কতদিন ধরে ওরা এখানে আছে? শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করল ও।
সবচে পুরানো পেশেন্টের এখানে অবস্থানের সময় দশ বছর তো হবেই, জবাব দিল স্লোন। যারা এখনও মারা যায়নি, এমন পেশেন্ট এসেছে পাঁচ বছর আগে।
পাসেজের দূরপ্রান্তের একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়তে হলো, স্নোন দরজা খুলল। আবার সিডি নেমে গেছে নিচে।
সমস্যা হলো, ফ্যাকাসে, ক্ষীণ আলোয় সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল স্লোন, গত ২/৩ বছর ধরে পেশেন্টদের রাখার জায়গা সংকুলান হচ্ছে না। তাই একটা লোয়ার চেম্বার খুলতে হয়েছে।
নিচে আসার পরে, স্লোন সুইচ টিপে জ্বালিয়ে দিল বাতি, যদিও পুরোপুরি অন্ধকার দূর করতে পারল না আলো। লিন্ডা দেখল একটা লম্বা, সরু, ভল্টের মত ঘরে ঢুকেছে, ছাদটা ঢেউ খেলে দেয়ালের সাথে মিশেছে, এত নিচু যে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। দেয়ালের এক ধারে অসংখ্য ডায়াল আর সুইচ, তবে ওর নজর কেড়ে নিল লম্বা দেয়ালের বিপরীত দিকটা। চারকোনা, গভীর করে খোদাই করা অনেকগুলো পাথুরে গর্ত ওদিকটাতে। তিনটা গর্ত দেখে বোঝা গেল অল্প কদিন আগে ইট আর সিমেন্ট দিয়ে গর্তগুলো বুজিয়ে দেয়া হয়েছে। বাকি গর্তগুলো খালি। শেষ মাথার গর্তটার সামনে বড় একটা ধাতব ক্যানিস্টার শোয়ানো। সিলিন্ডার আকারের ক্যানিস্টারটি লম্বায় ফুট সাতেক হবে, ডায়ামিটারে তিন/চার ফুট। হয়তো পেছনের গর্তে ওটার জায়গা হবে। ক্যানিস্টারটা পুরো লেংথ থেকে এমন ভাবে ভাগ করা, ইচ্ছে করলেই ওপরের অংশটা তলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়।
চারপাশে চোখ বোলালেও লিন্ডা টের পাচ্ছিল স্লোন তাকিয়ে আছে ওর দিকেই! তার চোখে চোখ পড়তে দেখল বন্ধুসুলভ ভাবটা চেহারা থেকে মুছে গেছে স্নোনের, ঠাণ্ডা, বুক হিম করা একটা হাসি মুখে। লিন্ডার বুকটা কেঁপে উঠল।
ধাতব ক্যানিস্টারে টোকা দিল স্লোন, বলল, এটার মধ্যে এবং এটার মত আরও তিনটে কন্টেইনারে, যেগুলো দেয়ালের পেছনে ইট দিয়ে পুঁতে রাখা হয়েছে, ওখানে যারা শুয়ে আছে তারা না জীবিত না মৃত।
আপনার কথা বুঝতে পারলাম না, বলল লিভা। আমি বলতে চাইছি, ওখানে যাদের রাখা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই সুস্বাস্থ্যবান ছিল।
কিন্তু কেন? অবাক হলো লিভা। এতে তাদের সুবিধেটা কি?
সুবিধেটা তাদের নয়, আমার ইচ্ছে সুবিধেটা গোটা বিশ্বের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া।
ওঁরা কি এ ধরনের অভিযানে স্বেচ্ছায় এসেছেন?
ঠিক তা নয়, শয়তানী হাসি হাসল স্নোন। তাদেরকে কাজটা করাতে বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়েছে। বিজ্ঞান যদি বিনিময়ে অনেক লাভবান হতে পারে তাতে সামান্য শক্তি প্রয়োগের ঘটনায় কিইবা এসে যায়?
