ব্রানস্টোন চলে যাবার পরে, দুরু দুরু বুকে কাঠের গোঁজটা টেনে খুলল লিভা, মনে মনে প্রার্থনা করল গর্তের মধ্যে আগে ঢুকিয়ে রাখা ছোট্ট কাঠের টুকরোটা যেন তালটিাকে বন্ধ হতে না দেয়। আনন্দে ফুপিয়ে উঠল দরজাটা খুলে যেতে। কাজ হয়েছে। সাবধানে পা রাখল সে এবার প্যাসেজে, কাঠের টুকরোটা হাতে নিয়েছে আগেই, তারপর বন্ধ করল দরজা। পা টিপে টিপে এগোল সিঁড়ির দিকে, সিঁড়ির মাথায় দরজা খুলে উঁকি দিল। মিটমিটে আলো জ্বলছে হলঘরে। বাতাসটা ঠাণ্ডা আর স্যাঁতসেঁতে। মনে পড়ল এ বাড়িতে আসার প্রথম দিনটির কথা। সেদিনও গা হিম করা ঠাণ্ডা ছিল। সে যেন অনেক আগের কথা।
সদর দরজায় একটা গাড়ি আসার আওয়াজ পেল, কে যেন সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। চট করে সরে গেল লিন্ডা দরজার আড়াল থেকে, ডেভিস। হলঘর পার হয়ে দূরপ্রান্তের একটা দরজার দিকে এগোল সে!
পালাবার এটাই সুযোগ। না হলে এমন সুযোগ আর কোনদিন পাবে না ও। ভূতের মত নিঃশব্দ পায়ে হলঘরের দিকে এগোল লিন্ডা, দাঁড়িয়ে পড়ল দরজার সামনে। ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, শব্দ শোনা যাচ্ছে। ভাগ্য ভালই বলতে হবে, দরজার পাশে, একটা র্যাকে একটা রেইনকোট ঝুলছে। চট করে বর্ষাতিটা গায়ে। চাপাল। তারপর দরজা খুলে পা রাখল বাইরে।
চারদিকে নজর বুলিয়ে লিন্ডা বুঝতে পারল এমন বর্ষার রাতে, চেনে না জানে এমন দুর্গম একটা এলাকায়, ছুটে পালানোর চিন্তা বাতুলতা মাত্র। ওর জানা নেই আশ-পাশে আর কোন ঘর বাড়ি আছে কিনা। রাস্তায় বেরুলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে দিশা হারিয়ে ফেলবে। কে জানে ওরা কুকুর পোষে কিনা। তা হলে নিরাপদ কোন আশ্রয়ে যাবার আগেই ওরা ওকে ধরে ফেলবে। কপালে যা থাকে ভেবে এক দৌড়ে স্নোনের গাড়ির বুট খুলে ভেতরে বসে রইল লিন্ড।
খানিক পরে লোকজনের সাড়া পেল, গাড়ির দিকেই আসছে। এখন ওরা কোন কারণে গাড়ির বুট খুলে ফেললেই সে শেষ। গাড়ির পেছন দিয়ে কেউ একজন যাচ্ছে টের পেয়ে বন্ধ করে রাখল দম। দুপদাপ লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ড, ভয় হলো হার্টবিটের আওয়াজ শুনে ফেলবে লোকটা। লোকটা গাড়িতে উঠে বসল, দড়াম করে বন্ধ করল দরজা। গর্জন ছেড়ে চালু হয়ে গেল এঞ্জিন, চলতে শুরু করল, লিন্ডাকে যেন উদ্ধার করে নিয়ে চলল নরক থেকে। চোখে জল এসে গেল ওর। নীরবে কাঁদতে লাগল।
