কয়েকটা খালি রক্তের ব্যাগ দেখল আনোয়ার। দেরি না করে দুটো রক্তের ব্যাগ পুরে ফেলল নিজের ব্যাগে।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন রফিক সাদি, ‘এসব ময়লা জিনিস ব্যাগে ভরছ কেন?’
কিছু না বলে হাসল আনোয়ার।
বাইরে থেকে দেখা যায় না কবরস্থানটা। ভিতরে ঢুকে ঘুরে দেখল ওরা। থমথমে পরিবেশ, কেমন যেন ভয়ের অনুভূতি হবে যে-কারও।
আনোয়ার সাইনবোর্ডে দেখল: ‘পারিবারিক কবরস্থান।
কবরস্থান ছাড়িয়ে একটু দূরে যাওয়ার পর আনোয়ার দেখতে পেল এক মাঠ। এক মাথায় ছোটখাট মঞ্চের মত জায়গা। ঠিক এমন সময় রাশভারী গলায় কেউ বলল, ‘আপনারা এখানে কী করছেন?’
রফিক সাদি দেখলেন, তাঁদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে সেই বুড়ো চাকরটা। হাসিমুখে বললেন রফিক সাদি, ‘আসলে সোলেমান গাজি সাহেবের কাছে এসেছি। ভাবলাম, বাড়িতে ঢোকার আগে জায়গাটা একটু ঘুরে দেখি।’
‘কাজটা ঠিক করেননি। এটা কবরস্থান এলাকা। পবিত্র জায়গা। অনুমতি না নিয়ে এখানে ঘোরাঘুরি করে অন্যায় করেছেন। চলেন, বাড়ির ভিতরে চলেন।’
.
আনোয়ার আর রফিক সাদি দোতলার ঘরে বসে আছে। সামনে বসে আছেন সোলেমান গাজি ও তাঁর স্ত্রী। আগের দিনের মত ঘোরাঘুরি করছে জয়ও। আজও মাথাটা একদিকে কাত হয়ে আছে, মুখ দিয়ে ঝরছে লালা। আজকে সোলেমান গাজির চোখ দিয়ে যেন বের হচ্ছে রক্ত। চেঁচিয়ে বললেন, ‘আপনি আবার কী মনে করে? আর বাড়ির পিছনে ঘুরঘুর করছিলেন কেন?’
‘আসলে বিয়ের বিষয়টা ফাইনাল করতে এসেছিলাম। আমার ভাগ্নে বাড়ির আশপাশে একটু ঘুরে দেখতে চাইছিল, তাই…’
‘আবার ফাইনালের কী আছে? বললাম না একদিন মেয়েকে নিয়ে আসবেন, বিয়ে দিয়ে দেব।’ কঠোর গলায় সোলেমান গাজি বললেন, ‘না, আপনাদের সাথে পোষাবে না। আপনার মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে দেব না।’
মুখে একটা কষ্টের ছাপ ফুটিয়ে তুললেও মনে-মনে খুশি হলেন রফিক সাদি। বললেন, ‘আমরা কিছু অন্যায় করেছি?’
‘আপনাদেরকে আমার পছন্দ হয়নি, একটুও না। আর আপনি গলায় এসব কী লাগিয়েছেন, খুব বিশ্রী।’ সোলেমান গাজি নীচের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন। মনে হচ্ছে রফিক সাদির সাথে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করছেন।
মন দিয়ে জয়কে লক্ষ্য করছে আনোয়ার, মনে অনেক প্রশ্ন। জয়কে দেখে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছে। ইশ্, আরেকটু সময় যদি কবরস্থানটা ঘুরে দেখা যেত।
আনোয়ারকে পেয়ে কি না কে জানে, রফিক সাদি আজকে অনেক বেশি নিশ্চিন্ত বোধ করছেন। মনে কোনও ভয় দানা বাঁধছে না। তিনি স্পষ্ট গলায় বললেন, ‘আপনার ভাগ্নি কেমন আছে? কোথায় সে?’
ঘরের ভিতর যেন সবকিছু থমকে গেল।
সোলেমান গাজি চোখ সরু করে বললেন, ‘তাকে কী দরকার? সে নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছে। আপনারা আজ আসুন।’ এই কথাগুলোও মেঝের দিকে তাকিয়ে বললেন তিনি।
মুখ কালো করে উঠে পড়লেন রফিক সাদি। মনে-মনে বেশ প্রফুল্ল অনুভব করছেন।
হঠাৎ করে বলল আনোয়ার, ‘একটু বাথরুমে যাব। বাথরুমটা কোন্ দিকে?’