তার মানে আপনি ইচ্ছের বিরুদ্ধে মানুষগুলোর অমন অবস্থা করেছেন? ঘৃণা আর রাগে গলা চড়ল লিন্ডার। এমন অমানবিক আচরণের কথা জীবনেও শুনিনি আমি।
থামুন! ধমকে উঠল স্লোন। লেকচার দেয়ার সময় পরে পাবেন। আসুন এদিকে। আরও কিছু জিনিস দেখানো বাকি রয়ে গেছে।
ক্যানিস্টারের ডালা খুলল স্লোন, হিমায়িত বাষ্পের একটা মেঘ উঠে এল ওপরে। ঘন মেঘটা স্বচ্ছ হয়ে ওঠার পরে লিন্ডা দেখল একটা লোক শুয়ে আছে ক্যাপসুলের ভেতরে। লোকটা সম্পূর্ণ নগ্ন, গায়ের চামড়া অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে, খিচ ধরে আছে। মাংসপেশী, পরিষ্কার বোঝা গেল। মরা মানুষের মত শুয়ে আছে সে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথাটা ঘুরে উঠল ওর। তার চোখ বোজা, মাথায় এক গাছি চুলও নেই, নিখুঁতভাবে কামানো, তারপরও ওকে চিনে ফেলল।
জন, নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠল লিন্ডা। তারপরই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
সম্ভবত কয়েক মিনিট চেতনা ছিল না ওর জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখে চিৎ হয়ে পড়ে আছে স্নোনের চেম্বারে, ধাতব কবরটা খোলা, ভেতরে শুয়ে আছে প্রেমিক জন বার্ন।
হাত ধরে টেনে তুলল স্নোন লিন্ডাকে, ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল সে।
আপনি-আপনি একটা দানব! হিস্টিরিয়া আক্রান্ত রোগীর মত চেঁচাতে লাগল। লিন্ডা। আমার জনের কি দশা করেছেন! ও এখানে এল কি করে?
ধীরে, বন্ধু, ধীরে, মুচকি হাসল স্নোন। এক এক করে আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। আপনার প্রেমিক এবং তার দুই বন্ধু, তাদের পাইলটসহ, সবাই আছে এখানেই। অন্যদেরকে দেয়ালের ইট দেয়া অংশে একই কন্টেইনারে পুরে সীল করে দেয়া হয়েছে। আপনার প্রেমিককেও একই পদ্ধতিতে সীল করা হবে। আমি তাকে এখানে এনে রেখেছি আপনার কথা ভেবে। আপনি ওকে দেখে হয়তো খুশি হবেন।
লিন্ডা মারমুখী হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, হাত তুলে থামিয়ে দিল স্নোন।
আগে আমার কথা শেষ করতে দিন। কেন কাজটা করতে গেলাম সে ব্যাখ্যায়। এবার আসছি। যে ব্যাপারটা নিয়ে গবেষণা করে সাফল্যের পথে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলাম, সে প্রজেক্ট হঠাৎ স্থবির হয়ে পড়ে ফান্ডের অভাবে। কাজটা আবার শুরু করার স্বপ্ন দেখছি, এমন সময় প্রফেসর ম্যাক্সওয়েল ওয়েন অ্যাওয়ার্ড আপনারা জিতে আমার শেষ ভরসাটাও নষ্ট করে দিলেন। তারপর ভাবলাম আপনাদের টাকায় ভাগ বসাচ্ছি না কেন? হাফ মিলিয়ন পাউন্ড অনেক টাকা। এ টাকা দিয়ে দুদলের প্রজেক্টের কাজই ভাল ভাবে চলতে পারে। কাজেই প্লেনটা হাইজ্যাকের ব্যবস্থা করতে হলে আমাকে, ওদেরকে নিয়ে এলাম এখানে। প্রফেসরের কাছে প্রস্তাব দিলাম এক সাথে কাজ করার। তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন সেই প্রস্তাব। তন ওদের তিনজনকে চিরতরে অদৃশ্য করে দেয়া ছাড়া বিকল্প রাস্তা ছিল না আমার। প্রফেসরের প্রজেক্ট বাতিল মানে দ্বিতীয় সেরা হিসেবে টাকাটা আমি পেয়ে যাব।
