল্টার। অদ্ভুত একটা সময় নির্বাচন করেছে মেয়েটা…পরক্ষণে ধাক্কা খেল সে, ছিটকে গেল সামনে। গলায় চাবুক কষাল বাতাস, হাত জোড়া বাড়ি খেল চাকায়, খামচে ধরল খাঁজ, মুখটা খুব জোরে ঘষা লাগল রাবার টায়ারের সাথে, ব্যথায় ককিয়ে উঠল ওয়ালটার, একটা পা হ্যাচের সাথে আটকে গেছে। টায়ার ধরে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে ক্লেয়ার, হাসছে। হাসতে হাসতে বন্ধ করে দিল হ্যাচ।
হামাগুড়ি দিয়ে সামনে বাড়ল ওয়াল্টার, খামচে ধরে আছে রাবার। আর এগোতে পারল না। নাকটা ঠেকে আছে টায়ারের গভীর খাঁজে, গোবরের গন্ধ আসছে।
টেকঅফের সময় নিশ্চয়ই চাকায় গোবর লেগেছিল। গুলিয়ে উঠল গা।
সামনে-পেছনে কোথাও যেতে পারছে না ওয়াল্টার। ভয়ানক আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। বাতাসের ধাক্কায় একটা চোখ বুজে গেছে, আরেকটা চোখ দিয়ে দরদর ধারায় পানি পড়ছে। নিচে তাকাতে কেনেডি এয়ারপোর্ট এক ঝলক দেখতে পেল ওয়াল্টার। ওর স্ত্রী বলেছে এয়ারপোর্টে থাকবে সে। ওয়াল্টারকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে। এ মুহূর্তে হয়তো সে অবজার্ভেশন এলাকায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে, খুঁজছে স্বামীর প্লেন।
টায়ারের সাথে মুখ ঘষল ওয়াল্টার। মনে পড়ে গেল ক্লেয়ার বলেছিল কখনও কখনও এত বেগে ল্যান্ড করে প্লেন যে টায়ারের এক ইঞ্চির মত রাবার পুড়ে যায়।
ওয়াল্টারের দৃষ্টি হঠাৎ স্বচ্ছ হয়ে এল। রানওয়ে দেখতে পাচ্ছে। নামতে যাচ্ছে প্লেন। আস্তে আস্তে, তীব্র যন্ত্রণা সয়ে মাথা তুলল সে। তারপর চিৎকার দিল।
.
ডানার ওপর, জানালার ধারে ছোট্ট রকিব তার মা’র সাথে বসেছিল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল সে। এক স্টুয়ার্ডেস এগিয়ে এল ওদের দিকে। হেসে জানতে চাইল কি হয়েছে।
‘জীবনে এই প্রথম প্লেনে উঠেছে ও,’ বললেন রকিবের মা।
‘আবার,’ শিউরে উঠল রকিব।
‘আমার বাচ্চাটা বলছে ও শুনেছে কে নাকি চিৎকার করছে,’ ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে বললেন মিসেস হাসান। ‘ওকে বলেছি ওটা বাতাসের শব্দ।’
‘মা ঠিকই বলেছেন,’ রকিবের থুতনি নেড়ে দিল স্টুয়ার্ডেস আদর করে। ‘আমরা ঘণ্টায় দুশো মাইল বেগে উড়ে চলেছি। আর প্লেন নামার সময় বাতাসে অনেক অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়।’
রকিব কিছু বলল না, জানালায় খাড়া করে রাখল কান। প্লেন রানওয়েতে ল্যান্ড করতে যাচ্ছে, চোখ বুজে কানে আঙুল ঢুকিয়ে রাখল ও। ভয়ঙ্কর চিৎকারটা আর শুনতে চায় না। দুম করে শব্দ হলো, কংক্রিটের সাথে ঘষা খেয়েছে রাবার। একটু পর কমে এল এঞ্জিনের শব্দ, তারপর শুধু মৃদু গুঞ্জন তুলল টার্মিনাল গেটের দিকে এগোবার সময়।
প্লেন না থামা পর্যন্ত চোখ খুলল না রকিব। চোখ মেলে দেখল এক মেকানিক চাকার দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তীব্র আতঙ্কে মুখের সমস্ত রক্ত সরে গেছে তার, চাকার সাথে দলা-পাকানো মাংসের টুকরোগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই কিছুক্ষণ আগেও ওটা ছিল নিকোলাস ওয়াল্টার। ‘চিৎকারটা এখন থেমে গেছে,’ মা’র দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল রকিব।
আবার অশুভ সঙ্কেত – ১০
দশ
লিফটে ফ্রেডরিক আর্থারের সাথে দুই তরুণ উঠল। তাদেরকে মৃদু গলায় ‘শুভ সন্ধ্যা’ বলল রাষ্ট্রদূত। নিজের চিন্তায় বুঁদ হয়ে ছিল বলে শুরুতে ওদের কথা শুনতে পায়নি আর্থার। সচেতন হয়ে উঠল ‘শিকাগো’ শব্দটা শুনে। দুই তরুণ শিকাগোর এক প্লেন যাত্রীর করুণ মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করছে। প্লেনের চাকার নিচে পড়ে চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে গেছে বেচারা, বলছিল একজন তার সঙ্গীকে। ‘চিন্তা করতে পারো কেনেডি এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করার সময় প্লেন টানা দু’মাইল দৌড়েছে। আর বেচারা যাত্রী চাকার সাথে পিষতে পিষতে ভর্তা হয়ে গেছে,’ শিউরে উঠল এক তরুণ।
‘লোকটা কি করত?’ জিজ্ঞেস করল আর্থার।
‘শুনেছি অ্যান্টিক ডিলার ছিল,’ জবাব দিল তরুণ। ‘পেপারে বেরিয়েছে খবরটা। নিউজেও দেখিয়েছে।
‘তার নাম কি ওয়াল্টার?’
‘জ্বী। জ্বী,’ তরুণ বিস্মিত চোখে তাকাল আর্থারের দিকে। ‘আপনি তাকে চিনতেন নাকি, স্যার?’
খুলে গেল লিফটের দরজা, ডানে-বামে মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল আর্থার।
.
সে সন্ধ্যায় ফ্রেডরিক আর্থারের মন জুড়ে আচ্ছন্ন হয়ে রইল নিকোলাস ওয়াল্টার। চেষ্টা করল ভুলে থাকতে। কিন্তু চেহারাটা যেন মগজে ছাপ মেরে আছে, সরু গলাটা বারবার বাজছে কানে। ডিনারে কিছুই খেতে পারল না আর্থার। শীলার প্রশ্নের হুঁ হাঁ জবাব দিয়ে গেল। টিভিতে ওয়াল্টারের খবর দেখাল সবশেষে। সংবাদ পাঠক বললেন দুর্ঘটনা কিভাবে ঘটল প্যান অ্যাম তা তদন্ত করে দেখছে।