সোলেমান গাজির মুখ থমথমে হয়ে গেল। নিতান্ত অনিচ্ছায় বাথরুমটা দেখিয়ে দিলেন।
বাথরুমে যাওয়া আনোয়ারের উদ্দেশ্য নয়, একটু ঘুরে দেখবে চারপাশ। ধীর পায়ে বাথরুমের দিকে চলেছে আনোয়ার, দেখতে পেল পাশাপাশি পাঁচ-ছয়টা রুম। প্রতিটা রুমের দরজা বন্ধ করা। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে কিছু চুল। মেঝেতে লেপ্টে রয়েছে কালো কালি। ঘরে ধূপের গন্ধ। তীব্র আলোতেও অন্ধকার বলে মনে হচ্ছে ঘরগুলোকে।
বাথরুমে ঢুকে আনোয়ারের প্রচণ্ড বমি এল। মেঝেতে নিথর পড়ে আছে এক মেয়ে, কেশহীন মাথাটা বিচ্ছিন্ন, রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো শরীর। মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেল ও, আর তখনই অদৃশ্য হয়ে গেল মেয়েটা।
তা হলে কি সব চোখের ভুল?
কোথায় যেন মেয়েটাকে দেখেছে বলে মনে হচ্ছে ওর। মনে হতে লাগল, পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটা। যে-কোনও মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়বে আনোয়ারের উপর। চোখ বন্ধ করে ভাবতে চাইল সে, সব মিথ্যা, তাকে ভয় দেখাতে চাইছে কেউ।
নয়
ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছেন রফিক সাদি আর আনোয়ার। আগের মত সপ্রতিভ নয় আনোয়ার, কিছু নিয়ে গভীর চিন্তায় আছে সে। রফিক সাদি বললেন, ‘আমার মেয়েটাকে ওঁরা বউ হিসাবে গ্রহণ করতে রাজি নন। যাক, ভালই হলো। বেঁচে গেল আমার মেয়েটা।’
জবাব দিল না আনোয়ার।
‘কেন জানি মনে হচ্ছে অবসান হয়েছে আমার সব দুশ্চিন্তার, ভুলেও আর কোনও দিন ঝমঝম কুঠিতে পা দেব না।’
‘আমাকে ফার্মগেট নামিয়ে দেবেন,’ হুট করেই বলল আনোয়ার। তার কেন জানি মনে হচ্ছে রফিক সাদির মুখের হাসি থাকবে না।
রফিক সাদি বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই মহসিনের স্ত্রী করিমন এগিয়ে এল। চিন্তিতমুখে বলল, ‘মামণি একটা সুটকেস নিয়ে কোথায় যেন গেছেন। যাওয়ার আগে আপনাকে এই চিঠিটা দিয়ে গেছেন।’
রফিক সাদির মনে হলো সোজাভাবে দাঁড়াতে পারছেন না তিনি।
কাঁপা হাতে খুললেন চিঠিখানা।
বাবা,
আমি ঝমঝম কুঠিতে জয়ের কাছে চলে যাচ্ছি। সত্যি বলতে, কাজি অফিসে গিয়ে বেশ আগেই আমরা বিয়েটা সেরে ফেলেছি। তোমার সম্মানের কথা চিন্তা করে ভেবেছিলাম, দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়েটা আবার হোক। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি, জয় আর জয়ের মা-বাবার সাথে তুমি দুর্ব্যবহার করেছ। তাঁরা কেউ তোমাকে পছন্দ করেননি। তাই জয় আমাকে ওর বাসায় চলে যেতে বলেছে। জয় ডাকলে আমি তো না গিয়ে পারি না, বাবা। আর তুমি অন্ধ, তাই হয়তো দেখতে পাওনি যে, আমি মা হতে চলেছি। আমার শরীর ভারী হয়ে যাচ্ছে। এজন্য বাইরে বের হওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলাম। মহসিন চাচা ও করিমন চাচী কিন্তু বিষয়টা টের পেয়েছিল। হয়তো ভয়ে তোমাকে বলতে পারেনি। আমি আমার স্বামী, সন্তান নিয়ে সুখেই থাকব, বাবা। তুমি আর আমাদের উৎপাত করতে এসো না।’
