[মূল: উইলিয়াম সিনক্লেয়ার-এর দ্য হরিফাইং এক্সপেরিমেন্টস অভ ড. জেসন স্লোন।]
ঘৃণা
এক শিশুদের আমি ঘৃণা করি।
ওদের কষ্ট দিতে ভাল লাগে আমার। ভাল লাগে গায়ে আগুনের ছ্যাকা দিতে।
আমাকে পারভার্ট বলতে পারেন আপনারা। পাগল বললেও কিছু এসে যাবে। কিন্তু খবরদার, বেঁটে বামুন বলে কখনও খেপাবেন না। তা হলে খবর করে দেব। শক্তিতে হয়তো আপনার সাথে পারব না। কিন্তু আমাকে অপমান করার শোধ ঠিকই নেব। আপনার ঘরে যদি কাচ্চা-বাচ্চা থাকে তাহলে ওরা হবে আমার। প্রতিশোধের শিকার। ধরে নিয়ে গিয়ে আগুনের ছ্যাকা দেব গায়ে। ওরা যন্ত্রণায়। চিৎকার করবে। আমি তখন আনন্দে হাততালি দেব।
শিশুরা আমাকে দেখতে পারে না। বামন বলে খেপায়। এক সময় চাকরের কাজ করতাম। এক বড়লোকের বাসায়, পাঁচ বছরের বিছুটার ভয়ে সব সময় সিটিয়ে থাকতে হত। আমাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে খুব আনন্দ পেত শয়তানটা। মুখ বুজে সব সহ্য করেছি। কারণ ওই সময় আমার যাবার কোন জায়গা ছিল না। রাস্তায় ফেরিওয়ালার কাজটা ছেড়ে দিতে হয়েছে এই বিচ্ছুগুলোর যন্ত্রণায়। ওরা আমাকে যেখানে দেখে সেখানেই পিছু নেয়। বাটকু বেঁটে বাটুল বেঁটে ভূত ইত্যাদি বলে খেপায়। আমি সব সহ্য করতে পারি, কিন্তু চেহারা এবং আকৃতি নিয়ে অপমান সইতে পারি না। জানি আমি দেখতে সুন্দর নই, তার ওপর ছোট বেলায় পোলিও রোগে একটা ঠ্যাং গেছে বাঁকা হয়ে। চিকিৎসা করানোর ক্ষমতা ছিল না দিনমজুর বাপের। এক গাদা ভাইবোেন আমরা 1 খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে গ্রাম থেকে পালিয়ে আসি আমি। পরে একটা চায়ের দোকানে কাজ জুটেছিল। কিন্তু খদ্দেরদের আমার চেহারা নিয়ে কটুক্তি সহ্য করতে না পেরে চাকরিটা ছেড়ে দিই। কিছুদিন আইসক্রীম বিক্রি করেছি। বিচ্ছুগুলো বাকি খেয়ে তাও লাটে উঠিয়ে দিয়েছে। ওদের তোয়াজ করতাম যাতে আমাকে আজে বাজে কথা না বলে। কিন্তু একেকটা লম্বায় আমার সমান হলে কি হবে, বুদ্ধিতে সব কটা ধাড়ি শয়তান। চেটেপুটে আইসক্রীম খাওয়া শেষ হলে বেঁটে বাটক বলে দৌড় দিত। ওদের সাথে দৌড়ে পারতাম না, নিষ্ফল আক্রোশে রাস্তায় দাড়িয়ে ফুঁসতাম।
গুলশানের বাড়িটাতে আমার চাকরি হয়েছে আইসক্রীম বিক্রি করতে গিয়ে। সোবহান সাহেবের বাচ্চাটাকে দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। বাচ্চাটার বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন একটা বিদেশী এমব্যাসীতে। অসুস্থ বিলটুর খেলার সাথী কেউ নেই। আমাকে ওই বাড়িতে চাকরি দেয়া হলো সার্কাসের ক্লাউন সেজে বিলটুর খে হাসি ফোটানোর জন্য। বিনিময়ে মাস গেলে মোটা বেতন। আগেই বলেছি, তখন আমার আইসক্রীমের ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড়। