গাছের ভেতর থেকে পথ করে ওরা এগোল বাড়িটার দিকে, ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠল লম্বা, চৌকোনা, ধূসর রঙের চিমনিগুলো, পাথুরে দেয়াল, সেই সাথে ছোট ছোট জানালা। বাড়িটা এমন আদলে তৈরি, বাইরে থেকে মধ্য যুগের দুর্গ মনে হয়, একই সাথে ভিক্টোরিয়ান আমলের কারাগারের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
এটা একটা পুরানো হান্টিং লজ, প্রকাণ্ড সদর দরজার দিকে যেতে যেতে ব্যাখ্যা করল স্নোন। তবে ভেতরটা বেশ আরামদায়ক।
পাথুরে দেয়ালে পায়ের আওয়াজ তুলে বিশাল একটা ঘরে ঢুকল ওরা। ঘরটিতে সেগুন কাঠের আসবাব, বিমগুলো কালো রঙের, দেয়ালে ঝোলানো পেইন্টিংগুলো বিবর্ণ, মান। খোলা ফায়ারপ্লেসে দাউ দাউ জ্বলছে আগুন, বাড়িটাকে আলখেল্লার মত জড়িয়ে থাকা হিম ঠাণ্ডা ভাব অনেকটা দূর হয়েছে উষ্ণ তাপে। কল্পনার চোখে দেখার চেষ্টা করল লিন্ডা পাহাড় থেকে শিকার করে এ বাড়িতে ফিরে এসেছে তার বাসিন্দারা, তাদের কলহাস্যে মুখরিত প্রতিটি ঘর। কিন্তু কল্পনার চোখে কিছুই ফুল না।
এক গ্লাস শেরি ঢেলে দিল শ্রেন ওকে, নিজে নিল হুইস্কি। আগুনের সামনে সে কথা বলল দুজনে।
ভাগ্যগুণে এ বাড়িটি পেয়ে গেছি আমি, উৎফুল্ল দেখাচ্ছে নেকে। গ্লাসগোর ডিস্টিলারী ব্যবসায়ী মি, ওভারেট লডারেট মালিক ছিলেন এটার। বিশ এবং ত্রিশের দশকে, ছুটির দিনগুলোতে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসতেন তিনি এখানে। মাছ ধরতেন। শিকার করতেন। কিন্তু যুদ্ধ তার সমস্ত আনন্দ শেষ করে দেয়। সেনাবাহিনী বাড়িটিকে তাদের কমান্ডাে ট্রেনিং হেডকোয়ার্টার বানায়। কমান্ডাে ট্রেনিং-এর জন্য দুর্গম এই অঞ্চল যথার্থ ছিল বটে। যুদ্ধ শেষে লডারেট তার ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে দেশের বাইরে চলে যান। বাড়িটি বহুদিন খালি ছিল। তারপর ইয়ুথ হোস্টেলস অ্যাসোসিয়েশন এখানে অফিস করেছিল। কিন্তু তারাও বেশিদিন থাকেনি। তারপর জলের দামে বাড়িটি আমি কিনে নিই।
আরেক গ্লাস ড্রিঙ্ক অফার করল স্লোন লিন্ডাকে, মানা করতে নিজেই খানিকটা হুইস্কি গিলে নিল ঢক ঢক করে। তারপর আবার শুরু করল বকবক।
বাড়িটি আমার প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট বড়, যদিও কিছু চাকর-বাকরও আছে। ওরা রান্না করে, ঘর-দোর পরিষ্কার রাখে। দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে, তেমন দক্ষ নয়। তাই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একজন পার্সোনাল অ্যাডভাইজারের খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। এ কারণেই আপনার কাছে যাওয়া। আপনার সাহায্য আমার ভীষণ দরকার। আপনার সাহায্য পেলে গবেষণার কাজ আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।
