গভীর শোক আর ক্ষীণ প্রত্যাশা নিয়ে কেটে যাচ্ছিল একঘেয়ে দিনগুলো। চাকরি-বাকরি করতেও আর ইচ্ছে করছিল না। লিন্ডার বাবা বলল, তোকে কিছু করতে হবে না। তুই আমাদের সাথেই থেকে যা। তার একটা ছোট বাগান ছিল। ফলের ব্যবসা করতেন। মাঝে মাঝে সাহায্য করত লিভা তাকে কাজে। মাস ছয়েক পরে একটা ঘটনা ঘটল।
সেদিন আপেল তুলছে লিন্ডা গাছ থেকে, মা বলল এক ভদ্রলোক এসেছে, দেখা করতে চায়। বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখে জেসন স্নোন অপেক্ষা করছে ওর জন্য। খুবই অবাক হয়ে গেল সে ওকে দেখে। আমাকে নিশ্চয়ই আশা করেননি, মিস রেনল্ডস, লিন্ডার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাসল সে। মনে হলো ওকে দেখে খুব খুশি হয়েছে।
জী, নিজের অজান্তেই যেন হাতটা ধরে বলল লিভা।
স্যার আর্থার ওয়েনের বাড়িতে পরিচয় হয়েছিল। মনে আছে?
মনে আছে। লোকটার সেদিনের ব্যবহারের কথা মনে পড়তে ইচ্ছে করেই রূঢ় স্বরে কথাটা বলল সে।
লিন্ডার মনোভাব টের পেয়ে দ্রুত বলে উঠল স্লোন, সেদিনের কথা ভাবলে আমি এখনও লজ্জায় মরে যাই, মিস রেনল্ডস। সত্যি ক্ষমার অযোগ্য একটা কাজ করেছি সেদিন। এখন ক্ষমা চাওয়া ছাড়া কিইবা করার আছে আমার? আসলে ওয়েন অ্যাওয়ার্ড না পেয়ে এত হতাশ হয়ে পড়েছিলাম যে মাথা ঠিক রাখতে পারিনি।
লোকটাকে তার আচরণের জন্য সত্যি খুব মর্মাহত মনে হচ্ছিল। লিন্ডা ভাবল। লোকটার ব্যাপারে হয়তো ভুল ধারণাই পোষণ করেছে তারা।
অনেক কাজ আমরা আবেগের বশে করে ফেলি যার জন্যে পরে আফসোস করতে হয়, বলল সে। ভেবে কষ্ট লাগছে প্রফেসর ম্যাক্সওয়েল এবং তার সঙ্গীদের কাছে ক্ষমা চাইবার সুযোগ কোনদিন হবে না। খুবই করুণ অ্যাক্সিডেন্ট ছিল ওটা।
হ্যাঁ, তাই ছিল, তীক্ষ্ণ গলায় বলল লিন্ডা।
আপনাকে আর অ্যাক্সিডেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই না। ব্যক্তিগতভাবেও আপনার বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। কাগজে খবরটা পড়ে খুব কষ্ট পেয়েছি আমি। প্রফেসর ম্যাক্সওয়েলের মত প্রতিভাবান মানুষের এমন মৃত্যু কল্পনাও করা যায় না! যাকগে, আমি এসেছিলাম আপনার জন্য একটা প্রস্তাব নিয়ে।
প্রস্তাব? অবাক হয় লিন্ডা।
জী। আমি চাই আপনি আমার সাথে কাজ করবেন।
কিন্তু…
আগে ব্যাপারটা আমাকে ব্যাখ্যা করতে দিন, বাধা দিল স্লোন। আসলে ওই অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটার পর থেকে আপনাকে খুঁজছিলাম। আপনার ঠিকানা খুঁজে বের করতে অনেক সময় লেগেছে। প্রফেসর ম্যাক্সওয়েলের ল্যাবরেটরির লোকজন আপনার ফ্ল্যাটের ঠিকানা শুধু জানত, বাড়ির কথা জানত না কেউ। অনেক কষ্টে আপনাকে খুঁজে পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি আপনি যদি আমার সাথে কাজ করতে রাজি হন তাহলে সেটা একদিক থেকে প্রফেসর ম্যাক্সওয়েলের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাই হবে। এটা তার প্রজেক্ট না হলেও আমিও বিশ্ব মানবতার কল্যাণে কাজ করছি। তিনিও তাই করছিলেন। কাজেই আমার সাথে কাজ করলে আপনি মানবতার সেবাই করবেন। সামান্য বিরতি দিল সে, তারপর বলল, তাছাড়া আমার একজন ভাল অ্যাসিস্ট্যান্টও দরকার।
কিন্তু আপনি আমাকে কতটুকু চেনেন, বলল লিন্ডা। আমি আপনার প্রয়োজনে না-ও আসতে পারি।
খুব ভাল এবং দক্ষ লোক ছাড়া যে প্রফেসর ম্যাক্সওয়েলের দলে সুযোগ পাওয়া যায় না তা আমার চেয়ে ভাল কে জানে? না, আপনাকে আমার সাথে কাজ করতে বলে কোন ভুল করিনি। আপনি রাজি কিনা তাই বলুন?
