স্যার আর্থার ওয়েন অত্যন্ত ধনী এবং ভাল মানুষ, সারা জীবন জনহিতকর নানা কাজে অর্থ বিলিয়ে গেছেন। মিডিয়ায় তার পরিচিতি প্রচুর। তো এই ভদ্রলোক যখন ঘোষণা দিলেন, গবেষণাধর্মী কাজের জন্য হাফ মিলিয়ন পাউন্ড দান করবেন, তখন স্বভাবতঃই লিন্ডারা নেচে উঠেছিল আনন্দে। মেডিকেল রিসার্চের সাথে জড়িত যে কোন ব্যক্তি বা দল পুরস্কার পাবার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। এক্ষেত্রে বোর্ড অভ এক্সপার্টরা প্রতিটি প্রজেক্ট বিশ্লেষণ করে দেখবেন কার বা কাদের রিসার্চ সম্প্রতি সময়ে সবচে বেশি এগিয়ে গেছে বা সমৃদ্ধি অর্জন করেছে।
নিজেদের ব্যাপারে প্রফেসর ম্যাক্সওয়েলের ছোট্ট দলটি যথেষ্ট আশাবাদী ছিল, তাছাড়া তাদের হারাবার তো কিছু ছিল না। তাই প্রতিযোগিতায় নাম লেখায় ওরা। প্রফেসর ম্যাক্সওয়েল অত্যন্ত চমৎকারভাবে তাদের গবেষণার বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। অবশেষে জানা গেল ওরাই জয়ী হয়েছেন।
ফলাফল ঘোষণার পরে অন্যান্য প্রতিযোগী দলগুলোর প্রায় সবাই প্রফেসরকে বিজয়ে অভিনন্দন জানাল শুধু একজন ছাড়া। এই লোকটির নাম জেসন স্নোন, বোর্ডের বিচারে সে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল। তবে স্যার আর্থারের বোর্ডে হাজির হবার আগ পর্যন্ত তার সম্পর্কে মানুষ তেমন কিছু জানত না বললেই চলে। তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল মানুষকে হিমায়িত করে দীর্ঘ জীবনের সন্ধান দেয়া। স্নোন দাবি করছিল সে এ ব্যাপারে প্রচুর সাফল্য অর্জন করেছে। বোর্ড যখন তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, সেইসময় গুজব রটে যায় নেই প্রথম পুরস্কারটি পাচ্ছে।
স্যার আর্থারের বাড়িতে গর্ডন ম্যাক্সওয়েলের দলের সাফল্য ঘোষণার আয়োজন করা হয়। বক্তৃতায় বোর্ডের চেয়ারম্যান তার কাছে আসা সকল প্রজেক্টের প্রশংসা করেন, স্নোনের নাম তিনি একাধিকবার উচ্চারণ করেন। তাকে দ্বিতীয় পুরস্কার দেয়া হয়। কিন্তু জেসন স্নোন বোর্ডের সিদ্ধান্তে মোটেও খুশি হতে পারেনি। প্রফেসর ম্যাক্সওয়েল তাকে অভিনন্দিত করলেও সে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি, প্রফেসরের বাড়ানো হাত দেখেও না দেখার ভান করেছে। মাছের মত ঠাণ্ডা চোখে দেখছিল সে ওদেরকে, যেন চারজনের মূল্য যাচাই করছিল। সে বলছিল, বোর্ড আমার কাজের মূল্যায়ন না করে ভুলই করল। বলে চলে গেল। জন বার্ন মন্তব্য করল, হেরে গিয়ে লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
প্রফেসর ম্যাক্সওয়েল বললেন, শড় হওয়াই স্বাভাবিক। স্নোন ভেবেছিল প্রথম পুরস্কারটি সে-ই পাবে। হেরে গেলে ওর মত আমরাও ভেঙে পড়তাম।
