ধীরে সুস্থে গাড়ি চালিয়ে নিজের বাংলোয় ফিরে এল রিচার্ড ক্লার্ক। এখন ভাল করেই জানে এই জীবনে আর ইংল্যান্ডে ফেরা হবে না তার। অবশ্য তাতে অসুবিধে নেই কোন। গাইডের ব্যবসাটা ভালই জমে উঠেছে, আর প্রাচ্যের রহস্যময়তা তাকে এমন মুগ্ধতায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে যে এখান থেকে কোথাও যাবার ইচ্ছেও তার নেই।
[মূল: জন আর্থারের গল্প]
পালাবার পথ নেই
কলিংবেলের শব্দে জেগে উঠল শ্যারন ফেয়ারচাইল্ড। চট করে চোখ চলে গেল বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখা সুদৃশ্য ঘড়িটার দিকে। রাত একটা। কপালে ভাঁজ পড়ল ওর। এমন বৃষ্টির রাতে কে এল? ঘন ঘন, টুং টাং শব্দে আবার বেজে উঠল বেল। বাজতেই থাকল। অধৈর্য হয়ে কেউ টিপে ধরে রেখেছে ঘণ্টিটা। তাই অনবরত বেজেই চলেছে।
বিছানা থেকে নেমে পড়ল শ্যারন, পায়ে হরিণের চামড়ার চটি গলিয়ে ছুটল লিভিংরুমের দরজার দিকে। বিরক্তি নয়, অজানা আশঙ্কায় এবার ঢিবঢিবানি শুরু হয়ে গেছে বুকের ভেতর। গভীর রাতে দুটো জিনিস মানুষের ঘুম হারাম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। একটা হলো টেলিফোন। (অবশ্য শ্যারনের ফোনটা দিন দুই হলো নষ্ট। এক্সচেঞ্জে খবর দেয়া হয়েছে। ওরা বলেছে শিগগিরি রিপেয়ারম্যান। পাঠিয়ে দেবে।) অন্যটা কলিংবেল। দুটোই রাত গভীরে বেজে উঠলে গৃহস্থের মনে অশুভ চিন্তাটাই আগে আসে।
অবশ্য শ্যারনের আশঙ্কিত হয়ে ওঠার মত যথেষ্ট কারণ আছে। তার গুণধর ছোট ভাইটা মাঝে মাঝেই আকাম-কুকাম ঘটিয়ে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয় বড় বোনটাকে। শ্যারনের লেখালেখির বড় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে সে ইদানীং। মারামারি, ড্রাগস বহন ইত্যাদি কারণে ইতিমধ্যে পুলিশ কেসও খেয়েছে দুএকটা। এবারও তেমন কিছু ঘটেনি তো? অথবা তারচেয়েও সিরিয়াস কিছু? যার কারণে এত রাতে পুলিশ এসেছে ওর বাড়িতে।
ভীরু, এস্ত পায়ে লিভিংরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল শ্যারন। কলিংবেলের শব্দ থেমে গেছে। সে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, কে?
ওধার থেকে কোন জবাব নেই।
এবার গলা একটু চড়াল শ্যারন, কাকে চাই?
দরজার ওপাশে ফুঁপিয়ে ওঠার মত শব্দ করল কেউ। অস্পষ্ট, মেয়েলি গলায় বলল কিছু ঠিক বুঝতে পারল না শ্যারন। তবে নারী কণ্ঠটা অবাক করে দিল ওকে। তাহলে কি পুলিশ নয়? কী-হোলে চোখ লাগাল। যাকে দেখল, তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল সে। এক ঝটকায় দরজা খুলে ফেলল শ্যারন, বাইরে দাঁড়িয়ে। থাকা ভেজা বর্ষাতি গায়ে, আলুথালু বেশের, ওর সমবয়েসী সুন্দরী তরুণীটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, আরে, তুই!