লিভাকে ইতস্তত করতে দেখে স্লোন বলল, বুঝতে পারছি এখনও শোক সামলে উঠতে পারেননি…।
না, ঠিক তা নয়, বলল সে।
তাহলে এখানে বসে বসে আপনার প্রতিভার অপচয় করছেন কেন?
জেসন স্রোনের মানুষকে পটানোর ক্ষমতা সাংঘাতিক। কিন্তু মনস্থির করতে পারছি না সিন্ডা।
ঠিক আছে, বলল সে অবশেষে। এখনই কোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। আগে চলুন আমার কাজের জায়গায়। আমার ল্যাবরেটরি ঘুরিয়ে দেখাই আপনাকে। তারপর ঠিক করবেন কাজ করবেন কিনা।
স্নোনের কথায় যুক্তি ছিল। তারপরও ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল লিন্ডা রেনল্ডসের। স্নোন আরও খানিকক্ষণ ঝোলাঝুলি করার পরে রাজি হয়ে গেল ওর ল্যাবরেটরি দেখতে। ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেল সে।
দিন দুই পরে সন্ধ্যার ট্রেনে চড়ে লন্ডনে গেল লিন্ডা, সেখান থেকে গ্লাসগোতে। স্নোন নিজে ওকে রিসিভ করল কুইন স্ট্রীটে, তারপর গাড়ি নিয়ে ছুটল শহরের বাইরে, উত্তর দিকে। খটকা লাগল লিভার, জানতে চাইল কোথায় যাচ্ছে। স্নোন বলল, তার ল্যাবরেটরি পাহাড়ের ওপরে। ব্যাখ্যা করল, টাকার অভাবে শহরে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।
গ্লাসগো শহর পেছনে ফেলে ওরা ডানবার্টনশায়ার-এর পেঁচানো রাস্তা ধরে আরগিলের দিকে ছুটল। এদিকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম নেই তেমন। টানা দুই ঘণ্টা পরে সরু একটা রাস্তায় ঢুকল, দুপাশে বাঁধ, পাথর দিয়ে বাঁধানো। আরও মাইলখানেক এগোবার পরে একটা পাহাড় চোখে পড়ল, তার
পরে ঘন জঙ্গলে ঢাকা উপত্যকা। দূর থেকে কালো রঙের, চৌকোনা চিমনি দেখল। লিভা, হালকা ধোয়ার রেখা ভেসে যাচ্ছে গাছের মাথার ওপর দিয়ে। জীবনের চিহ্নও নেই কোথাও। এমনকি পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে না। কেমন অস্বাভাবিক, থমথমে একটা পরিবেশ।
টাকা বাঁচাতে এবং কাজের সুবিধের জন্য জেসন স্নোন এমন একটা জায়গা বেছে নিলেও পরিবেশটা পছন্দ হলো না লিন্ডার। বড় বেশি নির্জন। গা ছমছম করে।