স্লোনকে নিয়ে ভাবনার অবকাশ ছিল না লিন্ডাদের। কারণ পরের হপ্তাতেই প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়ে ওরা কাজে। নতুন প্রজেক্ট, দাতার নাম অনুসারে যেটার নাম দেয়া হয় এ.ডব্লিউ, ওটার কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে বেশ কিছু নতুন ইকুইপমেন্ট কেনার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। প্রফেসর বললেন তাকে হামবুর্গে যেতে হবে জিনিসগুলো কিনতে। বিশেষ প্লেন চার্টার করে জার্মানীতে যাবেন তিনি, ইকুইপমেন্ট পছন্দ হলে সাথে করে নিয়ে আসবেন।
তোমাকে যেতে হবে না, লিন্ডা, বললেন ম্যাক্সওয়েল। আর কদিন পরে তোমার বিয়ে। তুমি বরং বিয়ের কেনাকাটা শুরু করে দাও।
জন বার্নের সাথে লিন্ডার এনগেজমেন্ট হয়ে গিয়েছিল আগেই, কিন্তু আর্থিক কারণে প্রজেক্টটা স্থগিত হয়ে পড়ায় বিয়ে করতে সাহস পাচ্ছিল না ওরা। এখন নতুনভাবে অর্থসংস্থান হওয়ায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল বিয়ের কাজটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলবে। আর সেটা হবে জন প্রফেসরের সাথে হামবুর্গ থেকে ফেরার পরপরই।
যাত্রার দিন ওদের বিদায় জানাতে লুটন এয়ারপোর্টে গেল লিন্ডা। তারপর খুশি মনে ফিরে এল বাবার বাড়িতে, বাকিংহামশায়ারে। এখানেই বিয়ের অনুষ্ঠানটা হবে। জন বলেছিল হামবুর্গ পৌঁছার পরপরই ফোন করবে। কিন্তু ফোনের জন্য বৃথাই অপেক্ষা করল লিভা। ভাবল হয়তো কাজের চাপে ভুলে গেছে জন ফোন করতে।
পরদিন সকালে লিন্ডার মা ওকে ঘুম থেকে জাগাল খবরটা দিতে। ঘুমের রেশ পুরোপুরি কাটেনি তখনও, তাই প্রথমে বুঝতে পারল না মা কি বলছে। কিন্তু মার। কণ্ঠের জরুরী সুর ওকে জাগিয়ে তুলল পুরোপুরি। মা বলছিল, খবরে শুনলাম গত রাতে উত্তর সাগরে একটা হালকা প্লেন নিখোঁজ হয়ে গেছে। তোকে বিরক্ত করতে চাইনি। কিন্তু ভয় লাগছে জনের কিছু হলো কিনা ভেবে।
খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা গেল লিন্ডার মার আশঙ্কাই সত্যি। জনদের প্লেনের সাথে এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ যোগাযোগ ছিল ইংলিশ কোস্ট পার হবার আগ পর্যন্ত, তারপর হঠাৎ করেই নেই হয়ে গেছে ওরা। সাগরে অভিযান চালানো হলো। প্লেন বা তার যাত্রীদের কোন হদিশ মিলল না। তিনদিন পরে লিন্ডারা প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিল, এমন সময় খবর এল একটা এয়ারক্রাফটের ধ্বংসাবশেষের খোঁজ পাওয়া গেছে। ধ্বংস হওয়া প্লেনটার টুকরো-টাকরা তোলা হলো সাগর থেকে, বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হলেন এটা সেই নিখোঁজ নেই। পরীক্ষায় জানা গেল, আকাশে কোন কারণে বিস্ফোরিত হয়েছে প্লেন। কিন্তু প্লেনের যাত্রীদের কোনই সন্ধান মিলল না।
একেবারেই ভেঙে পড়ল লিন্ডা তার ভবিষ্যৎ স্বামী এবং দুজন প্রিয় বন্ধুকে, হারিয়ে। কলেজের পড়া চুকিয়ে প্রফেসরের প্রজেক্টে ঢুকেছিল বিজ্ঞানী হিসেবে। ক্যারিয়ার গড়বে বলে। সে স্বপ্ন এভাবে ভেঙে যাওয়াতে আরও মুষড়ে পড়ল। তবে বিশ্বাস হতে চাইছিল না তিন তিনটে মানুষ কোন চিহ্ন না রেখে এভাবে অদৃশ্য হয়ে। যেতে পারে। পত্রিকাগুলোও এ নিয়ে বেশ লেখালেখি করছিল। লিন্ডার বার বার। কেন যেন মনে হচ্ছিল মরেনি ওরা, বেঁচে আছে এখনও।