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও চাকরিটা নিলাম। আর প্রথম দিনই বিলটুর উদ্ভট নির্যাতনের শিকার হতে হলো। আমাকে ঘোড়া বানিয়ে, পিঠে উঠে আমার অর্ধেক চুল ছিঁড়ে ফেলল সে। আর হট ঘোড়া হাট বলে পেটে লাথি মেরে সে কালশিটে ফেলে দিল শরীরে। কোনমতে একটা হপ্তা টিকে থাকলাম। ততদিনে আমার সামনের পাটির দুটো দাঁত নড়ে গেছে বিলটুর লাথি খেয়ে, ডান কান সব সময় আঁ আঁ করে ও নলের মত কি একটা জিনিস ঢুকিয়ে জোরে ফু দেয়ার পর থেকে। আমার বাঁ পা মচকে গেল ওর হুকুমে দোতলার সিঁড়ি লাফাতে গিয়ে। বিলটুর বিটকেলে নির্যাতনে আমার দিশেহারা অবস্থা। শুকননা, পাটখড়ির মত, মায়াবী চেহারার খুদেটার মাথায় অত দুর্বুদ্ধি জানলে আমি রাস্তায় ভিক্ষে করে পেট চালাতাম, জনমেও এ বাড়িতে আসতাম না। আসলে শিশুদের মত নিষ্ঠুর পৃথিবীতে নেই। ওরা দেব শিশু না ছাই। একেকটা ইলিশের দোসর।
শিশুদের আমি এমনিতেই দেখতে পারি না। বিলটুর অত্যাচারে ওদের প্রতি ঘৃণা আমার আরও বেড়ে গেল। পালিয়ে যাব ঠিক করলাম। তার আগে বিলটুটাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে।
রোববার দিন বিলটুর বাবা-মা যথারীতি অফিসে যাবার পর বিলটু আমার ওপর তার বিদঘুটে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করে দিল। ছোকরার নাকি হার্টের সমস্যা আছে। তাই ওকে এখনও স্কুলে ভর্তি করেননি সোবহান সাহেব। তবে বিলটুর মা ওকে বাড়িতে এ বি সি ডি শেখান। তারা অফিসে যাবার আগে পইপই করে পুত্রধনকে বলে যান সে যেন দুষ্টমি না করে বই-খাতা নিয়ে বসে। কারণ সামনের মাসে বাড়ির কাছে কিন্ডার গার্টেনটায় বিলটুকে ভর্তি করে দেবেন তাঁরা। বিলটুকে নিয়মিত স্কুলে যেতে হবে না, শুধু পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দিলেই চলবে। তবে ভর্তি পরীক্ষায় তো আগে পাস করতে হবে। বিলটু সুবোধ ছেলের মত মাথা দোলালেও, যেই সোবহান সাহেবের গাড়ি গেট পেরিয়ে রাস্তায় পড়েছে, সাথে সাথে দুরন্ত গতিতে বাঁদরামি শুরু হয়ে গেল তার।
কিচেন থেকে একটা রঙিন মোমবাতি নিয়ে এল বিলটু। বলল, মজা দেখবে। এসো? আমার হাত টানতে টানতে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল সে। দরজা বন্ধ করে পকেট থেকে একটা ম্যাচ বের করল। আমি তটস্থ হয়ে থাকলাম নতুন অঘটনের ভয়ে। বিলটু এবার বাথটাবের কল ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে টলটলে জলে ভরে গেল বাথটাব। তারপর জিন্সের ঢাউস প্যান্টের আরেক পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল। বলল, এবার তুমি বাথটাবে নেমে পড়ো।
কেন? জানতে চাইলাম আমি।