বুটের মধ্যে ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিল লিভা, গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। তবে কষ্টটাকে আমল দিল না। ভাবছিল স্নোন সাপার নিয়ে এসে যখন দেখবে সে পালিয়েছে, কিরকম প্রতিক্রিয়া হবে তার। রাগে উন্মাদ হয়ে উঠবে নিশ্চয়ই। সে কি সন্দেহ করতে পারে গাড়িতে চড়ে কেটে পড়েছে লিন্ডা? ব্রানস্টোন এবং ডেভিসের সাথে সে নির্ঘাত যোগাযোগ করবে, ফোন করবে গ্লাসগোর ল্যাবরেটরিতে। ওরা লিন্ডা পালিয়েছে শোনা মাত্র ফিরে আসবে হান্টিং লজে। কাজেই থামা মাত্র নেমে পড়তে হবে লিন্ডাকে।
কতক্ষণ ধরে গাড়ি চলছিল জানে না, তবে প্রায়ই অন্যান্য বাহনের হুস করে পাশ কেটে যাবার শব্দে বুঝতে পারছিল শহরে ঢুকে পড়েছে ওরা। ওরা গন্তব্যে না পৌঁছা পর্যন্ত কোথাও গাড়ি থামাবে বলে মনে হলো না। আরও অনেকক্ষণ গাড়ি চলার পারে থেমে গেল এক জায়গায়। লিন্ডা শুনল ব্রানস্টোন নামছে দরজা খুলে।
তুমি এগোও, ডেভিসের গলা শোনা গেল। আমি গাড়িটা পার্ক করে আসছি এখুনি।
শঙ্কিত হয়ে উঠল লিন্ডা, ব্রামস্টোন ল্যাবরেটরিতে ঢোকামাত্র ওর খবর পেয়ে যেতে পারে। এদিকে গা; ঘুরিয়ে পার্ক করল ডেভিস, থেমে গেল এঞ্জিনের শব্দ, টের পেল নামছে সে। গুনে গুনে দশ সেকেন্ড অপেক্ষা করল সে, তারপর ধাক্কা মেরে বুট খুলল, নেমেই দিল দৌড়। কে যেন ওর নাম ধরে ডাক দিল। কিন্তু পেছন ফেরার সাহস পেল
ও। কারও সাহায্য পাবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে ও, হঠাৎ একতলা বাড়িটা চোখে পড়ল। ছোট গেট টপকে ভেতরে ঢুকতে অসুবিধে হলো না। কলিংবেলে পাগলের মত চাপ দিতে লাগল ও। দরজা খুলে গেল। অবাক হয়ে দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওরই বান্ধবী শ্যারন ফেয়ারচাইল্ড।
লিন্ডার রোমাঞ্চকর, অবিশ্বাস্য গল্প শেষ হলো। লিভিংরুমের ফায়ারপ্লেসের আগুন প্রায় নিবু নিবু হয়ে এসেছে। পুরো গল্পটা মনোযোগের সাথে শুনেছে শ্যারন, কোন প্রশ্ন বা মন্তব্য করেনি। দেখল গল্প শেষ করার পরে বান্ধবীর চেহারায় ভয় এবং শঙ্কা ফুটে উঠেছে, নরক থেকে পালিয়ে আসার ভয়াবহ স্মৃতি নতুন করে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে গেছে ওকে।
গল্প শেষ করে মৃদু গলায় লিভা বলল, আমি কল্পনাও করিনি তোকে এখানে দেখব।
শ্যারন বলল, মাস দুয়েক আগে কটেজটা ভাড়া করেছি। নতুন একটা লেখায় হাত দিয়েছি। কিন্তু যাকগে ওসব। তুই এখন কি করবি?
জানি না কি করব, গুঙিয়ে উঠল লিন্ডা। ওরা হয়তো দেখেছে আমাকে এখানে আসতে, বাইরে অপেক্ষা করছে।
মনে হয় না। তবু আমরা কোন ঝুঁকি নেব না। আমি এখুনি পুলিশকে ফোন করছি। ওরা এসে পড়লে আর ভয় নেই।
শ্যারনকে গায়ে কোট চাপাতে দেখে সভয়ে জিজ্ঞেস করল লিন্ডা, কোথায় যাচ্ছিস?
ফোন করতে। আমার ফোনটা নষ্ট। রাস্তার ধারে একটা ফোন বক্স আছে। পাঁচ মিনিটের বেশি লাগবে না।
আমাকে একা রেখে যাবি? আর্তনাদ করে উঠল লিন্ডা।
