তাহলে তুইও চল সাথে।
ওরে বাবা! রাস্তায় আমি কিছুতেই যাব না। আঁতকে উঠল লিন্ডা।
বেরুনো ঠিকও হবে না, ওর সাথে একমত হলো শ্যারন। ভয় নেই। এখানে কোন সমস্যা হবে না। আমি যাবার পরে দরজাটা বন্ধ করে দিবি। বলে দরজা খুলল শ্যারন এবং আক্রান্ত হলো।
কে জানে কখন থেকে ওরা ওঁৎ পেতে ছিল দরজার পাশে। দরজায় কান লাগিয়ে হয়তো সব শুনেছে। অপেক্ষায় ছিল কখন শ্যারন দরজা খুলবে। লিভার কথাই ঠিক ওরা দেখে ফেলেছিল ওকে। অনুসরণ করে চলে এসেছে ওখানে।
কানের ঠিক নিচে রবারের শক্ত ডাণ্ডার বাড়িটা লাগল শ্যারনের, গলা দিয়ে বিদঘুটে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল, হুড়মুড় করে পড়ে গেল মেঝেতে। বিদ্যুৎগতিতে ভেতরে ঢুকে পড়ল ব্রানস্টোন এবং ডেভিস। ওদেরকে দেখে ভীষণ আঁতকে উঠল লিন্ডা, ঝট করে উঠে দাঁড়াল সোফা থেকে। এক লাফে ওর পাশে পৌঁছে গেল হালকা-পাতলা ডেভিস, চকচকে একটা ক্ষুর গলায় চেপে ধরে হিসিয়ে উঠল, আওয়াজ দিয়েছ কি এক পোচে কল্লা নামিয়ে দেব।
অবশ্য চিৎকার করলেও লিন্ডার আর্তনাদ কেউ শুনতে পেত কিনা সন্দেহ। কারণ আশপাশে দুএক মাইলের মধ্যে আর বাড়ি-ঘর নেই, শুধু স্লোনের ল্যাবরেটরি ছাড়া। নির্জনতা পছন্দ করে লেখিকা শ্যারন ফেয়ারচাইল্ড। তাই লোকালয় থেকে এত দূরের একটা বাড়ি বেছে নিয়েছে লেখালেখির জন্য। লোকজনের হৈ-হট্টগোল পছন্দ করে না বলে স্লোনও শহরতলির শেষ মাথায় ওর ল্যাবরেটরি বানিয়েছে।
ড. স্নোন রেগে বোম হয়ে আছেন, দুষ্ট মেয়েকে বোঝাবার ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল ব্রানস্টোন। এখন চলো। হাত ধরে টান দিল সে।
শ্যারন ফেয়ারচাইল্ডের হাত-পা বেঁধে, মুখে কাপড় খুঁজে ওরা যখন বাড়ির বাইরে এসেছে, তখন পুবাকাশ একটু একটু ফর্সা হতে শুরু করেছে। দূরে অপেক্ষমাণ গাড়িতে ওরা ঠেলতে ঠেলতে তুলল লিডাকে। যন্ত্রচালিত পুতুলের মত গাড়িতে উঠে বসল লিন্ডা, মাথাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে আছে, কিছুই ভাবতে পারছে না সে, মেনে নিয়েছে অমোঘ নিয়তিকে। তাই সারা রাস্তা সম্মোহিতের মত বসে থাকল সে, ফিরতি পথে একটা কথাও বলল না। তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো পুরানো হান্টিং লজের সেই ল্যাবরেটরিতে।
স্নোন লিন্ডাকে দেখে আশ্চর্য শান্ত গলায় বলল, আমাদের অনেক ঝামেলায় ফেলে দিয়েছ তুমি। পুলিশ-টুলিশ এলে ওদের উৎকট প্রশ্নের জবাবে এখন আমাদের আগেই সাবধান হয়ে যেতে হবে। যদিও তোমার নিয়তি কেউ খাতে পারবে না।
লিন্ডা স্লোনের কথা শুনছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। তার চেহারা শান্ত, ভয় বা আশঙ্কার কোন ভাব ফুটে নেই। যেন সমস্ত আবেগ, অনুভূতি শুষে নেয়া হয়েছে। ভয়, আতঙ্ক, আশা-আকাঙ্ক্ষা সব কিছুর ঊর্ধ্বে এখন লিন্ডা রেনল্ডস।
