এ ধরনের গবেষণাগার আপনার জন্য নতুন কিছু নিশ্চয়ই নয়, বলল স্নোন। বাড়িটার আন্ডারগ্রাউন্ডের এই ঘরগুলো আমার খুব কাজে লেগেছে। এসব ঘর ব্যবহার করা হত কিনা জানি না, তবে ধারণা করতে পারি এদিকের একটা অংশ ছিল ওয়াইন সেলার। হয়তো জ্বালানী গুদামজাত করে রাখা হত এখানে, শিকারীদের শিকার করা হরিণের চামড়া ছেলা হত। বুঝতেই পারছেন ঘরগুলোকে নিজের মত করে সাজাতে প্রচুর খরচ হয়েছে আমার। এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমের ব্যবস্থা করেছি বেশিদিন হয়নি। এর আগে হিটার জ্বালিয়ে রাখতাম। এখন আমাদের নিজস্ব ইলেকট্রিক জেনারেটিং প্ল্যান্টও রয়েছে। কারণ পাওয়ার ফেল করার ঝুঁকি তো আর নিতে পারি না।
ল্যাবরেটরিটা ঘুরে দেখল লিন্ডা। কিছু অ্যাপারেটাস চিনতে পারল, বেশিরভাগই অচেনা ঠেকল।
আপনার সাথে আলোচনায় বসার আগে আমার কাজের ধরন নিয়ে একটু কথা বলি, বলল স্নোন। মোট তিন ধরনের লোক আছে এখানে, যাদের নিয়ে আমি কাজ করছি। প্রথম ক্যাটাগরির লোকেরা, চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় মৃত। মৃত্যু তাদের শারীরিক বৃদ্ধি রুখে দিয়েছে, তাদেরকে রাখা হয়েছে কোল্ড স্টোরেজে। এদের নিয়ে আমার কিছু করার নেই। তবে থিওরী মতে, যদি তাদের শক্টরের টিস্যগুলো ঠিকঠাকভাবে সংরক্ষণ করে রাখা যায়, যে রোগের কারণে তাদের মৃত্যু। সেটার প্রতিষেধক যদি আগামীতে তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে তাদের আবার বেচে ওঠার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। জানি, আমেরিকায় একদল বিজ্ঞানী একই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি তাদের থেকে একশো কদম এগিয়ে আছি। শুরুতে, আমার বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিফল হয়। পরবর্তীতে লাশগুলোকে নিয়ে আমরা আরও কাটাছেড়া করেছি, স্টোর করেছি, দেখেছি দুএকটা অঙ্গের পচন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। গত কয়েক বছরে অন্তত এটুকু সাফল্য আমার এসেছে যে লাশের স্বাভাবিক পচন রোধ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। আশা করছি। নিকট ভবিষ্যতে থিওরীর দ্বিতীয় অংশেও সাফল্য অর্জন করতে পারব।
আমার এক ক্লায়েন্ট মারা গেছে বছর পাঁচেক আগে। লোকটার হার্ট দুর্বল। ছিল। আপনার জানার কথা, ওইসময় হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট অপারেশন সম্পর্কে ডাক্তাররা। জানতেন না কিছুই। আর এখন তো এটা অহরহ প্রাকটিসে দাঁড়িয়ে গেছে। আমার ক্লায়েন্টকে যদি হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট অপারেশন করে বাঁচিয়ে তুলতে পারি সেটা কতবড় বিজয় হবে ভাবুন একবার। তবে এ জন্য আগে দরকার একজন উপযুক্ত ডোনার এবং একজন দক্ষ সার্জন, যিনি নিখুঁতভাবে ট্রান্সপ্ল্যান্টের কাজটা করতে পারবেন।
কথা বলতে বলতে উদাস হয়ে উঠল স্নোনের চোখ। আসলে নিজেকে জাহির করছে সে। ওর কাজ কর্মের বর্ণনা শুনে ওকে পাগল মনে হতে লাগল লিভার।
আর দ্বিতীয় ক্যাটাগরি? অস্বস্তি নিয়ে জানতে চাইল সে।
দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে আছে সেইসব লোক যারা প্রচণ্ড অসুস্থতার কারণে মারা যেতে বসেছে, কিন্তু মরেনি এখনও। এখানেও সেই একই দাওয়াই দিতে হবে, তবে এদের ক্ষেত্রে সফল হবার সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল আজ সকালের ইমার্জেন্সী কেসটা অমনই একটা ছিল। অল্প বয়সী একটা মেয়ে, মারা যেতে বসেছিল, ওকে এখানে নিয়ে আসা হয়। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য, ফ্রিজিং প্রসেসটা সময় মত শুরু করতে পারিনি বলে দুপুরের ঠিক আগে মারা গেছে সে। ওকে আমরা হিমায়িত করে রাখব, তবে ভবিষ্যতে ওর বেঁচে ওঠার চান্স শেষ হয়ে গেছে।
লোকটার বকবকানি যথেষ্ট শোনা হয়ে গেছে লিভার। সে যা অর্জন করতে চাইছে তা শুধু অবিশ্বাস্যই নয়, ভয়ঙ্করও। এ ধরনের উন্মাদের সাথে ও কাজ করবে না।
শুনুন, ড. স্নোন, বলল লিন্ডা। আপনার আমন্ত্রণে এখানে এসেছি আমি। কিন্তু মনে হচ্ছে না আপনার সাথে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে। আপনি বরং সময় নষ্ট না করে আরেকজনের সন্ধানে লেগে যান। আর কাউকে দিয়ে আমাকে গ্লাসগো পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করুন।
এক মুহূর্ত চুপ করে রইল স্নোন, তারপর যখন কথা বলল, যেন এক ভিন্ন মানুষ। ওর কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে শিউরে উঠল লিন্ডা।
ব্যাপারটা দুঃখজনক, মিস রেনল্ডস, সত্যি দুঃখজনক, এদিক-ওদিক মাথা নাড়ছে সে। যখন এসেই পড়েছেন তৃতীয় ক্যাটাগরির লোকদেরকে না দেখিয়ে আপনাকে ছাড়ছি না।
কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না যে…
আপনাকে ছাড়ছি না কিন্তু, অদ্ভুত এক টুকরো হাসি ফুটল তার মুখে। এবারের জিনিসটা দেখে খুব আনন্দ পাবেন আপনি। প্লীজ, আসুন তো।
ল্যাবরেটরির শেষ মাথার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা, ঢুকল অন্ধকার, ঠাণ্ডা একটা প্যাসেজে। মনে হলো সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠছে। হালকা কমলা আলোয় প্যাসেজের দুপাশে অসংখ্য ছোট ছোট দরজা চোখে পড়ল।
আমার পেশেন্টরা থাকে এসব ঘরে, ব্যাখ্যা করল স্নোন। এদের অর্ধেক মৃত, বাকিরা মরো মরো, অবস্থায় এখানে এসেছে। তবে প্রসেসটা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। অবশ্য সবাইকে ভাল মত পরীক্ষা রে মাইনাস দুশো ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় হিমায়িত করে রাখা হয়েছে। তাদের শারীরিক যে কোন পরিবর্তন আমরা রেকর্ড করে রাখছি।
মনে হলো একটা কবরস্থানে হাজির হয়েছে লিন্ডা, বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ। খুব ভয় ভয় লাগছিল, একই সাথে কৌতূহলও জাগছিল।