এমন সময়, দাড়িঅলা, সাদা কোট পরা, বিশালদেহী এক লোক ঝড়ের বেগে ঢুকল ঘরে। লিন্ডাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর স্নোনের দিকে ঘুরে, হাপাতে হাঁপাতে বল্ল, ড, স্লোন, দয়া করে একবার আসবেন? এক রোগিণীকে নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। নিঃশ্বাস ফেলছে না সে।
বিরক্তিতে কপাল কোঁচকাল স্নোন, শঙ্কা ফুটল চোখে পরমুহূর্তে চেহারা স্বাভাবিক করে বলল, তুমি যাও, ব্রানস্টোন। আমি আসছি এখুনি।
ব্রানস্টোন যাবার পরে ঘুরে দাঁড়াল স্নোন লিডার দিকে। অল্পক্ষণের জন্য আমাকে ক্ষমা করতে হবে, মিস রেনল্ডস। শুনলেনই তো ইমার্জেন্সী কেস। একবার নিচে যাওয়া দরকার। আপনি গেস্টরুমে গিয়ে ততক্ষণে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি হাউসকীপারকে বলে দিচ্ছি। প্লীজ, নিজের বাড়ির মত ভাবুন এ বাড়িটিকে। আমি শীঘ্রি ফিরব। তারপর একসাথে লাঞ্চ করে সব ঘুরিয়ে দেখাব।
স্নোনের ডাকে কালো পোশাক পরা এক বুড়ি এল, লিভাকে দোতলায় নিয়ে গেল, করিডরের শেষ মাথায়, একটা ঘরে ঢুকল। বুড়ির সাথে ভাব জমাতে চাইল। ও। কিন্তু ওর একটা প্রশ্নেরও জবাব দিল না সে, শুধু হুঁ হাঁ করে গেল।
বেডরুমটা বাড়ির পেছনের অংশে, বড় বড়, উঁচু জানালা দিয়ে পাহাড়ী উপত্যকা চোখে পড়ে। মনে হলো বাড়িটার সমস্ত দিক ঘিরে আছে রুক্ষ পাহাড়ের সারি।
ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে লিন্ডা। যতই সুন্দর নিসর্গ থাকুক, এমন ভৌতিক নির্জনতার মাঝে থাকতে পারবে না ও, দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। একা হলেই প্লেন ক্রাশের কথা মনে পড়বে, আর খালি মন খারাপ হবে। ঠিক করল প্রথম সুযোগেই স্লোনকে তার বদান্যতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলবে ফিরতি ট্রেনে লন্ডনে ফিরে যেতে চায় সে।
লাঞ্চের সময় অত্যন্ত উপাদেয় খাদ্য পরিবেশন করা হলেও খাওয়াতে মন বসল না লিন্ডার। টেবিলে স্নোন ছাড়াও তার দুই সহকারী ছিল। একজনকে আগেই দেখেছে-ব্রানস্টোন। অপরজন বয়সে তরুণ, রোগা চেহারা, তীক্ষ্ণ চোখ, নাম ডেভিস। ওরা যে বারবার লিন্ডার দিকে চোরা চোখে তাকাচ্ছে পরিষ্কার বুঝতে পারছিল সে। স্নোন খোশ গল্প চালিয়ে যাবার ভান করলেও তার মন ছিল অন্যদিকে। কারণ মাঝে মাঝে কথার খেই হারিয়ে ফেলছিল সে, কি যেন চিন্তা করছিল।
লাঞ্চ শেষে স্নোন বলল, মিস রেনল্ডস, এবার তাহলে যাওয়া যাক। চলুন, আমার ল্যাবরেটরি ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি।
হলঘর থেকে বের হয়ে ছোট একটা দরজার সামনে চলে এল স্নোন। এটা আসলে একটা চোর-কুঠুরি। দরজা খুলে, আলোকিত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। প্রবেশ করল ভিন্ন এক জগতে।
এদিকের দেয়ালগুলো চমৎকার চুনকাম করা, এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমের কারণে স্যাতসেতে, ঠাণ্ডা ভাবটা নেই। সিঁড়ি গোড়ায় আরেকটা দরজা, তারপর সরু প্যাসেজ। তারপর আরও একটা দরজা পার হয়ে ঢুকে পড়ল স্নোনের সুসজ্জিত, বিশাল গবেষণাগারে।