স্নোনের নির্দেশে তার সঙ্গীরা কাজ শুরু করে দিল। ব্যাকটেরিয়ার অনুপ্রবেশ যাতে ঘটতে না পারে সে জন্য আগেভাগে ঘরের তাপমাত্রা কমিয়ে রাখা হয়েছে। এখন চুড়ান্ত প্রসেসিং-এর আগে বাকি কাজগুলো সেরে নিতে হবে।
ওরা জামা-কাপড় খুলে নগ্ন করল লিভাকে, মেয়েটা পাথর হয়ে দাড়িয়ে রইল, সামান্য ধস্তাধস্তি পর্যন্ত করল না। ওর লম্বা সুন্দর চুলগুলো ঘেঁটে দেয়া হলো, কামানো হলো মাথা। তারপর অত্যন্ত সাবধানে শরীরের অন্যান্য সমস্ত অবাঞ্ছিত লোমও চেঁছে ফেলা হলো ক্ষুর দিয়ে। তারপর স্টিম বাথ দেয়া হলো লিন্ডাকে। প্রতিটি লোমকূপের গোড়া থেকে দূর করা হলো ধূলিকণা। সবশেষে শরীর শুকিয়ে ফেলা হলো পরম বাষ্প চালিয়ে।
গোটা ব্যাপারটা তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করল স্লোন। সন্তুষ্ট হয়ে মেয়েটাকে ঠাণ্ডা স্টেরিলাইজড় টেবিলে শুইয়ে দিল, হাইপডারমিক সিরিঞ্জ হাতে নিয়ে দাঁড়াল পাশে। নিষ্প্রাণ চোখে ওকে দেখল লিন্ডা।
অবশেষে সময় হয়েছে, উল্লাসের সাথে ঘোষণা করল স্নোন। সুঁইর সামান্য একটা গুঁতো ছাড়া আর কোন ব্যথা পাবে না তুমি! ইনজেকশনটা দেয়ার পরে দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসবে তোমার কাছে, যদিও খানিক পরে বুঝতে পারবে তোমাকে হিমায়িত করতে চলেছি আমরা। এরপর সীমাহীন নীরবতা ছাড়া আর কিছুই টের পাবে না।
ফাঁকা চোখে তাকিয়ে রইল লিন্ডা ছাদের দিকে, পুট করে ওর কোমল বাহুতে সুই ফোটাল স্লোন।
পরের কয়েক ঘণ্টা লিন্ডাকে নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকল ওরা। গা থেকে সমস্ত রক্ত শুষে নেয়া হলো, পরিবর্তে গ্ল্যাকো-স্যালাইন সল্যুশন ঢোকানো হলো। এ জিনিসটা প্রচণ্ড ঠাণ্ডাতেও জমাট বাঁধবে না বা শরীরের কোন অঙ্গের ক্ষতি করবে না। লিন্ডাকে উজ্জ্বল সবুজ রঙের একটা ধাতব ক্যানিস্টারে শোয়ানো হলো। সারা শরীরে পেচানো হলো তার। তারগুলো ল্যাবরেটরির নানা যন্ত্রপাতির সাথে আটকানো। এটা আসলে একটা বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রস্তুত কফিন। কয়েকটা সুইচ টিপতেই ক্যানিস্টারের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে আসতে লাগল।
বন্ধ করে দাও, নির্দেশ দিল স্লোন। ঢাকনি নামিয়ে সীল করে দেয়া হলো। তারপর ক্যানিস্টারটা ব্রানস্টোন এবং ডেভিস টেনে নিয়ে গেল দেয়ালের কাছে। দেয়ালটা আগেই খুঁড়ে গর্ত করে রাখা হয়েছে, ভেতরে ক্যানিস্টারটা বসিয়ে দিল ওর। তারপর দ্রুত হাতে ফাঁকা দেয়াল ভরাট করে ফেলল ইট আর বালু দিয়ে।
স্নোন শেষবারের মত তাকাল দেয়ালের f, ঘুরল সিঁড়ি ঘরের দিকে। ওদিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বিড়বিড় করে যে জেকেই শোনাল, এখন তুমি আমাকে ঘৃণা করছ, মাইডিয়ার, কিন্তু একশো বছর পরে তোমার অনুভূতিটা অন্যরকমও হতে পারে।