নবাগতা তরুণীর চোখে স্পষ্ট ভয়, শ্যারনকে দেখে সেখানে নির্জলা বিস্ময় ফুটে উঠল, তারপর ফুপিয়ে উঠল সে, তুই এখানে! ঘরে চল। সব বলছি। কেউ যেন ওকে তাড়া করেছে, একবার পেছন ফিরে চেয়ে শিউরে উঠল সে, শ্যারনকে প্রায় ঠেলে ঢুকে পড়ল ভেতরে। তার ইঙ্গিতে দরজার বল্ট লাগিয়ে দিল শ্যারন। তরুণী ততক্ষণে একটা সোফায় এলিয়ে পড়েছে, রীতিমত হাঁপাচ্ছে। উদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল শ্যারন। কি হয়েছে, লিনড়া? এমন করছিস কেন? এত রাতে কোত্থেকে এলি? বাসা চিনলি কি করে? পরপর অনেকগুলো প্রশ্ন করে বসল সে।
বলছি। সব বলছি। হাত তুলে ওকে বাধা দিল লিন্ডা নামের মেয়েটি। আমাকে তুই বাচা, শ্যারন। ওরা আমাকে ধরে ফেলবে।
কারা ধরবে?
ওরা ড, জেসন স্লোনের লোক। আমার পিছু নিয়েছে। এ বাড়িতে ঢুকেছি জানতে পারলে নির্ঘাত আমাকে ধরে নিয়ে যাবে।
কি বলছিস মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। অসহায় ভঙ্গিতে কাধ কঁকাল শ্যারন। তবে ভয় পাসনে। আমি যখন আছি, তোর কিছু হবে না।
না, না। তুই বুঝতে পারছিস না ওরা খুব ভয়ঙ্কর। ধরতে পারলে সর্বনাশ করে ছাড়বে। বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে উঠল লিন্ডা।
পুরো ব্যাপারটা গোলমেলে লাগলেও ওকে আর চাপাচাপি করল না শ্যারন। তবে বুঝতে পারছিল সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটে গেছে তার প্রিয় বান্ধবীর জীবনে। নইলে সহজে ভয় পাবার পাত্রী সে নয়। সে লিন্ডার পাশে বসে রইল ওকে জড়িয়ে ধরে। লিন্ডার ফোপানি থামলে যত্নের সাথে ভেজা রেইন কোটটা খুলে নিল গা থেকে, লিভিংরুমের ফায়ারপ্লেসের আগুনটা উস্কে দিয়ে গরম কফি বানিয়ে আনল। লিন্ডা দুই হাতে মগটাকে চেপে ধরল। অনেকক্ষণ চুপচাপ পান করল কফি। তারপর কথা বলতে শুরু করল। নিজের জীবনের রোমহর্ষক সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কখনও কখনও চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল, কখনও অশ্রুসজল হলো, বেশিরভাগ সময় ভয়ের ছাপ ফুটল তারায়, শিউরে উঠল বারবার।
ঘটনার শুরু প্রায় বছর খানেক আগে। অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন মানুষ প্রফেসর গর্ডন ম্যাক্সওয়েলের ছোট এক রিসার্চ টীমের একজন সহযোগী ছিল লিন্ডা, রেনল্ডস। দলের মোট সদস্য ছিল চারজন, বাকি দুজন হলো জন বার্ন এবং মার্টিন সন্ডারস। ওদের গবেষণার বিষয় ছিল সর্দিজ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই। উদ্দেশ্য ছিল এমন একটা ওষুধ আবিষ্কার করা যা খেলে অন্তত পাঁচ বছর মানুষ ঠাণ্ডাজনিত কোন অসুখে আক্রান্ত হবে না।
তবে, দুর্ভাগ্যবশত, অন্যান্য অনেক প্রজেক্টের মত লিন্ডাদের এই রিসার্চ কাজও বিঘ্নিত হচ্ছিল উপযুক্ত ফান্ডের অভাবে। সাফল্যের দিকে যতই এগিয়ে যাচ্ছিল, টাকা-পয়সার সমস্যা ততই প্রকট হয়ে উঠছিল। অবশেষে একটা আশার আলো দেখতে পায় সবাই, ভাবে এবার হয়তো সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। স্যার আর্থার ওয়েন ওদের সামনে জ্বেলে দেন সেই আলো।
